ঢাকার ‘সুলতান’, এখন যেমন আছেন কারাগারে

প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন স্বঘোষিত ‘জনতার কাউন্সিলর’ তারেকুজ্জামান রাজীব। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ঢাকার সুলতান খ্যাত এই কাউন্সিলর গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রয়েছেন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে। মুক্ত জীবনে বিলাসবহুল জীবন কাটালেও বন্দি জীবনে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনে অভ্যস্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মোট চারটি মামলা রয়েছে। মামলাগুলো এখন ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
কারাগারের একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন কাউন্সিলর মো. তারেকুজ্জামান রাজীব। সকালে ঘুম থেকে ওঠেন রাজীব। এর মধ্যে প্রতিদিন নিয়ম করে পত্রিকা পড়েন। এরপর সকালের নাস্তা শেষে অন্য বন্দিদের সঙ্গে খোশগল্প করেন। মাঝেমধ্যে নিজের কক্ষে ঘুমাতে দেখা যায় রাজীবকে। করোনার কারণে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতে বিধিনিষেধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টেলিফোনেই যোগাযোগ করে থাকেন। মাঝেমাঝে আইনজীবীদের সঙ্গেও মামলার বিষয়ে কথা বলেছেন- এমন খবরও শোনা যায়।
কাউন্সিলর রাজীব ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক: ঢাকা মহানগরীর মোহাম্মদপুরের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
তারেকুজ্জামান রাজীব তার নামেরা এন্টারপ্রাইজের ব্যাংক হিসাবে নিজে কোনো টাকা জমা দিতেন না। পরিচিতদের মাধ্যমে তিনি সেই ব্যাংক হিসাবে ১৪ কোটি টাকা জমা করেন। চার বছরের ব্যবধানে (২০১৫ সালের ১ জুন থেকে ১৫ অক্টোবর ২০১৯) ওই হিসাবে জমা হয় ২১ কোটি টাকার বেশি। অথচ তার নিজের নামে থাকা দুটি ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন সময় জমা হয়েছে ছয় লাখ ২১ হাজার টাকা। আর সেই হিসাবগুলোতে বর্তমানে আছে মাত্র দুই হাজার ৭২৯ টাকা।
২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ছাড়াও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে রাজীবের বিরুদ্ধে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটিতে রয়েছে তার ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার দাম তিন কোটি টাকা। আছে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধের কাছে সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লট। রয়েছে তিনটি গাড়ি।
২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিআইডি একটি করে মামলা করে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তারেকুজ্জামান কারাগারে আছেন।
নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামানের অবৈধ সম্পদের খোঁজ জানার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিভিন্ন ব্যাংকসহ নানা দপ্তরে চিঠি পাঠায় সিআইডি। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাঠানো তথ্য পর্যালোচনা করে সিআইডি বলেছে, তারেকুজ্জামানের নামে দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি নামেরা এন্টারপ্রাইজ এবং অপরটি নামেরা বিল্ডার্স।
রাজীবের বিরুদ্ধে মাদক মামলা : বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাত বোতল বিদেশি মদ উদ্ধারের ঘটনায় করা মাদক মামলায় চার্জশিট দেয় র্যাব। র্যাব-২ এর এসআই (নিরস্ত্র) প্রণয় কুমার প্রামাণিক মামলাটি তদন্ত করে চার্জশিট দেন। এই মামলাটিও বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা: ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর অস্ত্র মামলায় আদালতে চার্জশিট দেয় র্যাবের উপপরিদর্শক (এসআই) প্রণয় কুমার প্রামাণিক। গ্রেপ্তারের সময় র্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের উপস্থিতিতে রাজীবের দখল ও নিয়ন্ত্রণ থেকে অস্ত্র, গুলি এবং অবৈধ সাত বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করেন। ওই ঘটনায় ভাটারা থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করেন র্যাব-১ এর ডিএডি মিজানুর রহমান। পরে ৬ নভেম্বর দুদক তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে। এই মামলায়ও তার বিচার চলছে।
দুদকের মামলা: ২০১৯ সালের অক্টোবরে শুদ্ধি অভিযানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার ‘সুলতান’ খ্যাত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে ওই বছরের ৬ নভেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বাদী হয়ে ২৬ কোটি ১৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি দুদকের উপপরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার একটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে অনেক মামলায় বিচার চলছে। তবে খোঁজ না নিয়ে বলতে পারবো না।’ (ঢাকাটাইমস/১৫সেপ্টেম্বর/এএ/এফএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













