রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে রোজা

ফিচার ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৬ | প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০২৩, ১০:৪৮

পবিত্র মাহে রমজান রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের মাস। রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রোজা রাখা মুসলমানদের ওপর ফরজ। পৃথিবীজুড়ে ১৬০ কোটি মুসলমান রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেদের নিবেদন করেন। তাঁদের এ আত্মনিবেদনের পেছনে থাকে না কোনো ইহলৌকিক চাওয়া। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিই কেবল চেয়ে থাকেন মুমিনরা।

আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের এ ভালোবাসাকে কবুল করে নিয়ে জান্নাতি প্রতিদান দিয়ে তাঁদের জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে দেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেন। ’ (বুখারি ও মুসলিম)

রোজাদারদের সংবর্ধিত করতে জান্নাতে থাকবে একটি বিশেষ গেট। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে। ওই দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে। ঘোষণা করা হবে, রোজাদাররা কোথায়?

তখন তারা উঠে দাঁড়ালে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে। তারা প্রবেশ করার পর ওই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ’ (সহিহ বুখারি) ইহলৌকিক কোনো প্রাপ্তির আশায় মুসলমানরা রোজা না রাখলেও বর্তমান পৃথিবীর গবেষকরা রোজা নিয়ে গবেষণা করে রোজার দৈহিক অনেক উপকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।

রোজার ব্যাপারে ইসলাম কঠোর অবস্থানে। রোজা অস্বীকারকারী কাফির। রোজা পরিত্যাগকারী ফাসেক। কেউ যদি ইচ্ছাকৃত একটি রোজাও ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে এর জন্য কাফফারা দিতে হবে। কাজাও আদায় করতে হবে। কেন এত কঠোরতা? কারণ রোজায় রয়েছে মানুষের জন্য প্রভূত কল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা রাখো, তোমরা সুস্থ থাকবে। ’ (মুসনাদে আহমাদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস বলে, রোজায় সুস্থ থাকার অনেক উপাদান রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা মানবদেহের খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে নিয়ে আসে এবং ভালো (উপকারী) কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়। আর এর মাধ্যমে মানুষের হার্টকে কার্ডিওভাসকুলার রোগ থেকে রক্ষা করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সবকিছুর জাকাত রয়েছে। জাকাত অর্থ হচ্ছে শুদ্ধি প্রক্রিয়া, শরীরের জাকাত হচ্ছে রোজা’। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রোজার শারীরিক অনেক উপকারিতাও রয়েছে। রোজা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুস্থ থাকতে সকলেরই রোজা রাখা উচিত।

বছরের অন্য সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের কারণে অনেকেই নানা সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে ওজন বেড়ে যাওয়া, শরীরের চর্বির আধিক্য ইত্যাদি। কিন্তু রোজা রাখলে শরীরে জমে থাকা এসব চর্বি শরীরের কাজে ব্যবহৃত হয় ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রোজা রাখার ফলে রক্তে ক্ষতিকর ফ্যাট এর মাত্রা কমে যায়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। রোজা রাখলে স্ট্রেস হরমোন কম নিঃসরণ হয়। এর ফলে বিপাকক্রিয়া ও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। রোজা রাখার ফলে মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা কমে যায়, কাজের প্রতি মনোযোগ বেড়ে যায়, এটি উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য খুবই ভালো।

যেসব ডায়াবেটিস রোগী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করতে চাচ্ছেন তাদের জন্য রোজা রাখা খুবই জরুরি। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন হাইপোগ্লাইসেমিয়া না হয়ে যায়। যারা ২ বেলার অধিক ইনসুলিন গ্রহণ করে থাকেন তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখলে ভালো হয়।

অনেক সময় দেখা যায় আলসারে আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখলে ভালো থাকেন। কারো কারো সমস্যা হতে পারে। তবে তাদের জন্য রোজা রাখার বিষয়টি অনুশীলনের ওপর নির্ভর করে।

ধূমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। এ কথা বর্তমান যুগে সবাই জানে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই ইসলাম ধূমপান নিষিদ্ধ করেছিল। ধূমপানের কারণে ফুসফুসে ক্যানসার হতে পারে। রোজা রাখলে ওই সমস্ত লোক এটি থেকে বিরত থাকতে পারবেন। বলা যেতে পারে ধূমপান বর্জনের উপযুক্ত সময় হচ্ছে রমজান মাস।

স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, সারা বছর অতিরিক্ত খাবার, অখাদ্য, ভেজাল খাবার ইত্যাদি খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে জৈব বিষ জমা হয়। এটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যদি আমরা পুরো এক মাস সঠিকভাবে রোজা পালন করি তাহলে এসব বিষ শরীর থেকে দূর হয়ে যাবে। আমাদের শরীর হবে শঙ্কামুক্ত।

রোজায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার নিষিদ্ধ। ফলে শরীরে এক ধরনের পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়। তার ওপর গরম আবহাওয়া হলে তো কথাই নেই। এক্ষেত্রে ইফতার থেকে শুরু করে সেহরি পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময়ের মধ্যে কমপক্ষে তিন লিটার পানি পান করতে হবে।

রমজানে দীর্ঘ একটা সময় পানাহার করা যায় না তাতে শরীরের স্বাভাবকি পুষ্টি চাহিদা পূর্ণ হয় না। সেক্ষেত্রে ইফতার থেকে শুরু করে সেহরি পর্যন্ত এই পানাহারের সময় খাবারের তালিকায় পুষ্টিগুণ সম্পন্ন আইটেম রাখতে হবে।

ভাজাপোড়া এবং পোড়ানো ভারী খাবারের চেয়ে হালকা খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কেক ও চকোলেট জাতীয় খাবারের বিকল্প হিসেবে ফল এবং পানীয় জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে।

অনেকেই ফিটনেস ধরে রাখতে প্রত্যহ শরীরচর্চার ওপর জোর দিয়ে থাকেন। হালকা শরীরচর্চা রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক ক্রিয়া সচল রাখে। রোজায় কার্ডিও এক্সারসাইজও চালিয়ে নেয়া যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যাতে মাত্রাতিরিক্ত না হয়।

সেহরিতে এমন খাবার খেতে হবে যা কয়েক ঘণ্টা শরীরে শক্তি জোগাবে। এক্ষেত্রে ধীরে হজম হয় এমন এবং আঁশযুক্ত খাবার অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য ভাতের পাশাপাশি গমের তৈরি রুটি এবং বার্লি ও পাস্তা জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। সেহরিতে শস্যযুক্ত খাবার রাখতে হবে। যেসব খাবার ধীরে ধীরে হজম হবে ও সারা দিন এনার্জি দেবে। যেমন: ওটস/কর্নফ্লেক্স: পানি, দুধ বা দই দিয়ে খাওয়া যায়, সঙ্গে ফল, বাদাম। সেহরিতে খাবারের সঙ্গে ভিটামিন, মিনারেলস ও পানীয়ের উৎস হিসেবে সালাদ ও সবজি খাওয়া যেতে পারে।

খেজুর দিয়ে ইফতারে শরীরের জন্য উপকারিতার বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত। চিনিমুক্ত শক্তিসমৃদ্ধ খাবার ইফতারের পর শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এক্ষেত্রে খেজুরের মতো ফলমূল এবং ফলের জুস খাওয়া যেতে পারে। ইফতারের পর মূল খাবারে শ্বেতসারসমৃদ্ধ ব্যালেন্সড খাবার যেমন- ভাত, রুটি, আলু, তাজা শাকসবজি এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন- মাংস, মাছ এবং স্বাভাবিক চর্বিসমৃদ্ধ দুগ্ধজাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে।

ইফতারে এমন খাবার রাখবেন, যাতে প্রাকৃতিক চিনির জোগান থাকে এবং যা দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।

পানীয়: পানি, ফলের শরবত, স্মুথি, দুধ—এগুলো পানীয়ের অন্তর্ভুক্ত। দুধ ও ফল দিয়ে বানানো ড্রিংকস যেমন ব্যানানা শেক, ম্যাঙ্গো শেক প্রাকৃতিকভাবে সুগার ও ক্যালরির ভালো উৎস। অতিরিক্ত চিনি দেওয়া শরবত বা কৃত্রিম ফলের জুস খাওয়া যাবে না। ঘরে তৈরি ফ্রেশ ফলের জুস নিন। খেজুর: খেজুর শর্করা ও খনিজ যেমন পটাশিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ এবং আঁশের অনেক ভালো উৎস। ইফতারে তাই দুটি করে খেজুর রাখুন।

ফল: ইফতারে ফল ডিহাইড্রেশন দূর করে। বিশেষ করে পানিসমৃদ্ধ ফল যেমন তরমুজ, আনারস, বাঙ্গি, কমলা, মাল্টা, নাশপাতি খান। স্যুপ: সবজি ও চিকেন দিয়ে তৈরি স্যুপ রাখা ভালো। মাঝেমধ্যে ছোলা, পিঁয়াজু ও বেগুনির বদলে আমরা স্যুপ রাখতে পারি।

দই: দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন ও ভিটামিন ডি থাকে, সহজে খাবার হজম করে। ইফতারে তাই দই, চিড়া-মুড়ি খেতে পারেন। সেহরি খাওয়ার পরও দই খেতে পারেন।

কাঁচা ছোলা: রান্না ছোলার থেকে কাঁচা ছোলায় পুষ্টিগুণ বেশি। রান্না করলে যে তেল মসলা খাওয়া হতো, সেটা থেকেও বাঁচা যায়। ছোলায় ভিটামিন, খনিজ লবণ, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও উচ্চ প্রোটিন রয়েছে। শরীরে শক্তির জোগান দিতে এর কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন কিছু ছোটখাটো নিয়ম মেনে চলে রোজায় আপনি থাকতে পারেন মানসিকভাবে ফিট এবং শারীরিকভাবে কর্মশক্তিসম্পন্ন। কাজের মাঝে মাঝে ছোট্ট বিরতি নিয়ে পায়চারি করে আসুন, প্রতিদিনের কাজের তালিকা করে সেগুলো সম্পন্ন করুন এবং যে কাজটি কঠিন মনে হবে সেটা আগে চিহ্নিত করে তারপর মাঠে নামুন। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন সঠিক খাবারটি খাচ্ছেন কি না।

ইফতারের পর রাতে হালকা খাবার খাওয়াই উত্তম। রাতে লাল আটার রুটি, পাস্তা, ভাত অল্প পরিমাণে খাবেন। প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিনস, ডাল ও আঁশের চাহিদা পূরণের জন্য সালাদ থাকতে পারে।

সেহরি আজানের আধা ঘণ্টা আগে শেষ করবেন। সেহরি শেষে তাড়াহুড়া করে বেশি পানি পান করবেন না। ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত ও মিষ্টিজাতীয় খাবার বর্জন করুন। বিশেষ করে সেহরিতে মিষ্টি খাবেন না, এতে তৃপ্তি হরমোন লেপটিন কমে যায়, ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায়। চা, কফি পানিশূন্যতা বাড়ায়। খেজুর ও সাধারণ পানি দিয়ে রোজা ভাঙা উচিত।

যেহেতু রমজান এবাদত বন্দেগী ও সংযমের মাস। রোজা আমাদের প্রতিটি কাজে সংযমের শিক্ষা দেয়। সংযম করতে হয় কথায়, কাজে, খাওয়া দাওয়ায়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে রোজা রাখলে প্রদাহ, জ্বালাপোড়া, ব্যথা, সংক্রমণ, ফুলে যাওয়া কমে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বাড়ে। অকাল বার্ধক্য শুধু প্রতিরোধই করে না, মস্তিষ্কও ক্ষুরধার হয় রোজা রাখলে।

রমজানে অশুদ্ধ জীবনাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। আজেবাজে অপ্রয়োজনীয় কথা, অকারণে চেঁচামেচি করা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকতে হবে। পাশাপাশি পরনিন্দা, পরচর্চা, গীবত বর্জন করতে হবে। এমনকি ইফতার-সেহরিতে খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধ বজায় রাখাও হচ্ছে রমজানের অন্যতম শর্ত। নিয়ম মেনে রোজা রাখলে নানা রকম সংক্রমণ ও অসুস্থতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বতোভাবে কর্মক্ষম করে তোলে এক মাসের সিয়াম সাধনা।

(ঢাকাটাইমস/২১ মার্চ/আরজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ফিচার এর সর্বশেষ

ত্বকের হারানো জেল্লা ফিরিয়ে দিতে পারে ডাবের পানি!

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য নিমপাতা মহৌষধ! জানুন খাওয়ার নিয়ম

ক্যানসার-ডায়াবেটিসসহ বহু জটিল রোগের মোক্ষম দাওয়াই আখের রস

এই গরমে কেমন তাপমাত্রার পানিতে গোসল করলে শরীর থাকে চাঙ্গা?

পাইলসের মতো যন্ত্রণায়ক সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় যে পাঁচ ফল

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে হাঁটার চেয়ে বেশি কার্যকর সিঁড়ি ভাঙা

গরমে তৃষ্ণা পেলেই ঠান্ডা পানি খান? বিপদের কিন্তু শেষ থাকবে না

ঘুমের মধ্যে মুখ হাঁ হয়ে যায়? কী ভয়ানক বিপদ হতে পারে জানুন

যেসব খাবার রাতে খেলে ঘুমের মারাত্মক সমস্যা হতে পারে

সকালের নাস্তায় কী খাবেন কী নয়? লাভ-ক্ষতিসহ জানুন সবিস্তারে

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :