চার দিনে চিনির বাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা লোপাট

লিটন মাহমুদ, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:২০

রমজান সামনে রেখে চিনির বাজারে তুঘলকি কাণ্ড শুরু হয়েছে। মুসলমানদের পবিত্র সিয়াম সাধনার মাসে শরবতসহ বিভিন্ন পদের খাবারে ঘরে ঘরে চিনির ব্যবহার বাড়ে। মানুষের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে রমজানের আগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা চিনির বাজার অস্থির করার প্রতিযোগিতায় উঠে পড়ে লেগেছেন।

বৃহস্পতিবার সরকার ঘোষণা দিয়ে লাল চিনির দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও কয়েক ঘণ্টা পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু পরদিন থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে সব কোম্পানি ও মিলের চিনির দাম।

বৃহস্পতিবার পাইকারি বাজারে যে চিনি প্রতিবস্তা (৫০ কেজি) ৬ হাজার ৭২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল; বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ঘোষণার পরদিন প্রতি বস্তায় দাম বাড়ে ১৬০ টাকা, বিক্রি হয় ৬ হাজার ৮৮০ টাকায় এবং একই চিনি রবিবার বাড়ে আরেক দফা দাম। একলাফে এদিন একবস্তা চিনির দাম ৭ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। যদিও এ ব্যাপারে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সাফাই গান। তারা বলেন, সরকারি চিনির দর বাড়ানোর ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রভাব পড়েছে।

এদিকে পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খুচরা দোকানিরাও বাড়িয়ে দেন চিনির দাম। বিগত কয়েকমাস ধরে ১৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া চিনি শুক্রবার বিক্রি হয় ১৪৫ টাকায়। রবিবার পর্যন্ত কারওয়ান বাজার ও আশেপাশের খুচরা দোকানগুলোতে ১৪৮ এবং ১৫০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে প্যাকেট চিনির গায়ে ১৪৪ টাকা দাম লেখা থাকলেও তা ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। আর হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে লালচিনি পাওয়া গেলেও তা ১৬০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

বাংলাদেশে বছরে ২০ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা রয়েছে। ২২ লাখ মেট্রিক টন ধরে হিসেব অনুযায়ী প্রতিদিন চাহিদা ৬০ লাখ ২৭ হাজার ৩৯৭ কেজি। গত চার দিনের প্রথম দুই দিনে (শুক্রবার, শনিবার) কেজিতে তিন টাকা বাড়িয়ে দেশের চিনি বাজার থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা লোপাট করেছেন ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৮২ টাকা। আর গত দুই দিনে (রবিবার, সোমবার) কেজিতে ৫ টাকা বাড়িয়ে লোপাট করেছেন ৬ কোটি ২৭ লাখ ৩ হাজার ৯৭০ টাকা। অর্থাৎ ৪ দিনে মোট লুটে নিয়েছেন ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার বেশি। এদিকে গত ৪ দিনে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা বেশি রেখে পাইকারদের কাছ থেকে মিল ও কোম্পানিগুলো হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরাও একই পরিমাণের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

সব মিলিয়ে গত চার দিনে তিন ধাপে চিনির বাজার থেকে লোপাট হয়েছে ৩০ কোটি টাকা।

কারওয়ান বাজারের খুচরা এবং পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বাজারে সাদা চিনির মধ্যে ফ্রেস, ঈগলু, দেশবন্ধু, তীর, ইন্ডিয়ান ও ব্রাজিল চিনি পাওয়া যায়। বিভিন্ন চিনি কোম্পানি ও মিল থেকে সরাসরি চিনি এনে এখানে পাইকারি বিক্রি করে মেসার্স ইব্রাহিম স্টোর, আমিন স্টোর, সোনালী ট্রেডার্সসহ হাফ ডজনের মতো পাইকারি দোকান। দুই দিনের ব্যবধানে এসব দোকানে পাইকারি ৫০ কেজির সাদা চিনির বস্তায় দাম বাড়ে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত।

রবিবার কারওয়ান বাজারের এক খুচরা চিনি বিক্রেতা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যে চিনি গত বুধবার ৬ হাজার ৬৫০ টাকায় কিনেছি তা কিনতে হচ্ছে ৭ হাজার টাকায়। এরসঙ্গে আরও লেবার খরচ দোকান ভাড়াসহ আরও কিছু খরচ রয়েছে। যার কারণে আমাদের বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হয়েছে।‘

তিনি জানান, চিনিতে খুবই সীমিত লাভ বা অনেকসময় লাভ না করেই বিক্রি করেতে হয়। কারণ, না বিক্রি করলে ক্রেতা হারাতে হবে।’

সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি প্রজ্ঞাপনকে পুঁজি করে একটি চক্র চিনির বাজার অস্থিতিশীল করছে। এদিন নাম না প্রকাশে কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি চিনি বিক্রেতা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বর্তমানে চিনির আন্তর্জাতিক বাজার নিম্নমুখী রয়েছে। এখন হুট করে দাম সরকার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন নেবে বুঝে আসে না। আবার কেনই বা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করল। বাজারের বর্তমানে যে অবস্থা আমার মনে হয় না দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।’

ইব্রাহিম স্টোরের সত্ত্বাধীকারী মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘সরকার বলেছিল এজন্য দাম বাড়ানো হয়। সরকার ২০ টাকা কেজিতে বাড়াতে চাইছিল। এইডা শুনেই সব কোম্পানি দাম বাড়ায় ফেলছে। এসব নিয়ে কথা বললে কোম্পানির কাছে পাত্তা পাওয়া যায় না। তারা বলে নিলে নেন, নাহলে নিয়েন না।’

এদিকে রোজার আগে চিনির বাজারের এমন অস্থিরতা আক্ষেপ বাড়াচ্ছে ক্রেতাদের। হতাশা প্রকাশ করে ইসমাইল নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম যে নির্বাচনের পর নতুন প্রতিমন্ত্রী এসেছেন। তিনি বিভিন্ন অ্যাকশন নিচ্ছেন। কাজেই আমরা ভালো ফলাফল পাব। কিন্তু পাচ্ছি না।’

এদিকে ডলার সংকট থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে বুকিং রেট কম থাকায় পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ চিনি আমদানি করেছেন মিল মালিকরা। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৬ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন চিনি আমদানি হয়েছে। যেখানে গত অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে আমদানি হয়েছে ৯ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার ১ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন চিনি।

কাজেই বাজারে চিনির সংকট না হওয়ার আশা প্রকাশ করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপকমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক বলেন, ‘আমাদের কাছে চিনি আমদানির যে বিল অব এন্ট্রিগুলো পড়ছে বা জাহাজে চিনি আমদানির যে খবর আমরা পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে না রমজান মাসে চিনির কোনো সংকট হতে পারে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :