যেসব কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না

মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার হুসাইন
 | প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০২৪, ০৮:৫২

জাকাতের অর্থ কোথায় ব্যয় করা হবে সেটা নিয়ে এখনো আমাদের মাঝে বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। অনেক সাধারণ মানুষ এটাকে দান করে মসজিদ, মাদরাসাসহ জনকল্যাণমূলক নানা কাজে ব্যয় করতে আগ্রহী হন। কিন্তু বাস্তবে এসব খাতে যাকারে অর্থ ব্যয় করা যাবে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা জাকাত আদায়ের নির্ধারিত খাত বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং এটা কোনো সাধারণ দান বা সদকা নয় বরং এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ বিধান। সুতরাং জাকাতের অর্থ দিয়ে মসজিদ মাদরাসা নির্মাণ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও জলাধার বা কূপ ইত্যাদি খনন করা জায়েয নয়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জনসাধারণের জন্য রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ, সুপেয় পানি বা জলাধারের ব্যবস্থা করা অনেক বড় সওয়াবের কাজ এবং সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ কাজ ফরয সদকা তথা জাকাতের অর্থ দিয়ে করার সুযোগ নেই।

এ ধরনের জনকল্যাণধর্মী কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করলে জাকাত যে আদায় হবে না এবিষয়ে মুজতাহিদ ইমাম ও ফিকহবিশারদদের মতামত উল্লেখ করা হলো।

দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর মুজতাহিদ ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. (জন্ম: ১৫৭ হি.-মৃত্যু : ২২৪ হি.) বলেন, فأما قضاء الدين عن الميت، والعطية في كفنه، وبنيان المساجد، واحتفار الأنهار، وما أشبه ذلك من أنواع البر، فإن سفيان وأهل العراق وغيرهم من العلماء يجمعون على أن ذلك لا يجزئ من الزكاة؛ لأنه ليس من الأصناف الثمانية.

মৃতের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ, মাইয়েতের কাফনের খরচ, মসজিদ নির্মাণ ও খাল খনন- এজাতীয় পুণ্যের কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা হলে জাকাত আদায় হবে না। এ বিষয়ে সুফিয়ান রাহ. এবং ইরাক ও অন্যান্য অঞ্চলের ফকীহগণ একমত। কেননা এসকল খাত জাকাতের ৮টি খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। [কিতাবুল আমওয়াল, বর্ণনা ১৯৮০] ইমাম কাসানী রাহ. বলেন, صرف الزكاة إلى وجوه البر من بناء المساجد، والرباطات، والسقايات، وإصلاح القناطر، وتكفين الموتى ودفنهم أنه لايجوز.

জাকাতের অর্থে জনকল্যাণমূলক কাজ করা, যেমন মসজিদ নির্মাণ, সরাইখানা ও জলাধার নির্মাণ এবং পোল মেরামত ও মৃতের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা জায়েয নয়। [বাদায়েউস সানায়ে ২/১৪২]

ইবনে কুদামা রাহ. বলেন: ولا يجوز صرف الزكاة إلى غير من ذكر الله تعالى، من بناء المساجد، والقناطر، والسقايات، وإصلاح الطرقات وسد البثوق، وتكفين الموتى، ৃوأشباه ذلك من القرب التي لم يذكرهاالله تعالى.

আল্লাহ তাআলা যেসব খাতের কথা উল্লেখ করেননি সেসব খাতে জাকাত দেওয়া জায়েয নয়। যেমন মসজিদ নির্মাণ, পুল নির্মাণ, জলাধার তৈরি করা, রাস্তা মেরামত ও বাঁধ নির্মাণ কিংবা মৃতের কাফনের ব্যবস্থা করা- এ জাতীয় সওয়াবের কাজ, জাকাতের খাতের আলোচনায় আল্লাহ তাআলা যার উল্লেখ করেননি। [আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৪/১২৫]

জনকল্যাণমূলক কাজে জাকাত আদায় না হওয়ার কারণ হল, জাকাত ব্যক্তির হক। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: تؤخذ من أغنيائهم فترد على فقرائهم

‘মুসলমানদের সম্পদশালীদের থেকে জাকাত গ্রহণ করা হবে। অতঃপর তাদের গরীবদের তা দেওয়া হবে।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৯৬ সুতরাং জাকাত আদায়ের জন্য ব্যক্তিকে জাকাতের অর্থের সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দিতে হবে। যেন জাকাতের সম্পদে তার একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে যে, সে চাইলে তা নিজে ভোগ করতে পারে, চাইলে সে বিক্রিও করে দিতে পারে, আবার কাউকে দানও করে দিতে পারে। এভাবে মালিক বানিয়ে দিলে জাকাত আদায় হবে।

পক্ষান্তরে মালিকানা নিজের কাছে রেখে বা জাকাতের অর্থ দ্বারা জনকল্যাণমূলক কাজ করে, যেমন জলাধার বানিয়ে বা রাস্তা মেরামত করে বা প্রতিষ্ঠান করে দিয়ে তা থেকে উপকার ভোগ করার অনুমতি দিয়ে দিলেও জাকাত আদায় হবে না। কেননা এর দ্বারা জাকাতের সম্পদে ব্যক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং জাকাতের হকদার কে তা জানিয়ে দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকীন, জাকাত উসূলকারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (জিহাদকারীদের জন্য) এবং মুসাফিরদের জন্যে। এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’। [সূরা তাওবা (৯) : ৬০]

এই আয়াতে জাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো; ১. ফকীর, ২. মিসকীন, ৩. আমিলীন (ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক জাকাত উসুলের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ), ৪. আলমুআল্লাফা কুলূবুহুম, ৫. আলগারিমীন (ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি), ৬. রিকাব (দাস মুক্তকরণ), ৭. ফী সাবীলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদকারী), ৮. ইবনুস সাবীল (নিঃস্ব মুসাফির)।

এই আট খাতের প্রত্যেকটির পরিচয় হাদীস-আসারের মজবুত দলীল দ্বারা সুপ্রমাণিত। সাহাবা-তাবেয়ীন ও সালাফের নিকট এ খাতগুলোর পরিচয় সুস্পষ্ট ছিলো।

(ঢাকাটাইমস/২১মার্চ/এসআইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :