আরিফুর রহমান দোলন: সাংবাদিকতায় আমার আদর্শ ও পথপ্রদর্শক

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:০৩
অ- অ+

আমি একজন ক্ষুদ্র গণমাধ্যমকর্মী- এই পরিচয়টুকুই আমার অন্য আর সব সত্তার চেয়ে বড় সত্য। এই পরিচয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম, সংশয় আর স্বপ্ন। জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে সাংবাদিকতার মতো কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ অথচ মহৎ পেশায়। এখন ঝুঁকিমুক্ত হতে অন্য পেশায় জড়িয়ে সময়ের একটা বড় অংশ দিলেও সাংবাদিকতাকে সঙ্গী করে রেখেছি যত্নের সঙ্গে।

তিন দশকের বেশি সাংবাদিকতা জীবনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগণ্য পত্রিকাগুলোয় কাজের সুযোগ হয়েছে আমার। এই যাত্রায় সান্নিধ্য পেয়েছি অনেকে প্রতিথযশা সাংবাদিক ও সম্পাদকের সঙ্গে। তাদের মধ্যে একজন এখনো আমার সাংবাদিকতায় ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরিফুর রহমান দোলন। তার এ ছায়াটা আমি উপভোগ করি। যেমনটি উপভোগ করেছিলাম তার প্রথম আলোয় প্রকাশিত দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সব সংবাদ পড়ে। তখন আমিও প্রথম আলোর একজন কর্মী। ভাবতাম- কী করে পারেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন সব তথ্য উদ্ঘাটন করতে! সেই যে তার প্রতি মুগ্ধতার শুরু, পরে তার আরও নানা প্রয়াস আমাকেও বদলে যেতে উৎসাহিত করেছে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে আরিফুর রহমান দোলন নামটি আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার হয় না। অনুসন্ধিৎসা, মেধা, দক্ষতা, সততা ও শ্রমের সমন্বয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না, সংবাদ তৈরির দর্শনকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। আদর্শ সাংবাদিকি শ্লাঘা তিনি ধারণ করেন সব সময়। তাই আমি মনে করি একজন সাংবাদিকের সফল পেশাগত জীবন জানতে হলে তার সাংবাদিকতাকে পড়তে হবে।

আরিফুর রহমান দোলনের শিকড় প্রোথিত ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার কামারগ্রাম গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারে। হাতেখড়ি সেখানকার কাঞ্চন একাডেমীতে। এরপর আলফাডাঙ্গা এ জেড পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, যেখানে তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন অনুসন্ধিৎসু এক কিশোর। উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে। এই সময়েই রাজনীতির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। রাজনীতি এখানে ক্ষমতার মোহ নয়, বরং চিন্তার চর্চা, মতাদর্শের লড়াই ও সমাজ বদলের স্বপ্ন।

পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তার চিন্তার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংবাদিকতার বৌদ্ধিক ধারার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটে এই সময়েই।

সাংবাদিকতা জীবনের শুরুটা ছিল সীমান্তের ওপারেই। দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার (কলকাতা) হিসেবে কাজ করেন আরিফুর রহমান দোলন। কলকাতা ছিল তার জন্য এক বিশাল পাঠশালা। সেখানে সংবাদ মানে কেবল তথ্য নয়- সংবাদ মানে বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট ও দায়বদ্ধতা।

পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে যোগ দেন দেশের বিখ্যাত সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায়। এখানেই মূলত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে আরিফুর রহমান দোলনের। রাজনৈতিক প্রতিবেদন, অপরাধ অনুসন্ধান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অলিগলি খুঁজে বের করার সাহসী প্রয়াস তাকে দ্রুতই আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সাংবাদিকতা জগতে। এই পত্রিকার সঙ্গে তার যাত্রাপথটা খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না।

আরিফুর রহমান দোলনের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে দৈনিক প্রথম আলো। স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে শুরু করে সিনিয়র রিপোর্টার, ডেপুটি চিফ রিপোর্টার এবং স্পেশাল করসপন্ডেন্ট- দীর্ঘ এক দশকের যাত্রাপথে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন পূর্ণাঙ্গ এক সংবাদযোদ্ধা হিসেবে। এই সময়েই রাজনীতি, অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক রিপোর্টিংয়ে তিনি এক অনন্যতার পরিচয় দেন। দেশের জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘরের খবর তুলে এনে তিনি শুধু সংবাদ করেননি, দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার প্রশ্নে রেখেছেন কার্যকর ভূমিকা। তার এই ভূমিকা সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত থাকবে নিঃসন্দেহে।

নিজের রিপোর্টিংয়ের চরম উৎকর্ষের সময় আরিফুর রহমান দোলন যোগ দেন নতুন দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাকালীন উপসম্পাদক হিসেবে যুক্ত হওয়া ছিল তার পেশাগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অল্প সময়ের মধ্যে পত্রিকাটি প্রচার সংখ্যায় শীর্ষস্থানীয় অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়।

এরপর দৈনিক আমাদের সময়-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাংলাভিশন টেলিভিশনে বার্তা সম্পাদক হিসেবেও তার দক্ষতা প্রমাণিত হয়।

কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। চাকরির নিরাপদ বলয় ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। দেশে যখন নিউ মিডিয়া অর্থাৎ অনলাইন গণমাধ্যম মাথা তোলার চেষ্টা করছে, সেই প্রাথমিক পর্বে তিনি শুরু করেন নিউজপোর্টাল ঢাকাটাইমস২৪ ডটকম। তখনকার অ্যালেক্সা র‌্যাংকিংয়ে দেশের স্বতন্ত্র নিউজপোর্টালগুলোর মধ্যে শীর্ষে উঠে আসে ঢাকাটাইমস২৪ ডটকম।

উদ্যোক্তা হওয়ার এই আনন্দ তাকে একে একে সাপ্তাহিক এই সময়, দৈনিক ঢাকা টাইমসপ্রকাশনায় উদ্বুদ্ধ করে। সংবাদকর্মী থেকে হয়ে ওঠেন একজন সফল প্রকাশক-সম্পাদক।

এরপর রাজনীতিতে জড়ান মানবসেবার বড় প্ল্যাটফরম পাওয়ার আশায়। সমাজসেবা যে তার পারিবারিক ঐতিহ্য। তার পূর্বপুরুষ কাঞ্চন মুন্সী ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ নানা সমাজহিতৈষী স্থাপনা। তখনকার পশ্চাদপদ সমাজে শিক্ষার প্রসারে ভুমিকা রাখেন তিনি। প্রপিতামহের এই সমাজসেবার ধারা অব্যাহত রাখেন আরিফুর রহমান দোলন। কাঞ্চন মুন্সী ফাউন্ডেশন গড়ে তুলে মনোনিবেশ করেন সমাজসেবায়। ইতিমধ্যে তার এই ভূমিকা জনপ্রিয় করে তুলেছে তাকে।

একজন মানুষের এই বহুমুখী রূপান্তর সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস। সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পেরেছেন বলেই আরিফুর রহমান দোলন পেশাগত জীবনের পরীক্ষায় সফল। তার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শ্রেষ্ঠ রিপোর্টিং পুরস্কার, পরিবেশবিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় একাধিক সম্মাননা তার মুকুটে শোভা পাচ্ছে

তবে তার কাছে পুরস্কারের চেয়েও বড় স্বীকৃতি সম্ভবত পাঠকের আস্থা ও সহকর্মীদের ভালোবাসা।

সাংবাদিকতা, ব্যবসার উদ্যোগের পাশাপাশি আরিফুর রহমান দোলন সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী লেখায়ও ছিলেন মনোযোগী। তার প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণাগ্রন্থ একাত্তরের গোপন দলিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় এক অনন্য সংযোজন। মতামতধর্মী গ্রন্থ রাজপাট অল্প সময়েই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আছে একটি উপন্যাসও, নাম মায়াবী

এছাড়া তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তিনি কেবল দৈনিক সংবাদে সীমাবদ্ধ নন; ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ ভাবনার দীর্ঘমেয়াদি চর্চাও তার লেখালেখির অংশ।

২০০০ সালের গোড়ার দিকে দৈনিক প্রথম আলোতে চাকরির সুবাদে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই পরিচয় আজ দীর্ঘ পথচলায় রূপ নিয়েছে। একদিন আমাকে বলেছিলেন আপনি লেখালেখি শুরু করে দে এই একটি বাক্য অনুরণিত হতে থাকে দিনের পর দিন। একসময় আমার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। তার অনুপ্রেরণাতেই লেখালেখির হাতেখড়ি। আজও আমি লিখিএই প্রেরণার ধারাবাহিকতায়।

সংবাদকর্মী থেকে উদ্যোক্তা, রাজনীতির আদর্শ থেকে মানুষের সেবা- আরিফুর রহমান দোলনের পথচলা বহুমাত্রিক। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান। এভাবেই সাংবাদিকতা জগতে আমার পথচলার আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছেন গর্বের তিনি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা। তার আগামীর পথচলা আরও আলোকিত হোক- এই কামনা করি।

লেখক: সংবাদকর্মী।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের ১০ পুশইন রুখে দিল বিজিবি
ডিএমপির ওসি রাহাৎ খানের বিরুদ্ধে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জালিয়াতির অভিযোগ!
ভারতের বিহারের হাসপাতালের আইসিইউতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৪
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা