স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে চলা এক জনদরদি পুলিশ কর্মকর্তার বিদায়!

নরসিংদী প্রতিনিধি
  প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫২| আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:০০
অ- অ+

দায়িত্ব, সততা এবং সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নরসিংদী সদর সার্কেলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সিআইডিতে বদলি হয়েছেন শামীম আনোয়ার। তাঁর বিদায়ে জেলায় তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার স্রোত।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি প্রচলিত ধারা ভেঙে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেন। বিশেষ করে বহুল আলোচিত আমেনা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূরাকে ভারতে পলায়নরত অবস্থায় গ্রেপ্তার তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নুরাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবিতে সভা- সমাবেশ,মানববন্ধন ইত্যাদি হতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তি- সংগঠন সময় বেঁধে দিয়ে আল্টিমেটাম দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নুরাকে গ্রেপ্তার না করা হলে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেয়। দ্রুত আসামি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তিনি শুধু একটি জঘন্য অপরাধের প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনের পথই সুগম করেননি, বরং নবগঠিত সরকারকে অনেক বিব্রতকর একটি পরিস্থিতিতে পড়ার হাত থেকেও রক্ষা করেছেন। নুরাকে গ্রেপ্তার করা না গেলে বা সে ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলে এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য কখনোই উন্মোচন করা যেত না মর্মে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে যে আস্থার সংকট, মহাগুরুত্বপূর্ণ এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় পুলিশ।

শুধু একটি মামলাই নয়, নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশেষ করে নরসিংদী পৌর এলাকার সড়ক চাঁদাবাজি ও মেঘনা খেয়াঘাট এলাকায় দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করেন তিনি। ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ধারাবাহিক অভিযান ও চাঁদাবাজদেরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তারের ফলে।

এছাড়া সদর উপজেলার মদনগঞ্জ রোডের ৫ নং ও ৬ নং ব্রিজ এলাকায় যুগযুগ ধরে চলমান ডাকাতি ও খুনের মহোৎসবে রাশ টানেন তিনি। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা মন্তব্য করেন, আগে প্রায়দিনই এই রাস্তায় ডাকাতি হতো। মাসে ৮/১০ টা লাশ পড়া ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম আনোয়ারের চেষ্টায় ডাকাতি ও খুনের ঘটনা প্রায় শুন্যের কোটায় নেমে আসে। অনেক ডাকাতকে হাতেনাতে গ্রেপ্তারও করা হয় এই সময়, যা স্থানীয়দের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসে।

তবে তাঁর এই আপসহীন অবস্থান তাঁকে ঝুঁকির মুখেও ফেলেছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় তিনি হামলার শিকার হয়ে আহত হন। এই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং এই ঘটনায় পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা ও সমর্থন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এর আগে রাইড শেয়ারিং চালক কর্তৃক যাত্রীকে ঢাকা থেকে নরসিংদীতে নিয়ে ধর্ষণ মামলার ভিকটিম উদ্ধার ও ধর্ষক চালককে গ্রেপ্তার করেও দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন জননন্দিত এই পুলিশ কর্মকর্তা।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। বিভিন্ন এলাকায় যেয়ে জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য চাওয়া এবং নিজের খোলামেলা জবাবদিহিতার মাধ্যমে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেন। নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমতের প্রতি তাঁর এই উন্মুক্ততা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

বিদায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। কেউ লিখছেন, “স্যার, আপনি থাকলে আমরা নিরাপদ বোধ করতাম”, আবার কেউ বলছেন, “এমন অফিসারই দেশের প্রয়োজন”। এর আগে তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে নরসিংদীতে মানববন্ধনও করে সাধারণ জনগণ।

বিদায়ের আগে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম আনোয়ার নরসিংদীর মানুষের কাছে রেখে গেলেন এক ভিন্নধর্মী পুলিশিংয়ের দৃষ্টান্ত, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতা একসঙ্গে কাজ করেছে। তাঁর এই পথচলা সৎ ও নির্ভীক পুলিশিংএর ক্ষেত্রে হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল বাতিঘর।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ভারতে পাচারকালে রাঙ্গামাটির দুর্গম সীমান্তে দুই মিনি পাওয়ার টিলার জব্দ
১২ জন অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপারকে বদলি
মদের দাম বাড়ালো কেরু অ্যান্ড কোং, আজ থেকেই কার্যকর
তিন ভাইয়ের মানব পাচার সাম্রাজ্য, ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য সিআইডির হাতে
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা