চট্টগ্রামে বন্যার পানি কমছে, ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার হাজারো মানুষ এখনো দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। গত পাঁচ দিনে বন্যা, পাহাড়ধস ও দেয়ালধসের ঘটনায় জেলায় ৬ শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোববার থেকে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি নামতে শুরু করায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ ধীরে ধীরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছেন। তবে ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই তাদের। ঘরবাড়িতে জমে থাকা কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র, খাদ্যসংকট এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত সাতকানিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ অবস্থান করছিলেন। পানি কমতে শুরু করায় তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরে গেছেন।
অন্যদিকে বাঁশখালীতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নতুন করে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানির উচ্চতা আরও বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। কৃষিজমি, মাছের ঘের, সড়ক, বসতঘর ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নিম্নাঞ্চলের অনেক ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক এখনো পানির নিচে। বহু এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় অনেক মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ত্রাণ কার্যক্রম চললেও দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি। অনেক পরিবার শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
পানি কমতে শুরু করায় কৃষি ও মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান, সবজি, পানের বরজসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, শুধু মৎস্য খাতেই প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বলছেন, দীর্ঘদিনের শ্রম ও বিনিয়োগ মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে।
বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ এখনো পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বরসহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ধস ও দেয়ালধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার সাতটি উপজেলায় ৬ শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বন্যার পানিতে ডুবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৪২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিভাগজুড়ে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭০০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
পানি নামতে শুরু করলেও সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামো মেরামত, কর্মহীন পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
(ঢাকাটাইমস/১৩ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































