৬৬ ফুট গভীর নদীর ওপর মৃত্যুফাঁদ, তবুও রেলসেতুতে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে প্রায় ৬৬ ফুট নিচে গভীর নদী। রেলসেতুর প্রবেশমুখে স্পষ্ট সতর্কবার্তা—‘সাবধান, এই সেতুর ওপর দিয়ে জনসাধারণের চলাচল নিষেধ।’ নিচে লেখা, ‘আদেশক্রমে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ’। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রেলসেতু পার হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
রহনপুর রেলসেতুতে জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে রেললাইনের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে সরু হাঁটার পথ। পাটাতনের অনেক অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও ফাঁক এতটাই বড় যে নিচে নদীর পানি দেখা যায়। প্রায় ৬৬ ফুট উঁচু এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় সামান্য অসতর্কতাই ঘটাতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি সেতুটি পার হওয়ার সময় পড়ে গিয়ে বরবরি (৪৮) নামে এক নারী আহত হয়েছেন। প্রায় ১৫ দিন আগে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে তার পায়ে আঘাত লাগে।
মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর সংযোগস্থলের ওপর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই রেলসেতুটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে ‘শর্টকাট’ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের ওভারব্রিজ থেকে তাকালেই দেখা যায় ১২ পিলারের বিশাল স্টিলের সেতুটি।
সেতুটি দিয়ে ভারত থেকে আসা মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সেতুটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে রেলওয়ে। তবে রহনপুর বাজারে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে সময় ও খরচ বেশি হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা যায়, একের পর এক মানুষ সেতুটি পার হচ্ছেন। কেউ হেঁটে, কেউ সাইকেলে, আবার কেউ সাইকেলে মালামাল বহন করে পার হচ্ছেন। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও ছিল।
রেললাইনের মাঝখানে বসানো কাঠের পাটাতনের সরু পথ ধরে চলছিল এই ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার।
সেতু পার হওয়ার সময় রহনপুর এবি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বাবা-দাদুরা এই সেতু দিয়ে চলাচল করেছেন। এখন আমরাও করি। বেলি সেতু দিয়ে যাওয়া-আসায় সময় বেশি নষ্ট হয়। তাই শর্টকাট এই সেতু দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করি।’
মোসা. ঝর্ণা নামে এক কলেজছাত্রী বলেন, ‘নদীতে পানি বেশি থাকলে ভয় লাগে। আবার কম থাকলেও ভয় লাগে। সেতু থেকে নদী অনেক গভীর মনে হয়। বর্ষায় পানি আরও বেড়ে যায়। এই সেতু দিয়ে ট্রেনও চলাচল করে।’
তিনি বলেন, ‘রেল কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের চলাচল নিষেধ করে নোটিশ দিয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেন আসার আগে সতর্কও করা হয়। তাই এই সেতু ব্যবহার না করাই ভালো।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা সাব্বির আলী বলেন, পুনর্ভবা নদীর পশ্চিমে আলীনগর ও বাঙ্গাবাড়ি—এই দুই ইউনিয়ন অবস্থিত। এসব এলাকায় বড় কোনো হাট-বাজার না থাকায় স্থানীয়দের কেনাকাটা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে রহনপুর বাজারে আসতে হয়।
তার ভাষ্য, রহনপুরের বেলি সেতু দিয়ে আসা-যাওয়া করা গেলেও সেটি মূল বাজার থেকে দূরে। ফলে সেখান থেকে যানবাহনে করে বাজারে আসতে সময় ও অতিরিক্ত খরচ লাগে। এ কারণে অনেকে ঝুঁকি জেনেও রেলসেতুটি ব্যবহার করেন।
আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মুহম্মদ মাসুস বলেন, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৭০-৮০ হাজার মানুষের বসবাস। সোমবার রহনপুরে হাটের দিন হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ওই দিন অন্তত ১০ হাজার মানুষ চলাচল করেন বলে দাবি করেন তিনি।
চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিদিনও প্রায় তিন হাজার মানুষ, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এই পথে যাতায়াত করে। বেলি ব্রিজ দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ‘বেলি ব্রিজের অবস্থাও নাজুক। কিছুদিন পর সেখানে কাজ শুরু হবে। তখন মানুষের একমাত্র ভরসা হবে রেলসেতুটি। কিন্তু বেলি ব্রিজ ভেঙে কাজ শুরু হলে যানজট আরও বাড়বে।’
রেলসেতু দিয়ে চলাচল না করতে তিনি অনেক সময় মানুষকে নিষেধ করেছেন জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘কিন্তু নিষেধ করাটাও অমানবিক মনে হয়। সেতুর ওপর কাঠের পাটাতনগুলো ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।’
রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মীর্জা কামরুল হক বলেন, প্রতিদিন রাজশাহী থেকে পাঁচটি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে দিনে একটি, কখনো দুটি ট্রেন রহনপুরে আসে। এসব ট্রেনে বিপুলসংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেন।
তিনি বলেন, ‘রেল ব্রিজে আমরা সাধারণত মানুষকে চলাচলে নিরুৎসাহিত করি। তারপরও স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা কাঠের পাটাতন বসিয়েছে। সেখান দিয়ে মানুষের চলাচল করে।’
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুর ওপর দিয়ে মানুষের চলাচল বন্ধ করতে হলে নিরাপদ ও সহজ বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ ব্যবহার করতেই থাকবে।
(ঢাকাটাইমস/০৮ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































