ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ‘গায়েব’!

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ইসমাইল হত্যা মামলায় সেই প্রতিবেদনই ‘গায়েব’! সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাঠানোর আট মাসেও পৌঁছেনি তদন্ত কর্মকর্তার হাতে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি গ্রহণের তথ্য থাকলেও আশুগঞ্জ থানার তদন্ত শাখা বলছে, তারা প্রতিবেদনটি পায়নি। এদিকে হত্যাকাণ্ডের ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও আদালতে দাখিল হয়নি চার্জশিট। অথচ মামলার দুই এজাহারভুক্ত আসামি স্বামী-স্ত্রী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। নিহত পরিবারের অভিযোগ, তদন্তে গাফিলতির কারণেই মামলাটি অকারণে দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আশুগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের লামা শরীফপুর গ্রামের মৃত উজির আলীর ছেলে ইসমাইল মিয়া (৬২) গত বছরের ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি স্বজনরা। পরদিন ২৪ জানুয়ারি ছেলে সাদ্দাম আশুগঞ্জ থানায় জিডি করেন। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিখোঁজ হওয়ার দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ইসমাইলের মোবাইলে সর্বশেষ কথা হয়েছিল পাশের হোসেনপুর গ্রামের সুমনের সঙ্গে। সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
একপর্যায়ে তিনি জানান, স্ত্রী শান্তা বেগম তার মোবাইল ফোনে ইসমাইলের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরে পুলিশ শান্তা বেগমকে হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে।
পুলিশের দাবি, প্রথমে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বসতঘর নির্মাণের জন্য জমি কিনতে ইসমাইলের কাছে ৫০ হাজার টাকা ধার চেয়েছিলেন শান্তা ও তার স্বামী সুমন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি করলে ইসমাইলের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ হোসেনপুর গ্রামের টানাপাড়া এলাকায় নকুল পালের পরিত্যক্ত বাড়ির সিঁড়ির নিচে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেয়া হয়। শান্তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে নিহতের ছেলে মরদেহ শনাক্ত করেন। মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি দুজন শান্তা বেগম (৩২) ও তার স্বামী সুমন (৩৭)। সুমন হোসেনপুর গ্রামের মন মিয়ার ছেলে।
গত বছরের ১৬ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। ২১ এপ্রিল সেটি পুলিশ সুপারের কার্যালয় গ্রহণও করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরপর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদনটি আশুগঞ্জ থানায় পাঠানো হয়। কিন্তু থানার তদন্ত শাখায় সেটি পৌঁছেনি। আশুগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) বলেছেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাঠানো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থানার তদন্ত শাখায় পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী সাদ্দাম অভিযোগ করেন, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী ছানোয়ার হোসেন ও বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দীপকের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণেই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি তদন্তে ব্যবহৃত হয়নি।
তবে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী ছানোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি আশুগঞ্জ থানায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
আশুদঞ্জ থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই দীপক বলেন, প্রায় সাত মাস আগে তিনি মামলার তদন্তভার পেয়েছেন। আগের তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া নথিতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি ছিল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রতিবেদনটি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানান।
নিহতের ছেলে সাদ্দাম বলেন, বাবাকে হারিয়েছি। এখন শুধু বিচার চাই। কিন্তু এতদিনেও চার্জশিট হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কোথায়, সেটাও জানি না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উবায়দুর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
(ঢাকা টাইমস/১৭আগস্ট/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































