অনন্য সাধারণ রাজনীতিক, অসাধারণ পার্লামেন্টারিয়ান

ভোটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একবার হেরেছিলেন। সেটি ১৯৭৩ সালে। তবে তাকে হারানো হয়েছিল কারচুপি করে। আর নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে মামলা করেন, জেতেন, এরপর সংসদে বসেন। তার মানে ভোটের ফলাফল আসলে তার পক্ষেই ছিল।
রাজনীতিক হিসেবে সুরঞ্জিত মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য ছিল তার প্রমাণ ভোটেই পাওয়া গেছে বারবার। ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ (উপনির্বাচন), ২০০১, ২০০৮ আর ২০১৪ সালে কখনও তাকে বিমুখ করেনি জনতা। তাকে জনতার নেতা বলাই যায়।
সুরঞ্জিত আরও অসাধারণ সংসদে। তার বাগ্নীতা, তীক্ষ্ণ যুক্তি আর উপস্থাপনার কোনো জুড়ি কি আসলে ছিল? ভবিষ্যতে এমন একজন পার্লামেন্টারিয়ান আসবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন অবধি সংসদে যারা বসেছেন, তাদের মধ্যে সুরঞ্জিতের মতো এতটা নাম করতে পেরেছেন কি কেউ?
বাংলাদেশের সংবিধা প্রণয়নে অংশ নিয়েছিলেন সুরঞ্জিত। সাংবিধানিক বিতর্কের সময় তার বক্তব্য সব সময় গুরুত্ব পেয়েছে। নিজ দলের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলও বরাবর তার প্রজ্ঞা, মেধার সম্মান জানাতে বাধ্য হয়েছে।
সংসদে এই নেতার সঙ্গে বসা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মনে করেন, কেউ পারেননি। তিনি বলেন, ‘সব দিক থেকে তিনি ছিলেন নাম্বার ওয়ান।’
এই নেতার মৃত্যুর খবর পেয়ে দলে দলে রাজনীতিকরা সকাল থেকেই ছুটে আসছেন ল্যাবএইড হাসপাতালে। এদেরই একজন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘সুরঞ্জিতের মৃত্যুতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। এটা কখনও পুরণ হওয়ার নয়।’
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন ও কর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তিনি নেই এমন সংবাদে আমাদের মাঝে শূন্যতা বিরাজ করছে। জানি না এই শূন্যতা পূরণ হবে কি না।’
সেনগুপ্তকে গতকাল রাত থেকেই ল্যাবএইড হাসপাতালেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে সংসদ সদস্যের শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
মরদেহ হাসপাতাল থেকে সকাল নয়টায় তার জিগাতলার বাসায় নেয়া হয়েছে। সেখানে সুরঞ্জিতকে দেখতে ছুটে যান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পদক জাহাঙ্গীর কবির নাকক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কার্য নির্বাহী সদস্য এস এম কামাল হোসেন, সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ।
হাছান সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি (সুরঞ্জিত) একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ছিলেন। যিনি রাজনীতিকে ব্রত মনে করতেন। আমার মতে তাঁরমত অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান দ্বিতীয়জন নেই।’

আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী বলেন, ‘সুরঞ্জিত দাদা ছিলেন অসম্পাদায়িক চিন্তা-চেতনার প্রতীক। দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা। তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, `বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সংসদীয় গঠনতন্ত্রের ক্ষেত্রে তিনি সরকারি দলে থাকেন আর বিরোধী দলে থাকেন সব সময় দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতেন। সংবিধান ও সংসদ সম্পর্কে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অতুলনীয় ছিল।’
জাসদের (একাংশ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তাঁর (সুরঞ্জিত) মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশে এ যাবতকালে যতজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন প্রজ্ঞায় তিনি প্রথম কাতারের।’
তুখোড় বামপন্থী থেকে আওয়ামী লীগের নেতা
সুরঞ্জিত ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিতের রাজনীতির শুরু বামপন্থী সংগঠনে। সাম্যবাদী দর্শনে দীক্ষা নিয়ে ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক জীবন শুরু করা এই নেতা দীর্ঘ ৫৯ বছর দাপটের সঙ্গেই চলেছেন।
রাজনৈতিক জীবনের কঠিনতম সময়ে কাউকে পাত্তা দিয়ে চলেননি সুরঞ্জিত। দুর্দান্ত সাহস দেখিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অর্জন করেছেন বহু সম্মান। তবে শেষ জীবনে রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েন।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন সুরঞ্জিত। তিনি ৫ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ চলতি নবম জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কমিটিরও কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৩৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আনোয়ারপুর গ্রামে জন্ম সুরঞ্জিতের। তার বাবা চিকিৎসক দেবেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও মা সুমতি বালা সেনগুপ্ত। তিনি দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেট এম সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সন্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ঢাকা সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশের এই প্রবীণ রাজনীতিক ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন।
সত্তরের ঐতিহাসিক প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয়ের সময়ও ন্যাপ থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
মন্ত্রিত্বপ্রাপ্তি ও বিতর্ক
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একবারই মন্ত্রিত্বের স্বাদ পান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তবে ২০১২ সালে রেলপথ মন্ত্রী হওয়ার অভিজ্ঞতা অবশ্য সুখকর ছিল না। রেলের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিলেও মন্ত্রীর একান্ত সহকারী ওমর ফারুক ৭০ লাখ টাকাসহ আটক হওয়ার পর ওঠা বিতর্কের পর মন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। আটক হওয়া কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, ওই টাকা তিনি সুরঞ্জিতের বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে পরে তদন্তে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। যদিও সুরঞ্জিতের রাজনৈতিক জীবনে এটাই সবচেয়ে কালো অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়।
(ঢাকাটাইমস/০৫ফেব্রুয়ারি/টিএ/জেআর/জেডএ/ডব্লিউবি)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































