ছাত্র সংসদ নির্বাচন: পরস্পর দোষারোপই সার

মহিউদ্দিন মাহী
ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৭, ১৬:৫৪ | প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৭, ১০:১৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫০তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচনের যে তাগিদ দিয়েছেন, সেটি কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে আছে সংশয়। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সরকারি ও বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠন- কেউই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। বরং ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করাই কেবল সার।

যদিও ছাত্র সংসদ নিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বেশ প্রশংসিত হয়েছে, এবং এ ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নড়েচড়ে বসছে বলে মনে করা হচ্ছে, কিন্তু এখনো বড় একটা অংশ চায় না ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক।

গত ৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ডাকসু নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘ডাকসু ইলেকশন ইজ মাস্ট, তা না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বশূন্য হয়ে যাবে।’

গত দুই যুগ ধরে ঢাবিসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, মূলত ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একাধিপত্য বজায় রাখার জন্য ছাত্রসংসদ নির্বাচনের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ পায় না।   

আবার যেসব ক্যাম্পাসে বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনগুলো কোণঠাসা, তারাও চায় না ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক।

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ মনে করেন, ছাত্রসংসদ নির্বাচন মানে ক্যাম্পাস অস্থির হওয়া, হানাহানি। ফলে তারা এ নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখান না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যেমন বলেন, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি কাউকে লাশ হতে হয়, সেই নির্বাচন তিনি চান না।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় পরিচয়ের প্যানেলে শিক্ষক সমিতি নির্বাচন হচ্ছে। সিন্ডিকেট, সিনেট, ডিন, কর্মচারী সমিতির নির্বাচনও হচ্ছে নিয়মিত। ছাত্রদের অভিযোগ, ডাকসু নির্বাচন দিলে শিক্ষকদের কর্তৃত্ব কমে যাবে, এই আশঙ্কাতেই নির্বাচন দিচ্ছে না প্রশাসন।

দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুন। অন্য দুই বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ে ১৯৯০ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নব্বই পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ১৯৯১, ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে তিনবার ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুনের পর গঠিত তদন্ত কমিটি ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু তা পানি পায়নি। এমনকি কাজ হয়নি আদালতের নির্দেশেও।

ডাকসু নির্বাচন চেয়ে ২০১৩ সালের ১২ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষার্থী। ওই বছরের ৮ এপ্রিল প্রাথমিক শুনানি শেষে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চান আদালত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি।

যদিও এর আগে ২০০৯ সালে ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দায়িত্ব নেয়ার পরই ডাকসু নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু গত আট বছরে এমন কোনো ঘোষণা আসেনি।

জানতে চাইলে উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ইচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক নানা সমস্যার কারণে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে পারিনি আমরা। এই নির্বাচনের জন্য সব ছাত্রসংগঠনকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। কিন্তু তারা একমত হতে পারে না কোনো বিষয়ে।’

কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের অভিযোগের আঙুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দিকে। তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অস্থিতিশীলতার অজুহাতে নির্বাচন দেন না। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা বর্তমান প্রশাসনের কাছে অনেকবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য দাবি জানিয়েছি।’

আরেক প্রধান ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসানের বক্তব্যে অবশ্য ভিসি আরেফিন সিদ্দিকের অভিযোগের রেশ পাওয়া যায়। রাজিব বলেন, তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। তবে এর আগে বেশ কিছু দাবি পূরণ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগে সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

ঠিক একই দাবি ছিল ছাত্রলীগেরও, যখন বিএনপির শাসনকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাধিপত্য ছিল ছাত্রদলের।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগে ছাত্রসংগঠনগুলোর সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মুহম্মদ মিজানউদ্দিনও। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন ছাত্ররাজনীতিকে অনেকে এখন নেতিবাচক হিসেবে দেখে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেই নেতৃত্ব তৈরি হবে, তা মনে করেন না তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হয়েছে সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে। তখন ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন যথাক্রমে বিএনপির বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এবং বিচার প্রশাসনে কর্মরত রুহুল কুদ্দুস বাবু।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে রাবি ভিসি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি এখন সবার কাছে একটা খারাপ বিষয় বলে মনে হয়। আগে ছাত্ররা যাতে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করে সে পথ তৈরি করতে হবে। ছাত্রনেতাদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি হানাহানিমুক্ত বা অহিংসাপরায়ণ হলেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া সম্ভব।’

রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়ার দাবি, সবাই চায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক। কিন্তু রাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আসিফ হাসান বলেন, তারা ছাত্রসংগঠন হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হলেও তা তেমন গ্রাহ্য হয় না কর্তৃপক্ষের কাছে। নির্বাচিত রাকসু থাকলে তাদের মাধ্যমে দাবিগুলো উপস্থাপন করলে তা আরো জোরালো হতো।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, নব্বইয়ের পর গত ২৭ বছরে এখান থেকে দুজন করে হলেও ৫৪ জন নেতা পেত জাতি। কিন্তু সেটি হয়নি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন যাদের আমলেই হোক, তাকে স্বাগত জানাবেন বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-চাকসু নির্বাচন ১৯৯০ সালের পর আর হয়নি। তখন ভিপি ও জিএস হন যথাক্রমে নাজিম উদ্দীন ও আজিম উদ্দীন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও চায় চাকসু নির্বাচন হোক। কিন্তু কেন কায্যকর পদক্ষেপ নেই। জানতে চাইলে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কিন্তু এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি ছাত্রদের লাশ হতে হয়, সেই নির্বাচন তো আমি চাই না।’

ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতার আশঙ্কা করেন বরিশালের বি এম কলেজের অধ্যক্ষ ইনামুল হাকিমও। সম্প্রতি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। তারা পারলে অন্যান্য কলেজ কেন পারবে না- এমন প্রশ্নের জবাবে বরিশালের বি এম কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, বি এম কলেজ অত্যন্ত বড় একটি কলেজ। দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কলেজ এটি। এখানে একটি নির্বাচন দিলে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হবে, সেটির বিষয়ও তো মাথায় রাখতে হবে।

ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব

ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রধান মঞ্চ হিসেবে অতীতে ছাত্র সংসদগুলো রেখেছে নানা ভূমিকা, তৈরি করেছে নতুন নেতৃত্ব ও চেতনা। কিন্তু নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় কোনো যোগ্য প্রতিনিধিত্ব গড়ে উঠতে পারছে না। ডাকসুর মতো শক্তিশালী প্লাটফর্ম অকার্যকর থাকায় আবাসিক হলগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম বিরাজ করলেও সাধারণ ছাত্রদের প্রতিবাদের কোনো উপায় নেই। ফলে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রসংগঠনগুলোর জবাবদিহি কমে গেছে বলেও মনে করেন শিক্ষার্থীরা। জবাবদিহি না থাকায় ছাত্রদের জোর করে মিছিলে নেয়া, হলের বৈঠকে অংশ নিতে বাধ্য করা, কথা না শুনলে হয়রানি ও মারপিট, চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে।

হলগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বন্ধপ্রায়। আন্তঃহল প্রতিযোগিতা শেষ কবে হয়েছে বলতে পারে না কেউ। আবার ছাত্রদের নানা দাবি-দাওয়া শিক্ষক বা প্রশাসনের কাছে তোলারও নির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই।

উদাহরণ সৃষ্টি করেছে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ

১৩ বছর পর ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়েছে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের (রুকসু)। ছাত্রলীগ-ছাত্রদল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনে ছাত্রলীগের কাওসার-রিয়ান-অমিত পরিষদ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। গত ২৬ জানুয়ারি এ নির্বাচন হয়।

নির্বাচনে ১৬টি পদে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল থেকে দুটি প্যানেলে ৩২ জন এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

এর আগে গত ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষে এ কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছিল। ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও গোলযোগের কারণে পরে তা স্থগিত হয়ে যায়।

(ঢাকাটাইমস/১১মার্চ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত