মানবিক পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান
 | প্রকাশিত : ০৬ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:৩২

ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া বাংলাদেশের পুলিশ। দেশের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ আইনের মতো পুলিশ এ্যাক্ট কিংবা পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল ব্রিটিশদের তৈরি করা যা দিয়ে পরিচালিত হয় পুলিশ। ব্রিটিশদের লক্ষ্যই ছিল কীভাবে উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণকে দাবিয়ে রাখা যায়। তাই শাসকগোষ্ঠী পুলিশকে চিন্তা করেছে পুলিশ ফোর্স হিসেবে, পুলিশ সার্ভিস বা সেবা হিসেবে নয়। শাসকগোষ্ঠীর এই ধরণের চিন্তা চলমান ছিল পাকিস্তান কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও। কিন্তু সময়ের সাথে পরিবর্তন আসছে পুলিশেও। চেষ্টা চলছে আরো গণমুখী বাহিনী হিসেবে পুলিশকে কীভাবে গড়ে তোলা যায়। তারই দুটি প্রচেষ্টা মানবিক পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং।

তবে কমিউনিটি পুলিশের শুরু আরো আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশির দশকে যখন পুলিশের সহিংস আচরণের কারণে জনগণের মাঝে পুলিশের উপর বিশ্বাস কমে যাচ্ছিল, তখনই আলোচিত হয় কমিউনিটি পুলিশ ধারণাটি। তবে এর আগে ১৮২৯ সালে আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার জনক ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিল গণমুখী পুলিশ বিষয়ে বলতে গিয়ে পুলিশই জনগণ, জনগণই পুলিশ ধারণাটি নিয়ে আসেন। যার উপর ভিত্তি করে আজকের কমিউনিটি পুলিশিং ধারণা প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহে প্রথম কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা চালু হয়। এর পরের বছর ঢাকা মহানগরীর দুটি থানায় নতুন এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু হয়। আর ২০০৫ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই গণমুখী পুলিশি ব্যবস্থা।

পুলিশের পক্ষে ১৬ কোটি মানুষের দেশে নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে। কমিউনিটি পুলিশংয়ে সাধারণ মানুষের সেই অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। আর কমিউনিটি পুলিশের কমিটির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে পুলিশের একটি সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। স্নাতক পর্যায়ে পুলিশিং কোর্সটি পড়াতে গিয়ে দেখেছি, পুলিশ সমাজের সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি। অথচ পুলিশই সমাজে নেতিবাচক উপস্থাপিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পড়ে। অথচ কোন ভবনে আগুন লাগলে, দমকলের আগে হয়ত পুলিশকে গিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা হলে, হাইওয়ে পুলিশকে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের লাশ নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে হয়। মানুষ তার বিপদে সবার আগে পুলিশের কাছে যায়। বিপদে সবার আগে পেলেও, পুলিশের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে সব সময়ই প্রশ্নের মধ্যে থাকে কয়েক জন পুলিশের মন্দ কাজের জন্য। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম পুলিশের ইতিবাচক কাজের চেয়ে নেতিবাচক কাজের প্রচারকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

জনগণের মধ্যে পুলিশকে নেতিবাচকভাবে দেখার ফ্রেমিং তৈরি হয়। আর যখন পুলিশ তৃণমূল মানুষের কাছে গিয়ে তার সমস্যা শুনছে, উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হচ্ছে, তখন জনগণের মধ্যেও পুলিশকে নিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি হতে শুরু করে। কমিউনিটি পুলিশিং এই আস্থাকে আরো সমুন্নত রাখতে সহায়তা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ তার প্রথাগত কাজের বাইরে গিয়েও নতুন ঘরানার পুলিশিং ব্যবস্থা আনার চেষ্টা করছে, যা নিঃসন্দেহে বিরল। দুটি উদাহরণ এক্ষেত্রে টানা যায়- এখন সিলেট রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি নজরুল ইসলাম জামালপুরের পুলিশ সুপার থাকা অবস্থায় বিনা বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া এক দম্পতিকে মুক্ত করে আনেন। বাসার কাজের মেয়েকে হত্যার দায়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অথচ সেই মেয়ে পালিয়ে হবিগঞ্জে গিয়ে বিয়ে করে ঘর সংসার শুরু করে অথচ তাকে হত্যার জন্য কারাদণ্ড হয় ওই দম্পতির। পরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ওই দম্পতির মুক্তির ব্যবস্থা করেন জামালপুরের সেই সময়কার পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম। এসপি নজরুল ইসলামের এই মহতী উদ্যোগের কারণে প্রাণ ফিরে পান ওই দম্পতি।

আরেকটি ঘটনা বেদেদের নিয়ে। পুলিশ সদর দপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমান সমাজের পিছিয়ে থাকা অবহেলিত বেদে সম্প্রদায়ের উপার্জনের ব্যবস্থা করে তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছেন। সাভারের বংশী নদীর তীরের বেদেপল্লীর ২০ হাজার সদস্যের দিনবদলের জন্য স্কুল, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বুটিক শপ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই মানবিক উদ্যোগের কারণে বেদে সম্প্রদায়ের জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে। পাল্টে গেছে বেদেদের জীবনযাত্রা।

হাবিবুর রহমান শুধু বেদেদের জন্য নয়, তিনি হিজড়াদের সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন; তাদের জীবিকার জন্য গড়ে তুলেছেন বিউটি পার্লার, টেইলরিং শপ আরো অনেক কিছু। পুলিশের এমন মানবিক কাজের উদাহরণ আরো অনেক আছে। যা পাদপ্রদীপের আলোয় সব সময় আসে না।

কমিউনিটি পুলিশিং যেখানে মানুষের সাথে পুলিশের সংযোগ তৈরি করছে, সেখানে মানবিক পুলিশিং সমাজের অবহেলিত মানুষকে মূল স্রোতে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। নতুন যুগের এই দুই পুলিশিং নিঃসন্দেহে জনগণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন নিয়ে আসবে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান

শিক্ষক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত