আরও হয়রানির আশঙ্কায় ডিআইজি মিজানের সেই স্ত্রী

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৯, ১০:৩১
ডিআইজি মিজান

পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান যে নারীকে পিস্তলের ভয় দেখিয়ে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই নারী আরও হয়রানি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এই শঙ্কার কথা জানান তিনি।

ওই নারী গত ৭ জুন তার বিয়ের কাবিননামার আংশিক ছবি পোস্ট করেন। এতে তিনি লেখেন, ‘তার জন্য কি কম হয়রানি হলাম! সামনে হয়তো আরও বাকি আছে। প্রবলেম নাই। আই এম রেডি টু ফেস ইট নাও।’

ওই নারী এখন নিজেকে অনেকটাই আড়াল করে রেখেছেন। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি ধরেন না। যে ফেসবুক আইডিটি তিনি চালান, সেখানে ইনবক্সে ম্যাসেজ করা হলেও তিনি সাড়া দেন না।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় ডিআইজি মিজান ওই নারীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ আছে। এ নিয়ে তোলপাড় হলেও পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে ওই বছরের ডিসেম্বরের শেষে ডিআইজি মিজানকে ঢাকা মহানগর পুলিশ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদরদপ্তরে। পুলিশের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। সে কমিটি তদন্ত করে মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ পায়। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেই প্রতিবেদন জমাও পড়ে। কিন্তু মিজানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই আর নেয়া হয়নি। 

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ডিআইজির আরেক কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নারী সংবাদ পাঠিকার সঙ্গে টেলিফোনালাপ ফাঁস হয়। ডিআইজি ওই নারী এবং তার স্বামীকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন। ওই সংবাদ পাঠিকা সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু তার কোনো তদন্তই হয়নি।

এরপর ওই নারী জানতে পারেন, তার নামে ফেসবুক পেজ খুলে অশালীন ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করেন। কিন্তু তারও কোনো অগ্রগতি হয় না।

এর মধ্যে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে নামে দুদক। আর তদন্ত কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা বলে বেড়াচ্ছেন ডিআইজি। আইনবিরুদ্ধ কাজের কথা স্বীকার করার পরেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, বারবার তাকে কেন এভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

গণমাধ্যমে যেভাবে সংবাদ শিরোনাম হন ডিআইজি  

গণমাধ্যমে আসা বর্ণনা অনুযায়ী, চাকরির জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে এক বান্ধবীর মাধ্যমে সে সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় ওই নারীর। এর মধ্যে কানাডা প্রবাসী একজনের সঙ্গে তার বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক। কিন্তু সব জানতে পেরে ডিআইজি মিজান বাগড়া দেন। নানা ঘটনার পর ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই পান্থপথের বাসা থেকে কৌশলে গাড়িতে তুলে জোরপূর্বক ৩০০ ফুট এলাকায় নিয়ে যান।

সেখানে মারধর করে রাতে ওই নারীকে তার বেইলি রোডের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে সুস্থ করার কথা বলে ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করেন। এ সময় সেখানে ডিজাইজির এক ডাক্তার বন্ধু উপস্থিত ছিলেন। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে ওই নারী ঘুম থেকে জেগে দেখেন তার গায়ে মিজানের স্লিপিং ড্রেস এবং তিনি তার বেডরুমে। এক পর্যায়ে তিনি আত্মহত্যা করবেন বলে দৌড়ে রান্নাঘর খুঁজতে থাকেন। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন মিজানের দুজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী ও গাড়িচালক।

এ সময় খবর পেয়ে ডিএমপি কার্যালয় থেকে ছুটে আসেন মিজানুর রহমান। ওই নারীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। আশ্বাস দেন তাকে দ্রুত তার বাসায় রেখে আসবেন। ওই নারীর প্রশ্নের মুখে তিনি আগের রাতের ঘটনায় ক্ষমা চান। কিন্তু তাকে শান্ত করতে না পেরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলেন। এভাবে ১৪ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত তিন দিন মেয়েটিকে বাসায় আটকে রাখেন তিনি।

ওই মেয়ের বাবা বেঁচে নেই। খবর দেওয়া হলে বগুড়া থেকে তার মা ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় ডিআইজির বেইলি রোডের বাসায় উপস্থিত হন। মেয়েকে কেন আটকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে ডিআইজি মিজান ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন। এরপর বলেন, ‘এখান থেকে মুক্তির একটাই পথ আছে। তা হলো আপনার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে।’

মা-মেয়ে কেউ রাজি না হলে টেবিলে পিস্তল রেখে মা-মেয়েকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক বাকবিত-ার এক পর্যায়ে ৫০ লাখ টাকা কাবিনে মেয়েকে বিয়ে দিতে মাকে বাধ্য করা হয়।

বিয়ে পড়ানোর জন্য মগবাজার কাজী অফিসের কাজীকে ডেকে আনা হয়। বিয়ের উকিল বাবা হন ডিআইজি ব্যক্তিগত গাড়িচালক গিয়াসউদ্দিন। সাক্ষী করা হয় দেহরক্ষী জাহাঙ্গীরকে। বিয়ের পর ওই রাতে মা-মেয়েকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরে লালমাটিয়ায় ভাড়া ফ্ল্যাটে গোপনে দ্বিতীয় সংসার শুরু করেন ডিআইজি মিজান। ওই ফ্ল্যাটের নিচে সাদা পোশাকে পুলিশের দুই সদস্যকে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা হয়। সেখানে ওই নারীর জীবন কাটে অনেকটা বন্দি অবস্থায়। অনেক চেষ্টা করেও নিজের ভাইকে ফ্ল্যাটে রাখার অনুমতি পাননি।

এভাবেই কেটে যায় চার মাস। এক দিন তিনি মিজানকে স্বামী পরিচয় দিয়ে অফিসে মুডে থাকা একটি ছবি ফেসবুকে আপ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হন মিজানুর রহমান। ফেসবুক থেকে দ্রুত ছবিটি সরিয়ে ফেলতে তিনি লালমাটিয়ার বাসায় ছুটে আসেন।

সেপ্টেম্বরের এ ঘটনার পর দুজনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ওই নারী মিজানের স্ত্রী পরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অটল থাকেন। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলা করা হয়। এ মামলায় ওই নারীকে ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তার বিরুদ্ধে ভুয়া কাবিন করার অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা করা হয়।

আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভুয়া কাবিননামার মামলাটি অনুসন্ধান করতে গেলে একে একে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার বিস্তারিত বেরিয়ে আসে।

এরপর ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে মিজান জামিনের ব্যবস্থা করেন। ২১ দিন কারাভোগের পর ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর জামিন পান। কিন্তু গণমাধ্যমে খবরটি ফাঁস হয়ে যায়।

(ঢাকাটাইমস/১৬জুন/এএ/ডব্লিউবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :