সিনেমা যখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:০৪

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নানা ইস্যুতে দেশটির নেতাদের মতো সোচ্চার থাকেন সাধারণ মার্কিনিরাও। তবে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একটি সিনেমা নিয়ে দেশটিতে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে তা নজিরবিহীন।

সুপারহিরো দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ভিলেন বা খলনায়ক চরিত্র নিয়ে বানানো সিনেমা জোকার মুক্তি পেয়েছে গত শুক্রবার, সপ্তাহ পেরনোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের।

মুক্তির পর প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে সিনেমাটি। কিন্তু এই সিনেমা ইতিমধ্যে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ বাড়িয়েছে। যেদিন সিনেমা মুক্তি পায়, সেই দিনই সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির ঘটনা বৃদ্ধির ‘বাস্তব ঝুঁকি’ রয়েছে বলে নিজেদের সদস্যদের সতর্ক করেছে।

সাত বছর আগে ব্যাটম্যানের ওপর ভিত্তি করে বানানো সিনেমা ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’ এর এক প্রদর্শনীর সময় কলোরাডোর অরোরায় এক গোলাগুলির ঘটনায় ১২জন নিহত এবং ৭০জন মানুষ আহত হয়েছিল।

সেই ঘটনায় নিহত-আহতদের পরিবারের অনুরোধে অরোরায় ‘জোকার’ মুক্তি দেয়া হয়নি। সিনেমার প্রযোজক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে পরিবারগুলো চিঠি লিখে আবেদন জানায় যেন তারা সিনেমা থেকে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত মানুষের জন্য ব্যয় করে।

চিঠিতে পরিবারগুলো ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত আইনের সংস্কার যারা চায় না, এমন কোন পার্টিকে যেন তারা ভবিষ্যতে কোনদিন রাজনৈতিক অনুদান না দেয়।

সমাজের সকলকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানেরও, সেইটি মনে করিয়ে দেবার লেখা হয়েছে চিঠিতে। এই পরিবারগুলোর অনেকের অভিযোগ, সিনেমাটি জোকারের আজব কর্মকাণ্ডকে লঘুভাবে উপস্থাপন করেছে, ফলে অনেকেই সন্ত্রাসী কাজে উৎসাহিত হতে পারেন।

আমেরিকার কয়েকটি শহরের সিনেমা হল ঘোষণা করেছে, মুখোশ পরে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে কেউ হলে ঢুকতে পারবেন না। সুপারহিরো সিনেমা মুক্তির সময় মুখোশ পরে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে সিনেমা দেখতে আসার রেওয়াজ রয়েছে সারা দুনিয়াতেই।

উদ্বেগের কারণ কী?

জোকার সিনেমা মূলত আর্থার ফ্লেক নামী একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির গল্প, যার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা তাকে এক সময় সহিংস করে তোলে। সিনেমায় অনেক অ্যাকশন ও সহিংস মারপিটের দৃশ্য রয়েছে। ফ্লেকের ন্যারেটিভকে গুরুত্ব দিয়ে হাজির করার জন্য পরিচালক টড ফিলিপসকে দুষছেন সমালোচকেরা।

ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের রিচার্ড লসন সিনেমাটিকে একজন অসুস্থ মানুষের ‘একটি কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে সিনেমার সমালোচনা দেখে বিস্মিত হয়েছেন পরিচালক ফিলিপস।

তিনি বলেন, ‘সিনেমাতে ছোটবেলার কোন দুঃসহ স্মৃতি, ভালোবাসা এবং মমতার অভাবের কথা বলা হয়েছে। আমার মনে হয় মানুষ ক্রমে এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারবে। আর সাধারণভাবে বললে শিল্প মাত্রই কিছুটা জটিল হবে, আপনি খুব সরল কিছু খুঁজলে ক্যালিগ্রাফি দেখুন গিয়ে!’

জোকারের সমালোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র বামদের দুষেছেন সিনেমার পরিচালক। তার কথায়, ‘যারা ভুল বোঝার তারা সব সময়ই ভুল বুঝবে, পরিচালকের দায়িত্ব নয় সবাইকে ভালো মন্দের জ্ঞান দেয়া’।

ছবি মুক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে সিনেমার এহেন সমালোচনায় কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন মূল চরিত্রে রূপদানকারী ফিনিক্স। তিনি জানান, ‘আমার মনে হয় কোন সিনেমা যদি আপনাকে ভিন্নভাবে ভাবতে শেখায়, সেটা মন্দ নয়। সে কারণেই সিনেমাটা করতে রাজী হয়েছিলাম আমি। আমার জন্য সহজ ছিল না ব্যপারটা, প্রস্তুতির সময় আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে।’

ছবির অভিনেতা কারণে বিতর্ক আর সমালোচনা বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ ফিনিক্স খল চরিত্রের জন্য সুপরিচিত। আর নেতিবাচক চরিত্র অনেকের কাছেই ভালো লাগার বিষয়।

জোকার মনস্তত্ত্ব নামে বই এর লেখক মনোবিদ ট্রাভিস ল্যাংলি মনে করেন, ‘আমরা ধারণা করতে পারি যে আমাদের মনের একটি অংশ ভালোবাসে ভাবতে যদি বিধিনিষেধ না থাকতো তাহলে আমরা কি করতাম।’

ওয়ার্নার ব্রাদ্রার্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কোন খল চরিত্রকে মহিমান্বিত করেনি। কাল্পনিক চরিত্র জোকার বা সিনেমা কোথাওই বাস্তবজীবনে সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এমন ভাবনা কেউ ভেবে থাকলে ভুল করেছেন। সিনেমার বা নির্মাতার বা প্রযোজক প্রতিষ্ঠানের কারো উদ্দেশ্যই মোটেও তা নয়।

ওয়ার্নার অবশ্য জোকার থিমের বেশ কিছু পন্য বাজারে ছেড়েছে, এর মধ্যে রয়েছে একটি মেরুন ব্লেজার। ফিনিক্স পরেছিলেন এমন ব্লেজারের রেপ্লিকা ৭৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন এমনিতেই সমাজে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এখন এই সিনেমার কারণে অনেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করতে পারেন। সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় সব দেশেই মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের ভালো চোখে দেখা হয় না।

এখনো পর্যন্ত সিনেমা দেখে দর্শকেরা বাহবা দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে নেতিবাচক প্রচারণার কারণেও অনেক দর্শক সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন। ছবি মুক্তির প্রথম সপ্তাহে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ডলার, যা অক্টোবর মাসে মুক্তি পাওয়া কোনো ছবির জন্য একটি রেকর্ড।

এছাড়া এ মাসের শুরুতে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সিনেমার পুরষ্কার জিতেছে জোকার।

ঢাকা টাইমস/১৩অক্টোবর/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :