এখনো ‘ট্রমা’য় বুয়েট ক্যাম্পাস

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:০৭

পলাশির মোড় থেকে শেরে-ই বাংলা হলের দিকে যাওয়া রাস্তাটি মধ্যদুপুরে সাধারণত সরগরম থাকে। বৃহস্পতিবার সে রকমটি নেই। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে দুই দিন ধরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কারণে হয়তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে পাশের প্রতিটি দেয়ালে বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার বিচার চেয়ে আঁকা গ্রাফিতিগুলো জ্বলজ্বল করছে। মৌনতার মধ্যে যেন উচ্চকিত কোনো সম্মিলিত কণ্ঠ।

কার্তিকের মেঘেঢাকা দুপুরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাস ভেঙে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলের গেটে ঢুকে বোঝা গেল শুনশান চারপাশ। এ যেন ঝড়ের পরের নীরবতা। নিস্তব্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্রাবাসগুলো।

বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের-১৭ ব্যাচের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে সহপাঠীদের আন্দোলনে  চলতি মাসের ৭ অক্টোবর থেকে উত্তাল ছিল বুয়েট অঙ্গন। পরে শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি মেনে নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই শান্ত পরিস্থিতি এখন অন্যরকম নীরবতায় পর্যবসিত হয়েছে।

ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টের জেরে গত ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। এই হত্যাকাণ্ড এবং পরের আন্দোলনের ট্রমা কাটেনি এখনো বুয়েটে।

প্রকৌশলবিদ্যায় দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে র‌্যাগিংয়ের নামে এবং ছাত্ররাজনীতির দাপটে কোনঠাসা ছিলেন সাধারণ ছাত্ররা। নির্যাতনের মাত্রা এমনই ছিল যে, কেউ এ ব্যাপারে মুখ খোলার কিংবা প্রতিবাদের সাহস পেত না। আবরারকে যখন নির্মমভাবে পেটানো হয় তার আর্তচিৎকার শুনেও তাই কেউ এগিয়ে যেতে পারেনি। এমনকি এই এ খবর কাউকে জানাতেও সাহস করেনি কেউ। আবরার নিহত হওয়ার পর ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। বেরিয়ে আসে বুয়েটে নির্যাতনের ভয়াবহ সব কাহিনী।

আন্দোলনের ঝড় শেষে বুয়েট এখন কেমন আছে দেখতেই এই প্রতিবেদকের সরেজমিন যাত্রা। কড়া নিরাপত্তায় স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বহিরাগতদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। শেরে-এ বাংলা হলের প্রবেশমুখে নিরাপত্তা প্রহরীর বাধা। পরে সংবাদকর্মী পরিচয় পেয়ে বসতে দেওয়া হলো এই প্রতিবেদককে।

সেখানে অবস্থান করতে করতে জানা গেল, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে এই হলের প্রতিটি ব্লকে বাড়তি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আগের ১৬টি ক্যামেরার স্থলে এখন ৩১টি। ছাত্ররাজনীতির নামগন্ধ নেই কোথাও। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি আছে।

মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হিয়ানের (ছদ্মনাম) সঙ্গে হলের বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে বোঝা গেল প্রাণহীন হয়ে আছে ছাত্রাবাস। কিছু রুমে তালা দেওয়া। হিয়ান বলেন, আবরার হত্যার এজাহারভুক্ত সব আসামির রুম প্রশাসন তালা মেরে রেখেছে। সিলগালা করা হয়েছে বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেলের শেরে বাংলা হলের ৩০১২ নম্বর কক্ষটি। আবরার ফাহাদের কক্ষটিও তদন্তের স্বার্থে তালা দেওয়া আছে।

‘এখন হলে কোনো ধরনের পলিটিক্যাল শব্দ নেই’ হিয়ান বলেন, ‘পুরনো যারা ইতিমধ্যে শিক্ষাবর্ষ শেষে পাস করেছেন, তাদের প্রত্যেককে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নোটিশ দিয়ে হলছাড়া করেছে। এমনকি যারা পলিটিকস করত তারাও এখন আর হলে আসে না।’

হিয়ানের কথায় আরও জানা গেল, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় বুয়েটে ছাত্রদের মধ্যে যে ভয় ঢুকেছে, এখনো তা থেকে বেরোতে পারেনি তারা। হল ঘুরে তার কথার সত্যতা মেলে। রুমমেটদের সঙ্গেও অনেকে ঠিকঠাক কথা বলছেন না বলে জানান হিয়ান।

এই অস্বাভাবিকতা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে বুয়েট প্রশাসন। শেরে-ই বাংলা হলের নতুন প্রভোস্ট মঞ্জুর মোর্শেদ ছাত্রাবাসের বর্তমান আবস্থা সম্পর্কে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের একজন ছাত্র হত্যার শিকার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ছাত্ররা এ ঘটনায় মর্মাহত। আমরা একটি বড় সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছি। আমরা ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিচ্ছি, যাতে ভবিষতে এ ধরনের অনাকাঙিক্ষত ঘটনা না ঘটে।’

সোহরাওয়ার্দী হলেও কড়াকড়ি

শের-ই বাংলা হল পার হয়ে একটু এগিয়ে গেলেই সোহরাওয়ার্দী হল। সেখানে গেটের সামনে গিয়ে চোখে পড়ে একটা ছোটখাটো জটলা। একজন ছাত্রের সঙ্গে দুজন অতিথি এসেছে, কিন্তু নিরাপত্তারক্ষী তাদের হলের ভেতরে যেতে দেবেন না। বড়জোর গেস্ট রুমে বসতে পারেন অতিথি। ভেতরে যেতে হলে হল প্রভোস্টের অনুমতি নিতে হবে শিক্ষার্থীকে।

নিরপত্তারক্ষীর ভাষ্য, হলের পুরনো ছাত্রদেরই বের করে দিয়েছে প্রশাসন, আর বাইরের লোক ঢুকতে দেবে! ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউশ সানি এই হলের যে রুমে থাকতেন (৩২১) সেটিও সিলগালা করা হয়েছে। যারা রাজনীতি করত তারা হলে আসে না এখন।

হলগুলোর যেসব আসন খালি হয়েছে সেগুলোতে নতুন ছাত্রদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু আসনে শিক্ষার্থীরা এখনো ওঠেনি বলে হল সূত্রে জানা গেছে। কারণ হিসেবে সূত্র জানায়, হয়তো এখনই উঠতে অস্বস্তি বোধ করছে তারা।

ছাত্রদের সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর বলে জানান সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো. শাহজাহান মন্ডল। বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের কোনোভাবেই বিপথে ঠেলে দিতে পারি না। আমরা শিক্ষকরা নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও তাদের রক্ষা করব। আবরারের ঘটনায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতা আর দীর্ঘ হতে দেব না আমরা। বুয়েট ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।’

হলের প্রাধ্যক্ষ জানান, হল ছাড়তে যাদের নোটিশ করা হয়েছে, ইতিমধ্যে তারা চলে গেছে। তাদের খালি সিটে নতুন ছাত্রদের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা মামলা এজাহারভুক্ত ১৯ আসামির ১৬ জন এবং এজাহারের বাইরে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাতজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এজাহারভুক্ত তিন আসামি জিসান (২১), এহতেশামুল রাব্বি তানিম (২০) এবং মোর্শেদ (২০) এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা সবাই বুয়েটের শেরেবাংলা হলে থাকতেন।

লালবাগ থানার আবরার হত্যা তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ বলছে, আবরার হত্যায় গুরুত্বপূর্ণ সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/২৬অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :