কবি আশরাফ আলী খান ও কঙ্কাল

প্রফেসর ড. গাজী আবদুল্লাহেল বাকী
 | প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০২০, ১০:৫৭

বিপ্লবের জগতে আশরাফ আলী খান এক উল্লেখযোগ্য নাম। বাড়ি তার ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থানার পানাইল গ্রামে। ১৯০১ সালের আগস্ট মাসে তার জন্ম। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে আশরাফ আলী পাড়ি জমালেন কলকাতা শহরে। ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এ সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে খেলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন চলছিল খুব জোরেশোরে। কলেজ ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দেন কবি এবং গ্রামে গিয়ে পুরোনো বন্ধুদেরকে নিয়ে দল গঠন করেন। কিন্তু ১৯২৩ সালে আন্দোলন খানিকটা স্তিমিত হয়ে এলে তিনি পুনরায় চলে আসেন কলকাতায়। এই সময় কিছুদিনের জন্য তিনি হায়দরাবাদ রেজিমেন্টে যোগদান করেন। ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ‘বেদুঈন’ নামে কবি একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমেই তার সাহিত্য জীবনে প্রবেশ। এ সময়ে তিনি মাসিক ৪৭ টাকা বেতনে ইনকাম ট্যাক্স অফিসে চাকরি নেন কিন্তু চাকরি করে সমাজসেবা করা যায় না বলে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেন। ‘বেদুঈন’-এর কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করার পর তিনি ‘তবলীগ’ নামে আর একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। ইতোমধ্যে কবি সমাজের যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে ‘দৈনিক সুলতান’ নামে একটি পত্রিকায় সমাজের ভণ্ড, অত্যাচারী, স্বার্থান্বেষী শোষণকারীদের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করেন।

এ সময় যুক্তবাংলার মুসলিম সাহিত্যিকদের ভেতর বেশ মতপার্থক্য ও নানারূপ দলাদলি ইত্যাদি দেখে কবি আশরাফের মন আফসোসে ভরে যায়। তিনি মনের দুঃখে বাংলা ছেড়ে বম্বে (মুম্বাই) চলে যান। কিছুদিন বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করার পর আবার তিনি ফিরে আসেন কলকাতায় এবং ‘সুলতান’-এর সম্পাদনার ভার পুনরায় গ্রহণ করেন। এ সময় ‘ছন্নছাড়া ক্লাব’ নামে একটি বিপ্লবাত্মক উপন্যাস ‘সুলতান’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। তৎকালীন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মি. টেগার্ড কবিকে উপন্যাসটির প্রকাশনা বন্ধের জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু হঠাৎ করে কবি ঢাকা চলে আসেন। এখানে সুবিধা না হওয়ায় পুনরায় কলকাতায় ফিরে যান। ‘বেদুঈন’ আবার প্রকাশ করতে থাকেন। কয়েক মাস পর ‘বেদুঈন’ বন্ধ হওয়ায় কবি আশরাফকে দারুণ অর্থ-কষ্টের সঙ্গে দিনযাপন করতে হয়। এ নিদারুণ অভাবের সময়ে তিনি ইকবালের ‘শিকওয়া’র অনুবাদ ও ‘কঙ্কাল’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। ‘কঙ্কাল’-এ কবির মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে:

‘স্রষ্টা তোমার সৃষ্টি এ-নহে সৃষ্টির কঙ্কাল,

ভেতরে প্রেতের অট্টহাসি এ, বাহিরেতে জমকাল;’

লেখাপড়া জানা সত্ত্বেও কবি ছিলেন বেকার। কোথাও চাকরি না পেয়ে কবি লেখেন:

‘বেকার জীবন ঠেলিয়া ঠেলিয়া চলিতে পারি না আর,

তিন দিন হতে সমানে চলেছে উপবাস অনাহার;

প্রকৃতপক্ষে কবি আশরাফ আলী খান ছিলেন ন্যায়, সত্য ও সমাজ-সচেতন। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভণ্ড, শোষক ও দুর্নীতিবাজদের ‘কঙ্কাল’ কাব্যে অত্যন্ত তীর্যক ঘৃণার দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। এঁকেছেন সমাজে গরিবের লাঞ্ছনা-গঞ্জনার নিখুঁত ছবি। তার কাব্যের পঙক্তিতে পঙক্তিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠে গ্লানি ও দুর্বিষহ দারিদ্র্যের কথা প্রতিধ্বনিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা। তিনি ধনীদের উদ্দেশ্য করে লেখেন:

‘ওগো মহারাজ তোমাদের কুকুর ফেলে দেয় যাহা রোজ,

তাতে হতে পারে আমাদের মত দশটি প্রাণীর ভোজ।

ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ মরেছে তোমরা পুশেছ পাখি,

বনের পাখিরে করেছ আপন মানুষেরে দূরে রাখি।

উল্লেখ্য, কবি আশরাফ আলী খানের হৃদয়গ্রাহী উপরের চার লাইন কবিতাসহ তার কাব্যধারার সঙ্গে আমাকে প্রথম পরিচিত করান আমার পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মরহুম এফ এম হাবিবুর রহমান। ১৯৬৫ সালের কথা। আমি তখন হ্যানি রেলওয়ে হাইস্কুল, খুলনার দশম শ্রেণির ছাত্র। তিনি আমাকে যারপরনাই স্নেহ করতেন এবং সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ থাকায় তিনি শ্রেণির বাইরে সাহিত্য আলোচনা করার সময় আরও কিছু সুন্দর সুন্দর কবিতার চরণ শেখাতেন। তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন এবং একজন সুপণ্ডিত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি যশোরের লোহাগড়া উপজেলায়। কবি আশরাফ আলীকে তিনি ভালোবাসতেন। যাহোক ‘কঙ্কাল’ কাব্যে বিভিন্ন ধর্মের ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কবি ছিলেন সোচ্চার। নিম্নের চরণগুলো হতে এ অভিব্যক্তি অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে পরিস্ফুটিত।

‘মসজিদে আজ আল্লা নাইরে বসেছে মোল্লারাজ,

বিশ্বাসী জনে কাফের করাই মোল্লা মিয়ার কাজ।

ভক্তের মন খোদার আসন এ কথা ভুলিয়া গিয়া,

আল্লারে ওরা বাঁধিয়া রাখিবে দাড়ি ও পাগড়ি দিয়া।

* * *

সারা মন্দিরজুড়ে বোসে আছে শুধু টিকি আর দাড়ি,

টিকির জুলুমে দেবতা গেছেন সব দেবালয় ছাড়ি’;

* * *

কটা চোখ দুটি ক্রোধে কটমটি পাদরী কহেনÑবেটা,

কালা হয়ে তুই কি সাহসে এলি? সাদার গির্জ্জা এটা।’

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধর্মের প্রতি কবির হৃদয় ছিল উদ্বেলিত। এত দুঃখ-কষ্ট তীব্র সংসার যাতনার মাঝে কবি আশরাফ আলী আল্লাহ ও রাসুলকে (সা.) ভোলেননি:

‘বুকে ভর করি কহিছে কাতরেÑ’কে আছ গো দয়াবান,

তিন দিন হোতে আছি অনাহারী বাঁচাও আমার প্রাণ।’

* * *

বজ্র-নিনাদে উঠিল আওয়াজ আমার বুকের মাঝেÑ

‘আল্লারে তুই খুঁজিস কোথায়! সে কি বাহিরেতে রাজে?

* * *

‘যাব না পেয়ারে নবী আমি তোমার মদিনাতে

শোকাগুণ জ্বালতে দ্বিগুণ শূন্য ঘরের আঙিনাতে।’

* * *

ধর্ম্মাধর্ম্ম পুণ্যপাপের মিটিবে না কভু গোল,

‘আসল’ বন্দিÑনিখিল জুড়িয়া ‘নকল’ বাজায় ঢোল,’

পারিবারিক ও সামাজিক ভালোবাসার প্রতি কবির ধারণা নিচের চরণসমূহে প্রস্ফুটিত। তবু এ ধারণার বাস্তবতা সব সময় সত্য হয় না:

‘কেউ বা কহিতÑ’পতি-পত্নীতে ভালোবাসা নাহি হয়,

সে শুধু গৃহের মঞ্চ জুড়িয়া সামাজিক অভিনয়;

খাঁটি ভালোবাসা সম্ভবে শুধু বন্ধু-যুগল মাঝে,

ত্যাগ-মহিমায় প্রোজ্জ্বল হোয়ে দেখা দেয় শত কাজে?’

কবি আশরাফ আলী ছিলেন অতি বাস্তববাদী। অর্থাভাবে যখন গভীর কষ্টে নিমজ্জিত তখন একদিন পশ্চিমবঙ্গের বেলেঘাটা হতে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত বার মাইল পথ হেঁটে কিছু টাকা ধার নেওয়ার জন্য তার এক বন্ধুর নিকট গমন করেন। কবির বন্ধু ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। কবি জানতেন তার ব্যাংকে কিছু টাকা ছিল। এ প্রশ্ন উত্থাপন করায় তার বন্ধু বলেন যা কবির ভাষায়:

পাগল হয়েছ! ব্যাংকের টাকা তুলিতে যাইব আমি

লাখ না পুরিতে! সে টাকা আমার প্রাণের চেয়েও দামি।

তৎকালীন সময়ে কিছু ধনীর নিকট হাত পেতে তিনি শূন্য হাতে ফিরে আসেন আর এর প্রতিকারস্বরূপ কবিতায় ঝরে পড়ে তার ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বিপ্লবী কণ্ঠস্বর:

‘ধু-ধু জ্বলে ব্যথার আগুন হৃদয় আমার অগ্নিগিরি

মাফ করিও তারই খানিক উঠবে আজি পাষাণ চিরি।’

* * *

রায় বাহাদুর খান বাহাদুর-ওরা নয় কারো জাতি,

আধ-মরাদের মাড়ায়ে উহারা হর্ষে চালায় হাতি,

বাহাদুর নয়, বাদুড় উহারা, দিন-কানাদের জাত,

তখনি ওদের হয় সুসময়,Ñ মানুষের যবে রাত!

এ কথা অতীব সত্য যে, কবি আশরাফ আলী খান ছিলেন নজরুলের বিদ্রোহী চেতনায় অনুপ্রাণিত। তাকে নজরুলের ভাবশিষ্য বললে কোনো অত্যুক্তি হবে না। নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতায় যে বিদ্রোহের ঝঙ্কার উচ্চারিত, তার স্পষ্ট প্রতিফলন কবির নিম্নোক্ত চরণগুলোতে অনুরণিত। নজরুল বলেন:

‘কোথা চেঙ্গিস, গজনী মামুদ, কোথা কালাপাহাড়,

ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেয়া দ্বার।’

কবি আশরাফ আলী বলেন:

‘কোথা বিদ্যুৎ, কোথা মহামারী, কোথায় অশনি-বাজ;

নহ মানুষের শত্রু তোমরা, বন্ধু গো এস আজ;

কোথা নূহ নবী? ডেকে আন ফের ঝঞ্ঝা তুফান-জল,

মিথ্যাময়ী এ সৃষ্টিরে ত্বরা কোরে দাও রসাতল;

উল্লেখ্য, আমার পিতা মরহুম গাজী মঈনউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে কবি আশরাফ আলী খান সম্পর্কে আলোচনাকালে তিনি আমাকে বলেন, তিনি কলকাতায় আশরাফ আলী খানকে চিনতেন এবং কবির দুরবস্থার কথাও বলেন। তিনি এ কথাও বলেন, পত্রিকা ও লেখালেখির সূত্রে কবির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এ সময় আমার পিতা কলকাতা হতে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘গুলবাগিচা’ পত্রিকার ম্যানেজার ছিলেন। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবদুল ওহাব সিদ্দিকী এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কবির অনাহার চলতে থাকে। মায়ের নিকট টাকা পাঠানোও হয় না। মায়ের চিঠির উত্তর লিখে খাম কিনতে অপারগ হওয়ায় তা আবার ছিঁড়ে ফেলেন:

লিখিয়া জবাব ছিড়িয়া ফেলিনু হাজার টুকরো করি,

কে দেবে টিকেট! কেমনে পাঠাবে, নাই যার কানা-কড়ি!

এ সময়ে তার এক প্রতিবেশী বন্ধু কলকাতা হতে যশোরে ফিরছিলেন। তাকে গিয়ে বলেন তার মাকে সংবাদ দিতে যে, ‘তুমি মরার আগে তোমার পুত্র মারা যাবে।’ কবি ইতোমধ্যেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি এ-সংক্রান্ত কয়েকটি চরণ রচনা করেন:

শাস্ত্র-মজুর মোল্লা-পুরুত নীতিবাগীশের দল,

‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ বলি করিস যে কোলাহল,

আমার বেলায় শাস্ত্রে তোদের বিধান কি আছে দ্যাখ,

নতুবা আগুনে পুড়ায়ে করিব টিকি ও দাড়িতে এক!

কবির নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে কলকাতা শহরের বুকে দু’দিন অনাহারে থাকার পর ১৯৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর মাত্র ৩৮ বছর বয়সে অহিফেন (আফিং) সেবন করে মারা যান। এভাবে বাংলার সাহিত্য আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :