কারাগারে যেমন আছেন ডিআইজি মিজান

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৪৯ | প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০২১, ১৯:৫৪

ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদায় আছেন পুলিশের বরখাস্তকৃত ও বহুল আলোচিত-সমালোচিত ডিআইজি মিজানুর রহমান। অবৈধ সম্পদের মামলায় সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা দুই বছরের কাছাকাছি সময় ধরে এই কারাগারে আছেন। এই সময়ে পরিবারের কেউ তার খোঁজখবর নিতে কারাগারে যাননি।

সাময়িক বরখাস্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান তার সরকারি চাকরির অবসরসুবিধার মূল বেতনটুকু কারাগারে বসেই পেয়ে থাকেন। প্রতি মাসে পুলিশের একজন সদস্য কারাগারে যান তার কাছ থেকে চেক সই করাতে। পরে টাকা তুলে তা তাকে কারাগারে পৌঁছে দেন।

নানা অনৈতিক আর অবৈধ কাজের দায়ে অভিযুক্ত ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে আদালতে দুই মামলার বিচারকাজ চলছে। মামলার বিচারকাজে আদালতে হাজিরার সময় তার আত্মীয়স্বজনদের কেউ কেউ দেখা করেন। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে কারাগারে আটক মিজানের সঙ্গে দেখা করতে পরিবারের কেউ যাননি।

কারাসূত্র জানায়, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মিজানের কারাগারে দিন শুরু হয় ফজরের নামাজ দিয়ে। সূত্রের ভাষ্য, ‘খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন ডিআইজি মিজান। ফজরের নামাজ আদায় করে পত্রিকা নিয়ে বসেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কারাগারে নিজের ঘরে সময় কাটান তিনি।’

ডিআইজি মিজান সেখানে বন্দি ও কারারক্ষীদের সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না বলে জানান সূত্র। কারারক্ষীসহ অন্যরাও তার সঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতে চান না। নিজের রুমে পায়চারি করেন মিজান। সময়ে সময়ে বিভিন্ন বই ও পেপার পড়েন। এ ছাড়া নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়েন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি ডায়াবেটিকসের রোগী হওয়ায় খাবার-দাবারও খুব মেপে খান।

দুই মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ পুলিশের বরখাস্ত হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে চলছে। আজ সোমবারও সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ছিল। ঢাকা বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক আসাদ মো. আসিফুজ্জামানের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। ইতোমধ্যে এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন বেসিক ব্যাংকের প্রধান শাখার (মতিঝিল) মহাব্যবস্থাপক মমিনুল হক এবং অপারেশন ম্যানেজার এ এম সাহেদ হোসেন। চার্জশিটভুক্ত ৩৩ সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে আদালত।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে ২০১৯ সালের ২৪ জুন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা-১) ডিআইজি মিজানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।

ঘুষ লেনদেনের মামলায় ডিআইজি মিজানুর রহমান মিজান ও দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ছিল গত ৫ এপ্রিল। কিন্তু করোনায় আদালত বন্ধ থাকার কারণে ওই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

এর আগে গত ৩ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলমের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু আদালতে কোনো সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় দুদক সময়ের আবেদন করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে নতুন দিন ধার্য করেন। মামলায় এ পর্যন্ত ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

এ ব্যাপারে আসামিপক্ষের আইনজীবী কাজী এহসানুল হক সমাজি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ডিআইজি মিজানের দুটি মামলাই সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। একটি মামলায় ৫ এপ্রিল দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আদালত বন্ধ থাকায় সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি।

২০১৯ সালের ১৬ জুলাই ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি করেছিলেন দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা। ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পর খন্দকার এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানুর রহমান ওরফে মিজান সাময়িক বরখাস্ত হন।

২০১৯ সালের ১ জুলাই হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য গেলে ডিআইজি মিজানকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। এ সময় মিজানকে তাৎক্ষণিক হাইকোর্ট পুলিশের হাতে তুলে দেন আদালত। গ্রেপ্তারের পর তাকে শাহবাগ থানায় নেয়া হয়। পরদিন ডিআইজি মিজানের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত।

মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিজের স্ত্রী থাকার পরও এক নারীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিয়ে এবং তা গোপন করতে তাকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে ডিআইজির বিরুদ্ধে।

এই কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছিল।

নারী নির্যাতনের অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পুরনো। নানা জায়গা থেকে তথ্য পাওয়ার পর তদন্তে নামে দুদক। দুদক কার্যালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মিজানকে। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের খোঁজ মেলে।

আর এই সময় ডিআইজি নিজেই তার এক কেলেঙ্কারি ফাঁস করেন। বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে তিনি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এই অভিযোগ ওঠার পরপর দুদক তার পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে বরখাস্ত করে।

দুদক কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডিআইজি মিজানকে সাময়িক বরখাস্তের একটি প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের স্বাক্ষরের পর তাকে বরখাস্ত করে জারি হয় প্রজ্ঞাপন।

কারাগারে ডিআইজি মিজানের অবস্থা জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. মাহবুবুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে জানান, তিনি প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পাওয়ায় কারাবিধি মোতাবেক সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

(ঢাকাটাইমস/১১এপ্রিল/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :