শিল্প-কারখানা ও সেবাখাত লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখতে চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৪ আগস্ট ২০২২, ২২:১২

সরকার শিল্প-কারখানা ও সেবাখাতকে লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে জ্বালানি বিষয়ক “এনার্জি সিকিউরিটি ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর” শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি একথা বলেন।

সভায় ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিল্প, কৃষি ও সেবাখাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতেই এ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্য আবাসিক গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধা মেনে নেয়ার আহ্বান জানান জ্বালানি উপদেষ্টা। একই সঙ্গে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ারও তাগিদ দেন।

ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী আরও বলেন, মানুষের মতো গ্যাসক্ষেত্রেরও একটা আয়ুষ্কাল রয়েছে। সরকার ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় বিদ্যুতের পরিমাণ মোট ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পলিসি হলো দেশের কৃষি ও শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। দেশে বিদেশি কোম্পানিগুলো (নাম অনুল্লেখ করে) বিশাল অংকের একটা প্রফিট তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এরা বাংলাদেশের পেটে লাথি দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের জন্য একটা পরীক্ষা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য এটা আরো কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কাটিয়ে উঠতে হলে মুক্তিযুদ্ধের মতো আমাদের একটু ত্যাগী হতে হবে। এসিতে সভা-সেমিনার না করে বিদ্যুৎ চালিতে পাখাতে এটা করা দরকার। আমিও ফ্যান চালিয়ে এখন এই সভা করছি।

এদিকে সরকারের কাছে লো-কস্ট(স্বল্প ব্যয়ে) জ্বালানি চেয়েছে বাংলাদেশের শিল্প ও বণিক সমিতির (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিন। সেই সঙ্গে সরকারের লং-টার্ম (দীর্ঘমেয়াদি) কয়লাভিত্তিক জ্বালানিতে যাওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, পরিবেশ ধ্বংস না করেও উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কয়লাভিত্তিক জ্বালানি উৎপাদন করা যেতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কয়লা বিদ্যুৎ থেকে জ্বালানির একটা বিরাট অংশের চাহিদা মেটাচ্ছে । তিনি জানান, শিল্পোন্নত দেশগুলোর অনেকেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরও উচিৎ দেশে কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেয়া।

এই সময় বাপেক্স-কে (বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়াত্ত গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠান) আরও শক্তিশালী করার আহবান জানান জসিম উদ্দিন।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস। তিনি জানান, শিল্প ও সেবা খাতে সরকারের আলাদা নজর আছে। সরকারের পলিসি হলো ডোমেস্টিক (বাসাবাড়িতে) সেক্টরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে শিল্পে বাড়িয়ে দেওয়া। শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া। বিদ্যুৎ রেশনিংয়ে শিল্প এলাকা বিবেচনায় লোডশেডিং এর পরিকল্পনা করা হলেও গৃহস্থলি এলাকায় কিছু শিল্পকারখানা থেকে যায়; যার জন্য এসব কারখানাকে লোডশেডিং পোহাতে হয়। লোডশেডিংয়ের কারণে কোন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।

টেকসই উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ক এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ কনজাম্পশন হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭১ মিলিয়ন কিলোওয়াট। এর মধ্যে শিল্পকারখানায় ২৮.৪০ শতাংশ, কৃষিতে ২.৪৩ শতাংশ, বাণিজ্যিকে ১০.৫৮ শতাংশ, বাসাবাড়িতে (ডোমেস্টিকস) ৫৬.৫৪ শতাংশ ও অন্যান্যতে ২.১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনের এক পর্যায়ে তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে তিতাসের উৎপাদিতে গ্যাসের ৮-৯ শতাংশ চুরি হয়ে যায়। এছাড়া বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস বিক্রি হয় বাংলাদেশে।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় বক্তারা জ্বালানি সংকট নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেন ও নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। এই সময় বক্তরা বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র এক্সপ্লোরেশনের (আবিষ্কার) ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ ৩টি কূপ খনন করলে ১টি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়ে যায়। আর আমেরিকা ও ভারতের মতো দেশ ৫টি বা ১০টি কূপ খনন করলে মাত্র ১টি গ্যাসের সন্ধান পায়।

সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। ক্রান্তিকালীন সংকট মোকাবিলায় একটি জরুরী তহবিল গঠনের দাবি জানান এফবিসিসিআইর পরিচালক ও বিটিএমএ’র সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন।

কয়লাভিক্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সমুদ্রে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাসের অনুসন্ধানের আহ্বান জানান এফবিসিসিআইর পরিচালক ও এমসিসিআইর সভাপতি মোঃ সাইফুল ইসলাম।

জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান এফবিসিসিআই’র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হুমায়ূন রশিদ। বছরে অন্তত ১০ টি গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন জ্বালানি বিষয়ক ম্যাগাজিন এনার্জি এন্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন। সাবেক অতিরিক্ত সচিব সিদ্দিক জোবায়ের ইপিজেড এর কারখানাগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা সহজতর করতে বেপজা’র প্রতি আহ্বান জানান।

(ঢাকাটাইমস/০৪আগস্ট/এমএইচ/ইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :