দেশজুড়ে জাতীয় শোক দিবস পালিত

জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ়প্রত্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৫ আগস্ট ২০২২, ২৩:১০

শোককে শক্তিতে পরিণত করার দৃঢ়প্রত্যয়ে পালিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে শোক দিবসের অনুষ্ঠান থেকে জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যয়ও এসেছে। দেশের সবস্তরের মানুষ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এই মহান নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। সর্বত্র সব কর্মসূচিতে ছিল শোকের আবহ।

দেশজুড়ে আয়োজিত নানা কর্মসূচিতে একটি গণতদন্ত কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পাশাপাশি তার পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবিও উঠে এসেছে। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রেতাত্মা এবং স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার শপথও উচ্চারিত হয়েছে।

গতকাল সকালে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি। এদিন ছিল সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সরকারি-বেসরকারি রেডিও ও টিভি চ্যানেলগুলো দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। দেশের সব মসজিদে বিশেষ মোনাজাত, মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। পোস্টার মুদ্রণ ও বিতরণ এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র দেখানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তিন বাহিনীর সুসজ্জিত চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতির পিতাসহ পঁচাত্তরের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। এরপর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে আরেকবার পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু ভবনের ভেতর যান। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে ঘুরে ঘুরে বাবার স্মৃতিচিহ্ন পরিদর্শন করেন তিনি। পরে ভবনের একটি কক্ষে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতির পিতার জন্য দোয়া করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে গিয়ে মা-ভাইসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন। ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। এখানেও আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন দল ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কবরস্থান মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হয়। এ ছাড়া বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী । এ সময় তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে পবিত্র সুরা ফাতেহা পাঠ ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন তিনি।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপরই শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দলীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ভোরেই অগণিত মানুষের পদচারণায় ভরে ওঠে ৩২ নম্বর সড়ক। হাতে কালো ব্যানার ও বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে নারী-পুরুষ, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিশু-কিশোরসহ সর্বস্তরের মানুষ।

বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

পরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান ১৪ দলের নেতারা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত, ভারতের হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সকালে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে শহীদ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সমাধিতে সপরিবারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মেয়র তাপস বলেন, শোককে শক্তিতে পরিণত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে চাই। জাতির পিতা সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সে লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন। সেটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, তরীকত ফেডারেশন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিএফইউজে, ডিইউজে, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব পরিষদ, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, দুদক, বাংলাদেশ বেতার, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, রাজউক, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, যুব ঐক্য পরিষদ, পিআইবি, বিএমএ, রিহ্যাব, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, খেলাঘর, কচি-কাঁচার মেলা, শহীদ মনসুর আলী স্মৃতি সংসদ, মোহাম্মদ নাসিম ফাউন্ডেশন, আইডিইবি, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, শেখ রাসেল শিশু সংসদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, জাতীয় স্বাধীনতা পার্টি ও গোপালগঞ্জ সমিতিসহ বিভিন্ন দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরেও শ্রদ্ধা জানিয়েছে এসব সংগঠন।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে ১০০ বার কুরআন খতম ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন আজ কুরআন খতম ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করে।

বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে ১০০ জন কুরআনে হাফেজের মাধ্যমে ১০০ বার কুরআন খতম সম্পন্ন করা হয়। কুরআন খতম শেষে জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান।

রাজধানীর বিএফডিসিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি এবং অন্যান্য সংগঠন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদসহ প্রতিটি হল ও আবাসিক এলাকার মসজিদে দোয়া মাহফিল এবং অন্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

আরও আয়োজন: রাজধানীর মতিঝিলের বিআইডব্লিউটিএ ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুসহ নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে জাতির পিতাকে নিয়ে বিআইডব্লিউটিএর সদস্য (প্রকৌশল) মতিউর রহমানের লেখা ‘কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে জাতির পিতার ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। আলোচনা সভায় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া, ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

(ঢাকাটাইমস/১৫আগস্ট/আরকেএইচ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :