আঁখি আলমগীরের অজানা অধ্যায়

সংগীতশিল্পী আঁখি আলমগীর। তিন দশকের পেশাদার সংগীতজীবন। ১৯টি একক অ্যালবাম। স্টেজ শোতে এখনো সমানে তাঁর ক্রেজ। ব্যক্তিজীবনে দুই কন্যাসন্তানের মা। বড় মেয়ে আরিয়া আলতাফ দেশের বাইরে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়নরত।
বাবা নায়ক আলমগীরের সূত্রে অভিনয় জগতে প্রবেশের দুয়ার ছিল একেবারে সহজ। তবে বাবা চেয়েছিলেন বড় মেয়ে আঁখি আলমগীর চিকিৎসক হোক। শিশু বয়সে ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অর্জন করে নিয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর পুরস্কার।
তবে রক্তে অভিনয় থাকলেও সে পথে যাননি আঁখি আলমগীর। বিপরীতে বেছে নেন কণ্ঠসাধনার মতো কঠিন পথ। হয়ে গেলেন দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। গানের জন্য অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
আঁখি আলমগীর তাঁর পোশাকের জন্যও বরাবর নজর কাড়েন। বেশির ভাগ শাড়িই তাঁর নিজের ডিজাইন করা। শখের বশেই তিনি এ কাজ করেন। হ্যান্ডমেড এক্সক্লুসিভ শাড়ি অনলাইনে বিক্রিও করছেন।
সবমিলিয়ে আঁখি আলমগীর যাপন করছেন শৈল্পিক এক জীবন। ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপনে তুলে ধরেছেন তাঁর অজানা অধ্যায়ও। প্রশ্ন আর উত্তরে জেনে নেওয়া যাক ক্যাসেটের যুগ থেকে এখনো জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এই সংগীতশিল্পীকে।
এখন ডিজিটাল মিডিয়ার যুগ, এ বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
এই মাধ্যমটাকে আমি অবশ্যই পজিটিভলি দেখছি। যেকোনো কিছুর সঙ্গে আপনি যদি নিজেকে আপডেট না রাখেন, তাহলে আপনি পিছিয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে আমি সবসময় নিজেকে আপডেট রাখি। এটা শুধু আমার কাজের ক্ষেত্রে নয়, আমার জীবন, আমার চিন্তাধারা, জীবনাচরণ সবকিছুতে আমি সবসময় আধুনিক মানুষ। আমি সবসময় নতুনকে স্বাগত জানাই।
ক্যাসেট-সিডি সেগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করতে বলেন, তাহলে বলব অবশ্যই আগের যুগ ভালো ছিল। কারণ, পরিপূর্ণভাবে একজন শিল্পীকে একটা অ্যালবামে পাওয়া যায়। একটা গানে পাওয়া যায় না, সেখানে তার একটা পার্ট পাওয়া যায়। একটা অ্যালবামে একজন শিল্পীর ১০-১২টা গানের অনেক বৈচিত্র্য ফুটে উঠত। ফলে একটা অ্যালবামেই শিল্পীকে পূর্ণাঙ্গভাবে খুঁজে পাওয়া যেত।
যেমন ধরুন, ক্যাসেটের কাভারে যে ছবিটা থাকতো, সেটা আমরা খুব আয়োজন করে তুলতাম। ফটোশ্যুট করতাম, অনেক রকমের ড্রেস পরে ছবি তুলতাম। এরপর ১০০-১৫০ ছবির ভেতরে একটা ছবি নেওয়া হতো। সেটা আবার ঢাকাসহ সারাদেশে পোস্টারিং করা হতো। ব্যাপারটা খুবই সুন্দর ছিল।
একটা অ্যালবাম তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকত অনেকেই। যারা অ্যালবামের কাভার ডিজাইন করত, তাদেরও একটা পেশা ছিল। কে কত ভালো করবে, কে কত সুন্দর করবে, কে কত মডেল করবে, আগের থেকে কতটা সুন্দর হবে, এবারের ড্রেসটা কি হবে, অ্যালবামের নামটা কি হবে। অনেক কিছু করার স্কোপ ছিল।
আর এখন আপনি একজন শিল্পীর স্টিল শর্ট ছবি ফেসবুকে ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। এভরিথিং ইজ ইজি। সবকিছু এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের এখন আর কোনো মাধ্যম নেই যে, আমরা একটা ক্যাসেট বের করব। এখন আমাদের একমাত্র রাস্তা ভার্চুয়ালি গান রিলিজ করা। ইউটিউবে গান রিলিজ করা। এছাড়া তো কোনো উপায় নেই।
আগে গান শোনা হতো, এখন শোনা হচ্ছে দেখার মাধ্যমে...
ওই আর কি গানের ভিউ হচ্ছে। ভিউ দিয়ে কিচ্ছু মাপা হয় না। এরপর আবার কখন কোন গান কি ভিউ হয় বা হচ্ছে কেউ জানে না। শিল্পী হিসেবে আমি বুঝতে পারছি নাÑআসলে আমার গানটা কোথায় পৌঁছাচ্ছে। আমি ভিউ দেখতে পেলেও কারা আমার গান শুনছে বুঝতে পারছি না।
আগে আমরা জানতাম, কোন এলাকায় আমার অ্যালবাম বেশি বিক্রি হচ্ছে। ঢাকায় কত হচ্ছে ঢাকার বাইরে কত হচ্ছে। একটা পরিসংখ্যান হতো। আর এখন কোথায়, কোন ক্লাসে আমার গান বেশি পৌঁছাচ্ছে জানার সুযোগ নেই। মানে আমার শ্রোতা কে বা কারা তা আমি জানতে পারছি না।
আমি বলব, আমি হচ্ছি, লাস্ট আর্টিস্ট অফ দ্যাট ইরা। ক্যাসেটের ওই যুগের সময়ের সাফল্য থেকে এই যুগের সাফল্য আমি দেখেছি। দুই মাধ্যমে আমি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি। ধরে রাখাটা খুব কঠিন ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রে এটা ছিল দর্শকের ভালোবাসা আর আল্লাহর রহমত।
শিল্পীর স্বকীয়তা কতটা জরুরি? নিজের ক্ষেত্রে সেটা কীভাবে দেখেন...
আমাকে তো মানুষ ক্যাসেটের সময় থেকে চিনে। কাজেই আমাদের পরিচিতির ব্যাপকতাটা বেশি। অনেকের ভেতরে কপি করার প্রবণতা থাকে। কেউ কাউকে পছন্দ করে তার গায়কিটাকে কপি করতে গিয়ে, নিজের স্বকীয়তা হারায়। অনেক সময় দেখা যায়, নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় দেখা যায় মিক্সিংটা একই প্যাটার্নে হচ্ছে, একই রকম ভয়েস শোনা যায়।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরা যারা পজিশনে আছে তারা কিন্তু তাদের স্বকীয়তা তৈরি করেছে। তাদের ভয়েস অন্যরা চিনে কি চিনে না তা জানি না। তবে আমি চিনি।
অনেকের আবার কপি করার একটা প্রবণতা থাকে। তারা যদি কাউকে পছন্দ করে তখন তার গায়কি বা কণ্ঠটাকে একটু কপি করতে গিয়ে স্বকীয়তা হারায়। আর অনেক সময় এইভাবে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
গানের ক্ষেত্রে অটো টিউন এখন একটা সিস্টেমের ভেতরে পড়ে গেছে। এখন অটো টিউনের কারণে যে কেউই গান গাইতে পারে। অবশ্য সেটা আলাদা ব্যাপার। এখন যারা গান করে, মোটামুটি যাদের নাম আমরা কমবেশি চিনি, তারা প্রত্যেকে অনেক ভালো গায়। এটা আমি বলার জন্য বলছি না। তারা আসলেই অনেক ভালো গায়।
তবে নতুনদের জন্য আমার একটা বিষয় খারাপ লাগে। সেটা হচ্ছে তারা অ্যালবামের যুগ পায়নি। তারা যদি অ্যালবামের যুগটা পেত তাহলে তাদের কাজটাকে অনেক বেশি দেখাতে পারতো। কারণ, নিজেদের গান তারা প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না মাধ্যমের অভাবে।
একটা গান দাঁড় করিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অনেক কঠিন। একটা অ্যালবামের ১২টা গান থেকে একটা গান তখন ঠিকই হিট হয়ে যেত। তখন স্কোপটা ভালো ছিল এবং মাধ্যমটা অনেক বড় ছিল। মানুষও খুবই বেশি গান শুনত। নতুনরা এখন খুবই ভালো গাইছে, কিন্তু তারা তাদের অ্যাকচুয়াল অ্যাবিলিটি হয়ত দেখাতে পারে না। কারণ, আগের মতো এত গানই তো হয় না এখন। বছরে দুইটা মৌলিক গান দিয়ে একজন শিল্পীকে মূল্যায়ন করতে পারবেন না। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে অন্য গান করতে হচ্ছে। তাকে কাভার সং করতে হচ্ছে।
শৈল্পিক জীবনযাপনের জন্য আপনার সুনাম আছে, বিশেষ করে শাড়ির জন্য...
এটা আমার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। আমার চিন্তাধারা, আমার মন-মানসিকতা, আমার বেড়ে ওঠা, অবশ্যই শৈল্পিক। আমার বাবা-মা ও তাদের কলিগরা, বাসায় পরিবেশ থেকে সবকিছুই শৈল্পিক। সবাই উচ্চমাপের এবং সেটা এত বিশাল যে আমি সেখানে খুবই ক্ষুদ্র। সেই বিশাল মানুষগুলোকে কাছে থেকে দেখা এবং তাদের জীবনাচরণ...সবাই বলে যে আমি ছোট থেকেই বসে বসে হা করে গিলার মতো সবকিছু শুনতাম এবং শিখতাম।
তাদের কথাবার্তা, কাজের ধরন, মানুষকে হ্যান্ডেল করার ধরন, কীভাবে নিজেকে প্রেজেন্ট করতে হয়, কাজের প্রতি সম্মান, কাজের প্রতি ডেডিকেশন, কীভাবে পরিশ্রমী হওয়া যায়, কাজ ও ব্যক্তিজীবন দুইটাকে কীভাবে গুরুত্ব দিতে হয়, দুইটাকে আলাদা কীভাবে করতে হয়, এগুলো কিন্তু তাদের থেকেই শেখা।
এছাড়া ভালো সিনেমা দেখা, ভালো বই পড়া জন্ম থেকেই আমার ভেতরে। আগাগোড়া জীবনটাই শিল্পমণ্ডিত।
আজকে আমি যদি গান না করতাম অভিনয় না করে অন্য পেশায় থাকতাম তাও আমার ভেতরে শৈল্পিক ভাবটা থাকতো। কিছু না কিছু শিল্পের ছোঁয়া আমার ভেতরে থাকতোই। কারণ, আমার বেড়ে ওঠাটাই সেরকম ছিল।
আর হ্যাঁ, আমার নিজের শাড়িগুলোর বেশিরভাগই নিজের ডিজাইন করা। আমি কোনো শাড়ি পরলে অনেকে জিজ্ঞেস করে যে, আপু শাড়িটা কোথা থেকে কিনেছেন। কোথায় পাওয়া যাবে। তখন আমি তাদের বলতাম এটা আমার নিজের ডিজাইন করা।
তো চেনা পরিচিতদের প্রশংসা শুনতে শুনতে অনলাইনে কিছু কিছু শাড়ি সেল দিই। আমি তো খুব বেশি সময় দিতে পারি না। কেউ যদি কিনতে চায় অর্ডার করলে আমি তাকে শাড়িটা দিয়ে দিই। তবে খুব একটা যে দিতে পারি তাও নয়। ওই যে তেমন একটা সময় পাই না।
দর্শক-শ্রোতাদের কাছে আপনার প্রত্যাশা?
আমার দর্শকদের কাছে প্রত্যাশা হচ্ছে, আপনারা আমাদের গানগুলো শুনবেন। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করি একটি ভালো গান ভিডিওসহ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। সেটা যদি সমালোচনা করার মতো হয় তাহলে সুন্দর সমালোচনা করবেন। যাতে সেটার ওপর ভালো ভিত্তি করে পরবর্তী কাজটা সুন্দর করে করতে পারি। সুন্দর সমালোচনা হলে নিজেকে শুধরে নিতে পারব।
একজন শিল্পী প্রতিদিন পরিবর্তন হয়। তার গায়কি প্রতি সপ্তাহে ভালো হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি পরিপক্ব হয়। তো ভালোভাবে সমালোচনা হলে, ভালো কথা বললে, শিল্পীরা ভালো কাজে আরও বেশি উৎসাহ পায়।
আপনার কাছে দর্শক-শ্রোতারা কী প্রত্যাশা করবেন?
এ বছরের শুরুতে আমি বলেছিলাম যে, এ বছরে আমি বেশ কিছু গান রিলিজ করব। আমার বেশ কিছু গান রেডিও আছে। ধ্রুব মিউজিক স্টেশনে একটি গান রিলিজ হবে। আরটিভি মিউজিক থেকে ঈদে রিলিজ হবে গান ‘রাজকুমারী’। শওকত আলী ইমনের সুর এবং কথায়। সেটা ঈদে মুক্তি পাবে।
যতদিন আমার কণ্ঠ ঠিক থাকবে, আমি ঠিক থাকবো, আমার মন ঠিক থাকবে, সুস্থ থাকবোÑততদিন আমি গান গেয়ে যাবো। সেটা পরিমাণে কম হতে পারে, পরিমাণে বেশি হতে পারে। গান আমি থামাবো না। গানের জন্য জীবনে আমি অনেক সেক্রিফাইস করেছি। অনেক কষ্ট করেছি। গান যখন শুরু করি তখন আমি কার মেয়ে সেটা কিন্তু দেখা হয়নি। বরং আমাকে আরও বেশি কঠিন ট্র্যাক দেওয়া হয়েছে যে আমি গাইতে পারব কি না দেখতে। সেই সময়গুলো উৎরে আমি একটা জায়গায় এসে থিতু হয়েছি। অনেক কষ্ট করেই এই জায়গাটা পাওয়া। এই অর্জনের সম্মান আমি সবসময় রাখার চেষ্টা করি।
গানের জন্য যে সেক্রিফাইসের কথা বললেন, সেটা কেমন?
আসলে সেটা তো বলে বোঝানোর মতো ব্যাপার নয়। বলা যেতে পারে এগুলো ছোট ছোট ইট, যা একটা একটা গাঁথুনির মতো করে জায়গাটি শক্ত করে। এটি একটি কমিটমেন্ট, যখন খুবই নেগেটিভ সিচুয়েশনে আপনার কমিটমেন্টটা রক্ষা করতে হবে, আপনি সিচুয়েশনটা ওভারকাম করে কমিটমেন্টটা রক্ষা করেন। এর ফলে আশপাশের মানুষের ভেতর আপনাকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্যতা চলে আসল।
তো, এরকম ছোট ছোট জিনিসগুলো ওভারকাম করেই কিন্তু আজকের জায়গায় আমি এসেছি। নিজের অসুস্থতা নিয়ে কাজ করেছি। একটা উদাহরণ দিচ্ছি, আমার মেয়ে হসপিটালে। তার অ্যাপেন্ডিস অপারেশন হবে। সেসময় আমি গোপালপুর যাচ্ছি কনসার্ট করতে। অর্ধেক রাস্তায়, মাওয়া ফেরিতে উঠব। এমন সময় আমার মা ফোন করে বলল, আমার মেয়ে আরিয়ার ভীষণ পেটব্যথা। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং ডাক্তার বলেছেন তৎক্ষণাৎ অ্যাপেন্ডিস অপারেশন করতে হবে।
আমি তখন ফেরি পার হয়ে গেছি। হাউমাউ করে কান্না করছি মাইক্রোবাসে বসে। সেভাবেই আমি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গান করলাম, নাচলাম। বারবার কান্না করার জন্য মেকআপ উঠে গেল, আবারও মেকআপ নিলাম। অনেকে ছবি তুলতে এলো, তাদের সঙ্গে ছবিও তুলছি। কাউকে বুঝতে দেয়নি আমার ভেতরে কি হচ্ছে! ওই অবস্থাতেই ভোর ৫টায় ঢাকায় এসে হাসপাতালে ছুটলাম মেয়ের কাছে।
কাজের প্রতি নিষ্ঠা থেকে এই জিনিসগুলো আমি করে আসছি। এমন ডেডিকেশনে আমি এখনো কাজ করি। হয়ত কোনো অনুষ্ঠানে যেতে এক ঘণ্টা দেরি করতে পারি। আবার কোথায় বলতে পারি আজকে গান রেকর্ডে যেতে পারব না, কালকে যাব। কাউকে আমি ফাঁসিয়ে দিই না। আমার জীবন দিয়ে হলেও আমি চেষ্টা করি কাজটা করার।
জাতীয় পুরস্কারসহ অনেক অর্জন...কষ্ট সার্থক মনে হতেই পারে...
অবশ্যই। আমি মনে করি, আমার প্রাপ্তির ভাগটাই বেশি। মানুষের চাহিদা থাকে। এটা হলো না, ওটা হলো না বা এটা যদি পেতাম। আমি যখন গানে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়নি, তখনও আমার আফসোস ছিল না। তখন আমার মনে হতো, মানুষের ভালোবাসা অনেক বড়। এটাই আমার জন্য এনাফ।
অভিনয়ে আগে পুরস্কার পেয়েছি। গানের জন্য পুরস্কার না পাওয়া পর্যন্ত পরিপূর্ণতা হচ্ছিল না। তারপর যখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম, তখন নিজেকে আরও ছোটই করে ফেলছি। মাথা থেকে এই জিনিসটা সরিয়েছি যে, একটা পুরস্কার পেয়েছি আমার লাইফে বিরাট একটা কিছু হয়ে গেছে, সেটা না। অবশ্যই এটা বিরাট স্বীকৃতি। তবে সেটা ভুলে থাকতে হবে। কারণ, এটা মাথায় নিয়ে চললে কাজ আর হবে না।
‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের পর আর কোনো চলচ্চিত্রে আপনাকে দেখা গেল না...
অভিনয় আমার রক্তে আছে। গানও আমার রক্তে আছে। আমার বাবা তো গানও গাইতেন। দুইটাই আমার ভালোবাসার জায়গা। আমি যদি দুইটা একত্রে নিতাম হয়ত কোনোটার প্রতি শতভাগ বিচার হতো না।
আমার জন্য অভিনেত্রী হওয়াটা সহজ ছিল। গায়িকা হয়ে ওঠাটা অনেক বেশি কঠিন ছিল। আমি কঠিনটা কেন বেছে নিয়েছি জানি না। হয়ত আমার ভালোবাসাটা গানের জন্য বেশি ছিল।
আপনার এমন কোনো ঘটনা যা এখনো দর্শক-শ্রোতাদের অজানা?
আমি তখন সম্ভবত ইন্টারমিডিয়েট ১ম বর্ষে পড়ি। রাতে বাসায় ঘুমোচ্ছিলাম। ১২টা কি সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ বাবা আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুললেন। আব্বু বললেন, তাড়াতাড়ি ড্রেস চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুয়ে নিচে যেতে। নিচে নেমে দেখি, ওস্তাদ গোলাম আলী খান আর ওনার ছেলে আব্বাস আলী খান বসা!
ওনারা ঢাকায় এসেছেন একটি শো করতে। সেখানে আব্বুও ছিল। সেখান থেকে রাতে ডিনার করানোর জন্য আব্বু তাদের নিয়ে এসেছেন। খাবার দাবারের পর আব্বু বললেনÑআমার মেয়ে আকতার শবনমের কাছে গান শেখে। ভালো ক্লাসিক্যাল গান পারে, হিন্দি, বাংলা সব ভাষায় গান পারে।
তখন আব্বু গান শোনাতে বলল। এদিকে আমি ওস্তাদ গোলাম আলী স্যারকে কীভাবে গান শোনাবো! আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো। আব্বু বলাতে ভয়ে ভয়ে একটা বাংলা গান গাই। পরে আবার বলায় একটা হিন্দি গান গাইলাম। এবার নূরজাহান ম্যাডামের গান গাইতে বলল। পরে একটা উর্দু গান গাইলাম। এসব গান সেসময় ক্যাসেট থেকে শুনে শুনে শিখেছি। গোলাম আলী স্যার খুব মনোযোগ দিয়ে আমার গান শুনলেন।
তখন আব্বু ওনাকে আমার গান কেমন লেগেছে জানতে চান। তিনি বললেনÑ ‘ও তো এখনো বাচ্চা, আলমগীর স্যার। আপনাকে কালকে বলবো’। এই কথা শুনে আমার খুবই খারাপ লাগলো! মনে হলো, আমার গান ভালো হয়নি! আমার মন খারাপ হবে এজন্য এখন কিছু বলছেন না।
পরের দিন কলেজ থেকে ফিরে দেখি, আব্বু ড্রইংরুমে বসে আছেন। বললেন, গোলাম আলী সাহেব যাওয়ার আগে তার নিজের হ্যামিলিয়ন আমার জন্য পাঠিয়েছেন। আর বলেছেন, আমার গান তাঁর কাছে এতো ভালো লাগছে, আমার হারমোনিয়াম আঁখিকে দিয়ে গেলাম উপহার হিসেবে। তাঁর দেওয়া ওই হারমোনিয়ামে আমি এখনো গান করি।
(ঢাকাটাইমস/২৯জুন/ডিএম)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































