দাম কমায় গরুর মাংস কেনার হিড়িক

লিটন মাহমুদ, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৪২ | প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:১৭

হঠাৎ করেই মাংসের বাজারে হইচই শুরু হয়েছে। ক্রেতারা ভিড় করছেন গরুর মাংসের দোকানে। ঢাকায় কয়েকদিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে দাম। কোথাও কোথাও বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকারও নিচে।

হঠাৎ গরুর মাংসের দাম কমা নিয়ে বিক্রেতা ও অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় গরুর মাংসের মতো উচ্চমূল্যের প্রোটিন কেনার সামর্থ্য সংকুচিত হয়ে আসছে সাধারণ মানুষের। এই কারণে গরুর চাহিদার চেয়ে উৎপাদনও বেড়ে চলছে। ফলে বাধ্য হয়েই গরুর মাংসের দাম কমিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় চড়া থাকার পর গত কয়েকদিনে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে পাল্লা দিয়ে কমেছে গরুর মাংসের দাম। কমতে কমতে বর্তমানে রাজধানীর কোনো কোনো বাজারে ৫৯০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে ১ কেজি গরুর মাংস।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বেশকিছু বাজারের অধিকাংশ দোকানে মানভেদে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করতে দেখা যায়।

সরেজমিনে রাজধানীর মালিবাগ বাজারে বেশকিছু মাংসের দোকানে ৫৯০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি করতে দেখা যায়। দোকানগুলোতে হ্যান্ড মাইকে হাঁকডাকসহ, মাংসের দাম লেখা ছোট ছোট ব্যানার, পোস্টার ঝুলতে দেখা যায়। সীমিত সময়ের জন্য এই মূল্যে বলে পোস্টারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে হুট করে মাংসের দাম কমার ফলে অনেক দিন ধরেই যারা মাংস কিনতে পারতেন না, তারাও মাংস কিনতে পারছেন। আবারও অনেকে কমে পেয়ে কিনছেন ২ থেকে ৫ কেজি মাংস। মঙ্গলবার মালিবাগ বাজারে মাংস কিনতে আসা মো. বেলাল ফকির এই প্রতিবেদককে জানান, দাম কম শুনে খিলগাঁও এলাকা থেকে মাংস কিনতে এসেছেন তিনি।

বেলাল বলেন, ‘ঈদের পর আর গরুর মাংস খাওয়া হয়নি। কয়েকদিন ধরে দাম কমেছে শুনছি। এজন্য কম দামে মাংস কিনতে এই বাজারে আসছি।’

আতিয়ার মোল্লা নামের আরেক ক্রেতা বলেন, ‘চোখের সামনে গরু জবাই করে কম টাকায় বিক্রি হচ্ছে এ সুযোগে একবারে ৫ কেজি মাংস কিনলাম।’

বিক্রেতারা বলছেন মূলত গরুর দাম কমার কারণেই কমেছে মাংসের দাম। মালিবাগ বাজারের আলতাফ মাংস বিতানের মালিক মো. আলতাফ হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, কিছুদিন আগেও লাখ টাকায় যে গরু কিনতে হতো তা এখন ৮০-৮৫ হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে, এজন্য মাংসের দামও কমেছে। গরুর দাম বাড়লে আবার মাংসের দামও বাড়বে।

মাংসের দাম কমানো হলেও বিক্রেতারা কৌশলে হাড়চর্বি দিয়ে দাম সমন্বয় করছেন বলে অভিযোগ তুলছেন অনেক ক্রেতা। এজন্য অনেকে টাকা বাড়িয়ে দিয়ে ফ্রেস মাংসও কিনছেন। বিক্রেতারা বলছেন মানের বিবেচনায় তাদের দামই যুক্তিযুক্ত।

মালিবাগ বাজারের মাংস বিক্রেতা আলী আকবর ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অন্য বাজারে মাথা, কলিজা, মাংস সবকিছু মেশানো মাংস ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব বাজারের সাথে সমন্বয় করতে বাধ্য হয়ে আলাদা আলাদা দামে মাংস বিক্রি করছি।’

‘কলিজা ৩০০-৩৫০ টাকার বেশি কেজি বিক্রি হয় না, মাথা ৪০০-৪৫০টাকায় বিক্রি হয়, সবকিছু যদি একসাথে মিশিয়ে বিক্রি করা হয় তাহলে তো দাম এমনিতেই কমে যায়।'-যোগ করেন তিনি।

দাম কমার পেছনে ৪ টি কারণ উল্লেখ করেন মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল ইসলাম। বলেন, ‘প্রথমত, সাধারণ মানুষ মাংস খাওয়া ছেড়েই দিয়েছে, দামের কারণে। যে ১ কেজি মাংস কিনতো সে এখন আধাকেজি কিনছে, যে পরিবার ৫ কেজি কিনতো তারা এখন ২ কেজি কিনছে। কাজেই মাংসের চাহিদা কমেছে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় গরু অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসছে। তৃতীয়ত, সাধারণ কৃষকরা পশুপালনে আগের তুলনায় বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে। চতুর্থ কারণ হলো মাংসের চাহিদা কমেছে।’

মাংসের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখতে বাজারে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধির দাবী জানান তিনি।

হঠাৎ গরুর মাংসের দাম কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। সেজন্য হয়তো গরুর যে পরিমাণ বাজারে সরবরাহ হয়েছে, চাহিদা সে তুলনায় কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাকে গরুর মাংসের পেছনে তার ব্যয় কাটতে হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে যেহেতু উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত আছে সেহেতু আগে যে পরিমাণ গরুর মাংস কেনা হতো বা খাওয়া হতো এখন সেই সামর্থ্য অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে মানুষের।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘তাত্ত্বিকভাবে বললে বাজারে যে পরিমাণ চাহিদা তার চেয়ে বেশি জোগান হওয়ার কারণে গরুর দাম কমছে। আগের সিজনে মানুষের গরুর মাংসের প্রতি যে চাহিদা ছিল হয়তো এই সিজনে সেটা কম। যে কারণে দাম কমতে পারে।’

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, ‘এতদিন গরুর মাংসের দাম বেশি হওয়ার কারণে চাহিদা কমে গিয়েছিল। এখন দাম কমেছে তাই চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশের মানুষ অধিকাংশই মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত। এতদিন গরুর মাংস তাদের ক্রয়সীমানার মধ্যে ছিল না তাই তারা কিনতে পারে নাই।’ এর আগে গত মার্চে গরুর মাংসের দাম বেড়ে প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় উঠেছিল। তাতে গরুর মাংস সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বর্তমানে দাম কমে আসায় সব ধরনের মানুষ মাংস কিনতে পারছেন।

(ঢাকাটাইমস/২৯নভেম্বর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :