সহিংস জনতার উত্থান: ভীতিকর ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, দেশে যে প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সংগঠিত সামাজিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। এই ব্যাধির নাম ‘মব কালচার’। এটি এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে আইন, বিচার এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে জনতার একাংশ নিজেরাই বিচারক, জল্লাদ এবং শাস্তিদাতা হয়ে উঠছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে শত শত মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি, শারীরিক নির্যাতন, সামাজিক অপমান এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি- সব মিলিয়ে একটি গভীর সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। কিন্তু সংখ্যার হিসাবই এখানে মূল বিষয় নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো- এই সহিংসতার পেছনের মানসিকতা, সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার অভাব। গণপিটুনি বা মব জাস্টিস কোনো নতুন ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর মাত্রা ও বৈধতার দাবি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। “চোর সন্দেহে হত্যা”, “ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলা”—এসব শব্দবন্ধ এখন যেন নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম। বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা, এবং দ্রুত প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা- এই তিনটি উপাদান মিলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের বিচার আদালতে হওয়ার কথা। কিন্তু যখন জনতা নিজেই বিচার করতে শুরু করে, তখন তা কেবল একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘন করে না, বরং পুরো বিচারব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মব আচরণের বিস্তার। শিক্ষক অপমান, পদত্যাগে বাধ্য করা, এমনকি শারীরিক লাঞ্ছনা—এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তি অপমান নয়, বরং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ধ্বংস করে। একজন শিক্ষক যখন নিরাপদ নন, তখন একটি প্রজন্ম নিরাপদ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি ভয়ের জায়গা হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানে মুক্ত চিন্তা, বিতর্ক, বা মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ সম্ভব নয়।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—মাজার, দরবার, উপাসনালয়—এসব জায়গা ঐতিহাসিকভাবে আধ্যাত্মিকতা ও সহনশীলতার প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব জায়গাও মব সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ধর্মকে ব্যবহার করে জনতাকে উসকে দেওয়া নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন তা পরিকল্পিতভাবে সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কুষ্টিয়ার ঘটনাগুলো দেখিয়েছে—কিভাবে একটি গুজব বা উসকানি মুহূর্তেই প্রাণঘাতী আক্রমণে পরিণত হতে পারে।
গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু যখন সংবাদপত্র অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর, এমনকি আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে—তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়; বরং পুরো সমাজের জানার অধিকারকে আঘাত করে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংবাদ প্রকাশে বাধা—এসব প্রবণতা স্পষ্ট করে দেয় যে, মব শুধু শারীরিক সহিংসতা নয়; এটি চিন্তা ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত আচরণকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা একটি নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। “সমকামী” বা “ট্রান্সজেন্ডার” আখ্যা দিয়ে আক্রমণ—এসব ঘটনা শুধু সহিংসতা নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। এটি একধরনের ‘মোরাল পুলিশিং’, যেখানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের নৈতিক মানদণ্ড অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়—বলপ্রয়োগের মাধ্যমে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হলো—এই মব কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি সংগঠিত? বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, একই ধরনের কৌশল, একই ধরনের স্লোগান, এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির নেতৃত্ব। এতে ধারণা জোরালো হয় যে, এই সহিংসতা সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং এর পেছনে সংগঠিত স্বার্থ কাজ করছে। তদবির বাণিজ্য, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার, অর্থ লেনদেন—এসব বিষয় মবকে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বিভিন্ন থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং অস্ত্র লুটের ঘটনা একটি ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকেত। এসব অস্ত্র যদি এখনও উদ্ধার না হয়ে থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতের সহিংসতার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র যদি তার অস্ত্র ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্র কী করছে? মব সহিংসতা দমন করতে হলে প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, বিচার নিশ্চিত করা, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে শক্তিশালী বার্তা দেওয়া—এসবের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যদি রাষ্ট্র নীরব থাকে, বা রাজনৈতিক কারণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন—প্রথমত, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, বিচার ব্যবস্থার গতি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ আইনের ওপর আস্থা ফিরে পায়। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। পঞ্চমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সহনশীলতা ও মানবাধিকারের মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা আইনকে শ্রদ্ধা করে এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়।
কিন্তু যখন জনতা নিজেরাই বিচার করতে শুরু করে, তখন তা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি আইনের শাসনের পথে হাঁটব, নাকি মবের শাসনের দিকে এগোব। এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের ওপর, এবং আমাদের সবার ওপর।
লেখক: সংবাদকর্মী।
(ঢাকাটাইমস/২৪এপ্রিল/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































