কবিতা
ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া

বাসা থেকে পাখি উড়ে গেলে যেমন বিষন্ন বাতাসে বাঁশির ভাঙা বেদনাধ্বনি বাজে,
তেমনি মানুষও মানুষ থেকে সরে যায়;
স্মৃতির স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে।
নদী কখনো নাব্যতা হারায়, চর উঠে আসে চিরচেনা চুম্বনের চৌহদ্দিতে,
তীর তখন তৃষ্ণার্ত থাকে;
তবু তরঙ্গ ফিরে আসে না তার আবাহনে।
.
গাছ থেকে ঝরে পড়ে গোধূলির গোপন গন্ধমাখা গাঢ় সবুজ পাতা,
মাটিও তাকে আগের মতো আর নিতে পারে না মমতায় মিশিয়ে।
মায়ের কোল থেকে সন্তান সরে যায়
শহরের শীতল সীমানাহীন সড়কে,
চিঠির ভাষা বদলে যায়, বদলে যায় চেনা চেহারার চিরন্তন চিহ্নও।
.
বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়—ব্যস্ততার বিষে বিবর্ণ হয়ে যায় বিকেলের বেঞ্চ,
একসাথে দেখা স্বপ্নগুলো স্টেশনের ধোঁয়ায় ধূসর হয়ে হারিয়ে যায়।
প্রেমিক প্রেমিকা থেকে সরে গেলে আয়নায়ও আলোর অমিল লাগে,
অলিন্দে অলিন্দে জমে ওঠে অব্যক্ত অভিমানের অন্ধ অরণ্য।
.
দেশ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়—পাসপোর্টের পাতায় পুড়ে যায় পরিচয়ের পাখা,
ভাষা তখন ভাঙা উচ্চারণে ভিক্ষে মাগে ভিনদেশি বাতাসের কাছে।
ধর্ম থেকে দয়া সরে গেলে দেবালয়ও দগ্ধ ধুলোর মতো নিষ্ঠুর হয়,
নীতির নগরী নীরব নেকড়েদের নখরে নতজানু হয়ে পড়ে।
.
শ্রমিক বিচ্ছিন্ন হয় শস্য থেকে, কৃষক বিচ্ছিন্ন হয় নিজের ক্ষেতের ফসল থেকে,
শহর বিচ্ছিন্ন হয় শিউলি-ভেজা সকালের স্বচ্ছ সুবাস থেকে।
বই থেকে পাঠক সরে গেলে শব্দগুলো শ্মশানের শীতল শিলালিপি হয়ে যায়,
কবিতাও তখন কেবল কালি—কোনো কণ্ঠের কম্পন নয়।মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকেও হারায় নিজেরই নির্মিত নিঃসঙ্গ নগরে,
আত্মা বিচ্ছিন্ন হয় আয়না থেকে, অথচ মুখ রয়ে যায় মুখোশে মোড়া।
শেষে একদিন সময়ও বিচ্ছিন্ন হয় সমস্ত স্পর্শ, সমস্ত সংসার, সমস্ত স্বর থেকে—
শুধু শূন্যতা বসে থাকে, ভাঙা বাসার পাশে,
উড়ে যাওয়া পাখির পালকের মতো স্মৃতিচিহ্ন রেখে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































