সর্বস্ব হারিয়েও কেন শেয়ারবাজারে ফিরে আসেন বিনিয়োগকারীরা!

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এক অদ্ভুত বাস্তবতার নাম। এখানে মানুষ তার পুঁজি হারায়, আবার ফিরে আসে। ধস নামে, তবু মনিটরের সামনে ভিড় কমে না। কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তবুও নতুন অ্যাকাউন্ট খোলে। বারবার প্রতারণা, কারসাজি, গুজব, ধস- সবকিছুর পরও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেন শেয়ারবাজার ছাড়তে পারেন না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক বাস্তবতা, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো, এমনকি এক ধরনের নীরব বেঁচে থাকার সংগ্রামও। বাংলাদেশে একজন সাধারণ চাকরিজীবী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন শেয়ারবাজারে আসেন, তিনি কেবল একটি কোম্পানির শেয়ার কিনতে আসেন না। তিনি আসেন নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কেউ দ্রুত আর্থিক মুক্তির কল্পনায় বাজারে প্রবেশ করেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বাজার বহু মানুষের কাছে আশার জায়গা হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ হতাশারও নাম হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস আসলে অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের ইতিহাস। ১৯৯৬ সালের ধস যেমন লাখো মানুষকে নিঃস্ব করেছিল, তেমনি ২০১০-১১ সালের ভয়াবহ পতন পুরো মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক নিরাপত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
বাজারে তখন এমন এক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, যেন শেয়ার কিনলেই টাকা দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, অফিস—সব জায়গায় আলোচনার বিষয় ছিল শেয়ার। যারা আগে কখনও বিনিয়োগ করেননি, তাঁরাও বাজারে নেমেছিলেন। কিন্তু ধস নামার পর দেখা গেল, লাখো মানুষ জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় বিপর্যয়ের পরও বাজার পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়নি। বরং কিছুদিন পর আবার মানুষ ফিরেছে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বুঝতে হবে।
দেশে এখনও অধিকাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। ব্যাংকে টাকা রাখলে যে সুদ পাওয়া যায়, অনেক সময় তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত অর্থে সম্পদ বাড়ে না, বরং কমে যায়। অন্যদিকে জমি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করতে বড় মূলধন প্রয়োজন। ছোট ব্যবসা শুরু করতে ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে শেয়ারবাজার এমন একটি জায়গা, যেখানে অল্প পুঁজিতেও বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়। এই স্বপ্নই মানুষকে বারবার বাজারে ফিরিয়ে আনে।
বাংলাদেশের সমাজে দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের গল্প দেখে অনেকের মধ্যেই দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কেউ হয়তো শুনলেন, তার পরিচিত একজন কয়েক মাসে কয়েক লাখ টাকা লাভ করেছেন। সেই গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কেউ বলেন না, একই সময়ে আরও শত শত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। লাভের গল্প মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেয়, ক্ষতির গল্প মানুষ এড়িয়ে যেতে চায়। ফলে বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টান তৈরি হয়।
অর্থনীতিতে একটি শব্দ আছে- ‘হার্ড বিহেভিয়ার’ বা দলবদ্ধ আচরণ। মানুষ যখন দেখে অন্যরা কোনও কিছু করছে, তখন নিজেও সেটি করতে আগ্রহী হয়। শেয়ারবাজারে এটি খুব শক্তিশালীভাবে কাজ করে। কোনও শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করলে মানুষ ভাবেন, “এখন না কিনলে সুযোগ মিস হয়ে যাবে।” তখন অনেকেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা না বুঝেই বিনিয়োগ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক গ্রুপ কিংবা অনানুষ্ঠানিক টিপসের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন। বাজারের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা ঠিক এই মনস্তত্ত্বকেই কাজে লাগান।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বড় একটি সমস্যা হলো তথ্যের অসমতা। সব বিনিয়োগকারীর হাতে সমান তথ্য থাকে না। অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী অংশগ্রহণকারীরা অনেক সময় আগে থেকেই বুঝতে পারেন কোন শেয়ারের দাম বাড়তে পারে, কোথায় কারসাজি হচ্ছে কিংবা কখন বের হয়ে যেতে হবে। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেই তথ্য পান দেরিতে। ফলে তাঁরা বাজারে প্রবেশ করেন তখন, যখন দাম ইতোমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। পরে দরপতনের সময় তাঁরা আটকে যান। এই প্রক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক সম্পদের নীরব স্থানান্তর বলেন। অর্থাৎ কম তথ্য ও কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সম্পদ ধীরে ধীরে চলে যায় বেশি প্রস্তুত ও প্রভাবশালী অংশগ্রহণকারীদের হাতে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। উন্নত দেশগুলোর বাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী যেমন পেনশন ফান্ড, বিমা কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল, মিউচুয়াল ফান্ড বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত ওঠানামা কম হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই কাঠামো এখনও দুর্বল। এখানে বাজারের বড় অংশ আবেগ, গুজব এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা তৈরি হয় না।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অনেক মানুষ শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে নয়, বরং ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত আয়, চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই দ্রুত আর্থিক উন্নতির পথ খোঁজেন। শেয়ারবাজার সেই মানসিক জায়গাটিকে স্পর্শ করে। মানুষ মনে করেন, “একটা ভালো শেয়ার পেলেই জীবন বদলে যাবে।” এই বিশ্বাসই মানুষকে বারবার টেনে আনে পুঁজিবাজারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বাজারে এখনও বহু দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানি টিকে আছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের জেড ক্যাটাগরিতে বছরের পর বছর পড়ে থাকা অনেক কোম্পানি নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় না, সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না, এমনকি কিছু কোম্পানির ব্যবসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। তারপরও এসব শেয়ার বাজারে লেনদেন হয়। মাঝে মাঝে এসব কোম্পানির শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে দরবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে। এখানেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন।
অনেক সময় একটি দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। কিছু গোষ্ঠী কম দামে শেয়ার কিনে বাজারে গুজব ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়- “এই শেয়ার অনেক দূর যাবে।” সাধারণ মানুষ সেই প্রলোভনে শেয়ার কিনতে শুরু করেন। দাম দ্রুত বাড়ে। তারপর একসময় বড় খেলোয়াড়রা শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান। দাম ধসে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’।
এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলেও কেন মানুষ সতর্ক হন না? কারণ মানুষ ক্ষতি সহজে মেনে নিতে পারেন না। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘লস অ্যাভারশন’। একজন বিনিয়োগকারী যখন বড় ক্ষতির মুখে পড়েন, তখন তিনি সাধারণত শেয়ার বিক্রি করতে চান না। তিনি ভাবেন, “আরেকটু অপেক্ষা করি, হয়তো দাম আবার বাড়বে।” এই আশাই তাঁকে বাজারে ধরে রাখে। পরে তিনি নতুন করে কিছু টাকা বিনিয়োগ করে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবেই তার ক্ষতির চক্র দীর্ঘ হয়।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রত্যাশাও বড় ভূমিকা রাখে। সরকার পরিবর্তন হলেই অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেন বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলে আশা তৈরি হয়। নতুন নীতিমালার ঘোষণা এলেও সাময়িক আশাবাদ তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তব সংস্কার না হলে সেই আশা দ্রুত ভেঙে যায়।
মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলো একসময় ছিল উৎসবমুখর। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মানুষ ভিড় করতেন। বড় বড় মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে শেয়ারের দাম দেখতেন। কোথাও আনন্দ, কোথাও উত্তেজনা। এখন সেই জায়গাগুলোতে প্রায়ই নিস্তব্ধতা দেখা যায়। অনেকের চোখে ক্লান্তি। কেউ কেউ এখনও আশায় বসে থাকেন- হয়তো একদিন বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর গল্প পুরো বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তিনি হয়তো জীবনের সঞ্চয় থেকে আট-দশ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন তার মূল্য নেমে এসেছে তিন-চার লাখে। তবুও তিনি পুরোপুরি বাজার ছাড়েননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতে চান, একদিন হয়তো ক্ষতি পুষিয়ে যাবে। এই আশাই বাজারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যাটা শেয়ারবাজারের ধারণায় নয়; সমস্যাটা বাজারের সুশাসন, কাঠামো ও বিনিয়োগ সংস্কৃতিতে। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রয়োজন হয়। যদি পুরো অর্থনীতি শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ে। শক্তিশালী পুঁজিবাজার সেই চাপ কমাতে পারে। উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই ভারসাম্য তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা জানেন, বাজারে ঝুঁকি আছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা এটিও বিশ্বাস করেন যে বাজারে ন্যূনতম ন্যায়বিচার রয়েছে। সেখানে তথ্যপ্রকাশের নিয়ম কঠোর, কারসাজির শাস্তি দ্রুত, আর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি শক্তিশালী। প্রতিবেশী ভারতও গত দুই দশকে পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, মিউচুয়াল ফান্ড সংস্কৃতি, ডিজিটাল তথ্যপ্রকাশ এবং বিনিয়োগ শিক্ষা সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে। সেখানে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি তৈরি করেছে। মানুষ প্রতিমাসে অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করছেন। ফলে বাজারকে আর শুধু জুয়া বা দ্রুত ধনী হওয়ার জায়গা হিসেবে দেখা হয় না।
বাংলাদেশেও পরিবর্তনের সুযোগ আছে। কিন্তু এর জন্য প্রথমে বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্বল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বছরের পর বছর লোকসান করা, আর্থিক প্রতিবেদন না দেওয়া কিংবা কার্যক্রম বন্ধ কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা ডিলিস্টিংয়ের আওতায় আনতে হবে। কারণ বাজারে ‘জম্বি কোম্পানি’ রেখে দিলে আস্থা কখনও ফিরবে না।
কারসাজি দমনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জরুরি। অনেক সময় বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এতে অপরাধীরা সাহস পায়। দ্রুত জরিমানা, লেনদেন নিষেধাজ্ঞা এবং আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং পেশাদার আচরণ নিশ্চিত না হলে বাজারে আস্থা ফিরবে না। অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেন, তাঁদের ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক করা হয় না। বরং স্বল্পমেয়াদি লেনদেনে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন প্রয়োজন।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সংস্কারও জরুরি। উন্নত বিশ্বে সাধারণ মানুষ সরাসরি শেয়ার কেনার বদলে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেন। এতে ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাত এখনও প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী নয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাত আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি সম্ভবত বিনিয়োগ শিক্ষায়। এখনও অনেক মানুষ মনে করেন, শেয়ারবাজার মানেই দ্রুত লাভ। অথচ বাস্তবে সফল বিনিয়োগ হলো দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং ধৈর্যের বিষয়। একটি ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ ধরে রাখার সংস্কৃতি বাংলাদেশে এখনও শক্তভাবে তৈরি হয়নি। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই আর্থিক শিক্ষা বাড়ানো দরকার। মানুষকে বুঝতে হবে, শেয়ারবাজারে লাভ যেমন সম্ভব, ক্ষতিও তেমনি বাস্তব।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন কীভাবে পড়তে হয়, ঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ কেন জরুরি—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন। অনেক বিনিয়োগকারী এখনও সঠিক তথ্য সহজভাবে পান না। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ঋণের পরিমাণ, লভ্যাংশ ইতিহাস, আয় প্রবণতা বা খাতভিত্তিক তুলনা সহজভাবে দেখার সুযোগ থাকলে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কমবে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই- মানুষ এখনও পুরোপুরি আশা হারাননি। এত ধস, এত ক্ষতি, এত হতাশার পরও মানুষ বাজারে ফিরে আসেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতে চান, একদিন এই বাজার স্বচ্ছ হবে, স্থিতিশীল হবে, ন্যায্য হবে। এই বিশ্বাসকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যায় না। কারণ শেয়ারবাজার শুধু কিছু সংখ্যার ওঠানামা নয়। এটি দেশের সঞ্চয় ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি। এটি মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। যখন একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাজারে টাকা রাখেন, তখন তিনি আসলে দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা রাখেন। সেই আস্থার মূল্য অনেক বড়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হতে চায়, তাহলে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য পুঁজিবাজার গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কারণ ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি একসময় সীমাবদ্ধতায় পড়ে যায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রয়োজন হয়। নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। শক্তিশালী পুঁজিবাজার সেই ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু তার জন্য বাজারকে প্রথমে মানুষের কাছে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণ করতে হবে।
যে বাজারে সাধারণ মানুষ বারবার মনে করেন তাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন, সেই বাজার দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। আবার যে বাজারে মানুষ সর্বস্ব হারিয়েও ফিরে আসেন, সেই বাজারের ভেতরে এখনও সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজার আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে হতাশা, অন্যদিকে আশা। একদিকে অবিশ্বাস, অন্যদিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা। এই বাজারকে কোন পথে নেওয়া হবে, সেটি এখন নির্ভর করছে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগ সংস্কৃতির ওপর।
লেখক: সংবাদকর্মী ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষক।
(ঢাকাটাইমস/১৭মে/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































