এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ মেনে নেবে না ছাত্র অধিকার পরিষদ

এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান। তিনি বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বাড়ানো হলে আবারও স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নাজমুল হাসান বলেন, কোটার চেয়ে বড় একটি ক্যান্সার হচ্ছে এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসির মাধ্যমে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিকভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হচ্ছে। হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া পরিবর্তনের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে আবারও মামা-চাচা, স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার সংস্কৃতি ফিরে আসবে। আমরা কোনোভাবেই এই ক্যান্সার ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে দেব না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সভার প্রসঙ্গ তুলে নাজমুল হাসান বলেন, গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এনটিআরসি শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে থাকবে এবং শিক্ষক নিয়োগে আর সুপারিশ করবে না।
তিনি বলেন, গতকাল শিক্ষামন্ত্রীর যে বক্তব্য আমরা শুনেছি, সেটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। একটি সিদ্ধান্ত হওয়ার পর সেটিকে অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণের শামিল। আমরা এই আচরণের নিন্দা জানাই।
তিনি আরও বলেন, ৩ আগস্টের ওই সভার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা খতিয়ে দেখে তদন্ত করতে হবে।
সরকারি চাকরির শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের দাবি জানিয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, সরকারি দপ্তর ও চাকরিতে চার লাখের বেশি পদ খালি রয়েছে। অনতিবিলম্বে এসব শূন্য পদে নিয়োগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, এই বিপুলসংখ্যক শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হলে তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বেকারত্ব কমবে। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু গত দুই বছরে বেকারদের কর্মসংস্থান তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ দেখা যায়নি।
দেশের চাকরির বাজারের সংকট তুলে ধরে নাজমুল হাসান বলেন, বর্তমানে চাকরির বাজারের যে ভয়াবহ অবস্থা, সরকার সেটি অনুধাবন করতে পারছে কি না, আমরা সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছি। কিছুদিন আগে রেলওয়ের একটি নিয়োগে মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সহকারী ক্লিনার পদে আবেদন করতে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী পদেও উচ্চশিক্ষিত তরুণরা আবেদন করছেন। এটি দেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকটের ভয়াবহ চিত্র।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
নাজমুল হাসান বলেন, আমরা আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ দেখতে চাই না। কোনো সংগঠন পেশিশক্তি প্রদর্শন করুক বা গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করুক—ছাত্র অধিকার পরিষদ তা মেনে নেবে না।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ছাত্রদল যদি পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে চায়, শিবির যদি গুপ্ত রাজনীতি করতে চায়, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদ তাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড প্রদর্শন করবে।
ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের কঠোর নজরদারি দাবি করে নাজমুল হাসান বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কোনোভাবেই ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা খাতে যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, সেটি যেন সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গে নাজমুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতের উদ্দেশে এমন কঠোর ভাষার প্রতিবাদ আমরা আগে দেখিনি। বাংলাদেশ সরকার যে অবস্থান নিয়েছে, আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো দেশের করদরাজ্য বা ক্লায়েন্ট স্টেট হবে না—সরকারের এই বক্তব্য শুধু সরকারের বক্তব্য নয়, এটি বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার বক্তব্য।
ভারতের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভারতের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়—বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে, নাকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে। বাংলাদেশে আধিপত্যবাদী কোনো বয়ান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে আমরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকব।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রামগঞ্জে মানুষ নিয়মিত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে। জনগণের এই সংকটকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষ ভুতুড়ে বিলের প্রমাণ নিয়ে বসে আছে। জনগণকে চ্যালেঞ্জ না করে তাদের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করতে হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে জ্বালানি খাতের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য উদ্যোগের সমালোচনা করে নাজমুল হাসান বলেন, বসুন্ধরাসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব দেওয়ার যে চিন্তা করা হচ্ছে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করছি।
তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমিয়ে দিতে পারে এবং সরকারকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিবর্তনের উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ৩ আগস্টের সভার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। কীভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কারা এর পেছনে ছিলেন—তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
১. এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। প্রয়োজনে এনটিআরসির সঙ্গে পিএসসির সমন্বয়ের মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. সরকারি দপ্তর ও চাকরিতে বিদ্যমান শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে, যাতে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
৩. ক্যাম্পাসের অস্থিরতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে নাজমুল হাসান বলেন, এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা যাবে না। মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থান, ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট সমাধানে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































