‘নারী উন্নয়নে অনেক কাজ হচ্ছে’

সৈয়দ ঋয়াদ
| আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৭, ১৭:১০ | প্রকাশিত : ০৫ মার্চ ২০১৭, ১৭:০৭

সাহিন আহমেদ চৌধুরী- মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। তিনি সরকারের অতিরিক্ত সচিব। বিসিএস ৮৪তম ব্যাচের মাধ্যমে সরকারি পদে যোগ দেন। দেশের নারীদের উন্নয়ন-অগ্রগতি আর নারীর প্রতিদিনের সংগ্রাম নিয়ে অকপটে বলেছেন ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে। আলাপ করেছেন সৈয়দ ঋয়াদ

আমাদের সমাজে নারীদের অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে। আপনার উঠে আসার গল্পটা জানতে চাই।

আমার বাবা ছিলেন মেডিকেলের একজন প্রফেসর। তিনি ভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। আমাদের সময় আমাদের পড়াশোনা করতে কোনো ধরণের অুসবিধায় পড়তে হয়নি। কারণ আমাদের বাবা-মা চাইতেন আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ করি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক  বা সামাজিক অবস্থা কিন্তু তখনো মেয়েদের অনুকূলে ছিল না। আর মেয়েদের পড়াশোনা করার পরিবেশও অতেটা সুবিধের ছিল না।  আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আব্বাকে বলতো, মেয়েরা বড় হচ্ছে তাদের বিয়ে দিচ্ছেন না কেন? আব্বা বলতেন, ‘আগে মেয়েরা পড়াশোনা করে স্বনির্ভর হোক। তারপর বিয়ের চিন্তা।’ পারিবারিক সুযোগ থাকলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিন্তু ঠিকই ছিল। আব্বা সবসময়ই চাইতেন আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ করি।

আপনাদের সময়ে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই।

আমি দেখেছি আমার অনেক ক্লাসমেট এবং বন্ধুরা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাদের বিয়ে হয়েছে। কারও আবার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, এমন সময় বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর পর কারও বাচ্চা হয়ে গেছে। একদিকে ঘর-সংসার, অন্যদিকে বাচ্চা- ফলে তাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বাধা পড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পড়াশোনা করা যায় না। তার উপর আমাদের সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের শিক্ষাকে অত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। সেদিক থেকে বলবো, আমাদের সময় পড়াশোনা  কিংবা চাকরি কোনোটাই মেয়েদের জন্য এতো সহজ ছিল না। এখন কিন্তু পৃথিবীটা অনেক বেশি উন্মুক্ত, ছেলেমেয়েদের যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে।

যখন সিভিল সার্ভিসে আসেন, তখন পরিস্থিতি কী ছিল?

আমি ৮৪-ব্যাচের বিসিএসের মাধ্যমে ১৯৮৬ সালে সিভিল সার্ভিসে জয়েন করি। সেই সময়ে মেয়েরা সিভিল সার্ভিসে আসা শুরু করেছে মাত্র। সিভিল সার্ভিসে কাজ করা মেয়েদর জন্য তখনো অত সহজ ছিল না। আর আমি জয়েন করি কুমিল্লার মতো একটি মফস্বল শহরে। আমি তখন ট্রাকস্যুট পড়ে, সাইক্লিং করে লন টেনিস খেলতে যেতাম। অনেক পুরুষ অফিসারই আমাকে সহ্য করতে পারতো না। কারণ আমি যখন কাজ করছি তখন নিজেকে একজন নারী না ভেবে একজন কর্মী মনে করেছি।  আমার সহকর্মীরা  আমার নামে অনেকে বিচার পর্যন্ত দিয়েছে। কারণ তারা তখনো নারী স্বাধীনতায় সেভাবে বিশ্বাস করতো না।

আপনিতো কুমিল্লা অফিসার্স ক্লাবের প্রথম নারী এক্সিকিউটিভ মেম্বার ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাই।

তখন অফিসার্স ক্লাবগুলোতে দুটো উইং ছিল- একটি নারীদের অন্যটি পুরুষদের। কুমিল্লা অফিসার্স ক্লাবের ১০০ বছর পূর্তির সময় ছিল সেটা। এই অফিসার্স ক্লাবটি করেছিল ত্রিপুরার রাজা। এটিতে কোনো নারী এক্সকিউটিভ মেম্বার থাকার নিয়ম ছিল না। নীতিমালায় ছিল মহিলা কোনো অফিসার এক্সিকিউটিভ কমিটিতে থাকতে পারবে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল, আমিও একজন অফিসার, তাহলে আমি কেন সেখানে থাকতে পারবো না? প্রথম কোনো নারী সদস্য হিসেবে এক্সিকিউটিভ কমিটিতে যোগ দেই।

এখন তো সার্বিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। সবকিছুতেই নারীরা এগিয়েছে। এ বিষয়টি কেমন লাগে?

সত্যি বলতে, নিঃসন্দেহে অনেক ভাল। তবে আরও অনেক দূর যেতে হবে নারীদের। কাগজে-কলমে নারীরা সমান অধিকার পেলেও বাস্তবে কিন্তু ততটা স্বাধীন এখনও হতে পারেনি। তবে সব সেক্টরেই নারীরা কাজ করতে আসছে। নারীদের বিশ্বটা ক্রমশই উন্মুক্ত হচ্ছে- এটা আমাদের জন্য আশার খবর। আমাদেরকে যে ধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই সমস্যাগুলো এখন আর নেই।

নারীদের উন্নয়নে এখন কাজ করছেন। এই কাজ নিয়ে জানতে চাই।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নারীদেরকে নিয়ে একটু বড় পরিসরে কাজ করছে। এখানে নারী উন্নয়নের অনেক ধরণের কাজ হচ্ছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারীদের বিভিন্ন রকম আবাসিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। অনেকগুগুলো ট্রেডে প্রশিক্ষণ হচ্ছে। যিনি যে ধরণের কাজ পছন্দ করছেন, তিনি সে ধরণের কাজই করতে পারছেন। গার্মেন্টসের উপর আমাদের যে প্রশিক্ষণটা আছে, সেটা সম্পন্ন করার পর আমরা জব ফেয়ারের ব্যবস্থা করি। সেখান থেকে চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে সহজেই। এছাড়া মেয়েদের সিএনজি, মোটর পার্টসের উপরও কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগেরই প্রশিক্ষণের পর চাকরি হয়ে গেছে।

নারী উন্নয়নে আপনাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংখ্যা কতো?

নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে সাতটি বড় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। একটি রয়েছে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সবমিলিয়ে আটটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এছাড়া প্রতিটি জেলায় মহিলা অধিদপ্তরের অধীনে বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। সেখানে সারা বছর সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমরা এখন উপজেলা পর্যায়ে কাজ করার চিন্তা করছি। ১০ লাখ সুবিধাবঞ্চিত নারীকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে লাইফ স্কিল্ড প্রশিক্ষণ ও লাইভলিহুড প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

দরিদ্র মায়েদের জন্য আপনারা কী করছেন?

গ্রামের বা শহরে সুবিধাবঞ্চিত এবং সন্তান আছে এমন লেকটেটিং (সন্তানকে স্তন পান করায় এমন) মায়েদেরকে প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এই ভাতাটা আমরা পর্যাপ্ত মনে করছি না। এজন্য এটাকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ টাকায় উন্নিত করা হচ্ছে। এই টাকাটা সরাসরি সেই নারীর ব্যাংক একাউন্টে চলে যাবে। প্রতিটি প্রকল্পই প্রান্তিক নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা লেভেলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এই কাজগুলো করে থাকে।

কর্মজীবি নারীদের আবাসন সংকট বড় বিষয়। হোস্টেল নিয়ে একটু জানতে চাই।

নারীদের জন্য সারাদেশে এখন পর্যন্ত সাতটি কর্মজীবি মহিলা হোস্টেল আছে। এগুলোতে কর্মজীবি নারীরা থাকতে পারছেন। এরমধ্যে তিনটি রয়েছে ঢাকায়। আর চারটি ঢাকার বাইরে। এছাড়া আশুলিয়ায় গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য আরও একটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় কর্মজীবী হোস্টেল করতে জমির খোঁজা হচ্ছে। সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করবে।

শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের অভাবে এখনও অনেক নারী কাজে যুক্ত হতে পারছে না। এ নিয়ে কী বলবেন?

যেসব কর্মজীবী মহিলার ছোট বাচ্চা আছে, তাদের সন্তানকে কোথায় রেখে যাবে? এজন্যে তারা সমস্যায় পড়ছে। এর জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ৪৩টা ডে কেয়ার সেন্টারের কাজ এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আরও নতুন করে ২০টি ডে কেয়ার হওয়ার কথা চলছে। এরমধ্যে ঢাকায় হবে ১০টি এবং ঢাকার বাইরে ১০টি। এরপরই আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডে কেয়ার সেন্টার করার কথা চিন্তা করবো।

নারী উন্নয়নে সরকার প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করছে, এগেুলোয় কোন ধরণের প্রশিক্ষণ থাকবে?

বর্তমানে ১৩৬ উপজেলায় শুধু সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একনেকে নতুন একটি বিল পাস হয়েছে। যেখানে ৪২৬টি উপজেলায় মহিলা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবে। এই কেন্দ্রগুলোয় দুটি ট্রেডের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই ট্রেডগুলো পরিচালিত হবে প্রয়োজন অনুযায়ী। যে এলাকায় যে ধরণের প্রশিক্ষণ দরকারে, সেভাবেই সাজানো হচ্ছে এই কর্মসূচি।

জয়িতার অন্বেষণ- এই নামে একটি একটি কর্মসূচি পরিচালনা করছেন, এ সম্পর্কে জানতে চাই।

এ বছর আমরা এই কাজটি করছি। এখানে সারা দেশের সাতটি বিভাগ থেকে শ্রেষ্ঠ ৩৫ জন জয়িতাকে বাছাই করা হবে তাদের মধ্যে থেকে আবার জুড়িবোর্ড পাঁচ জন জয়িতাকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা বাছাই করছে। এই বছর অবশ্য ময়মনসিংহ বিভাগসহ ৮টি বিভাগ হয়েছে। যারা সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদেরকে  প্রতিষ্ঠা করেছে- হতে পারে তারা এসিড সন্ত্রাসের শিকার অথবা প্রতিবন্ধী নারী, যারা সমাজে ভীষণভাবে অবহেলিত। এমন সেরা সংগ্রামী যারা, তারাই পুরস্কৃত হবেন। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষ্যে মহিলা অধিদপ্তর এই আয়োজনটা করা হচ্ছে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭ সম্প্রতি হয়েছেএ বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?

বাল্যবিবাহের যে আইনটা আছে, সেটা ব্রিটিশ আমলের। এতে খুব অল্প পরিমাণ জেল-জরিমাণার বিধান রাখা হয়েছে। এটাকে নতুন করে আবার আইন করা হয়েছে। কোনো মেয়ে যদি বাবা মাযের অমতে পালিয়ে যায়, এমনও হতে পারে এই মেয়টা গর্ভবতী হয়ে গেছে, তখন ছেলেটাকে জেলে দিলেতো সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এই বাচ্চাটাকে করা হবে জেল খাটা আসামীর ছেলে। সুতরাং সেই ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সম্মতির পর কোর্টের সম্মতি নিতে হবে। ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ দেখে যে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে, তারপরও আমরা কিন্তু বিশেষ বিধানের পক্ষে নই। কিন্তু যেটা ঘটে গেছে, সেটাকে কি করা যায়, সেটাকেতো একাট বৈধতা দিতে হবে। আন্ডার এইজড একটি মেয়ে, এমন যদি হয় মা মারা গেছে বাবা অরেকটা বিয়ে করেছে, তখন বাচ্চারা নানী-দাদীর কাছে বড় হয়। কিন্তু নানি বা দাদী তার সিকিউরিটিটা এনশিওর করতে পারছে না। ঐ মেয়েটা যদি কোনে ধরণের হেরেজমেন্টের শিকার হয়, তখন কি করবে? সেজন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সামনেই নারী দিবস। এই বিশেষ দিনটি নিয়ে কিছু বলুন।

নারীদের জন্য একটি বিশেষ দিবস হয়েছে। নারীদের অধিকারের জায়গাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত। সবচেয়ে বড় কথা- সমাজে নারীদের নিয়ে আগে যে ধ্যাণ-ধারণা ছিল, এসব ক্ষেত্রেও বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। আগামীর পৃথিবী নারীর জন্য আরও সুন্দর হচ্ছে এবং এমন একটি পৃথিবীই আমাদের সব সময়ের প্রত্যাশা ছিল।

আলোকচিত্র : শেখ সাইফ

ঢাকাটাইমস/০৫মার্চ/এসআর/টিএমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত