আরেকটি নির্বাচনের আগে আত্মবিশ্বাসী, উদ্যমী শেখ হাসিনা

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২২ জুলাই ২০১৮, ১২:১৪

শেখ হাসিনার মত পরিশ্রমী প্রধানমন্ত্রী ক’জন আছেন বিশ্বে? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে বাকি পুরো সময়টা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ব্যয় করেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সরকার টানা পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা। আরেকটি নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। অনেকটুকু পথ পেরিয়ে এসে জীবনের এই পর্যায়েও শেখ হাসিনা পুরো উদ্যম, উৎসাহ ধরে রেখেছেন। আত্মঘাতী বাঙালি জাতি কি শেখ হাসিনার এই কষ্টের মূল্য দিবে শেষ পর্যন্ত? জাতি হিসেবে ৫২ কিংবা ৭১ এর মত অর্জন যেমন আমাদের আছে, আবার ৭৫ এর মত কলঙ্কের জন্মও দিয়েছি আমরাই।

জাতি হিসেবে বাঙালি যেমন বীরের তকমা গায়ে লাগিয়েছে, আবার নিজেরাই জন্ম দিয়েছে অবিশ্বাস্য, লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতার। তাই মনে নানা সংশয় জাগা স্বাভাবিক। তবে ইতিহাস বলছে, সঠিক নেতৃত্বের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকলে জাতি হিসেবে বাঙালি খারাপ করে না।

কমপক্ষে আরও এক মেয়াদে বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেশসেবা করার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী এবং সক্ষম শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ভারত সফর নিয়ে আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে সাহসী ও বলিষ্ঠ বক্তব্যগুলো যেন শেখ হাসিনার এই আত্মবিশ্বাসের স্বাক্ষর বহন করছে। সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও জাতি দেখল একজন স্বাপ্নিক, আত্মবিশ্বাসী, বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রধানমন্ত্রীকে। নিজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বলে কিঞ্চিৎ বিব্রত প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘জনগণ আমাকে ভালোবাসে, আমার সংবর্ধনা লাগে না’।

জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি শেখ হাসিনা এখনো দারুণ জীবনীশক্তির প্রদর্শন করে চলেছেন। রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির জটিল সব হিসাব মিলিয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় পর্যায় ছাড়িয়ে নিজেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংকট ব্যবস্থাপনায় দারুণ সব সাফল্য দেখিয়ে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা তাই দেশের ইতিহাসের সফলতম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এত কাজ করে, এত শ্রম দিয়ে, এত ঝুঁকি নিয়েও শেখ হাসিনাকে কোনোরকম ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছে না।

শেখ হাসিনার দেহে যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত প্রবাহিত! সেদিন গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে  ঘটনাচক্রে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তবে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হওয়ার  সংবাদ সম্মেলনের সাথে যুক্ত ছিলেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে চামচামি, তেলবাজি পছন্দ করেন না, সেটি আমরা সেদিন স্বচক্ষে দেখলাম। দেশের এক মুরুব্বী সাংবাদিক গণভবনে বলেছিলেন, আপনাকে এখনো নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়নি! সাথে সাথে শেখ হাসিনার শক্ত জবাব। যে নোবেল পুরস্কারে মানুষের রক্তের দাগ লেগে থাকে, যে নোবেল পুরষ্কার আনতে কোটি কোটি ডলার মূল্যের লবিস্ট নিয়োগ করতে হয়, সে শান্তির নোবেল তাঁর লাগবে না। আসলেই তো, যে নেত্রী কোটি কোটি মানবতাবাদী মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, তাঁর কেন এই পকেট-নোবেল লাগবে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। বর্তমানে বাংলাদেশের ১০ম জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের প্রায় সব সদস্যসহ রাজধানী ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকার ৩২ নং বাড়িতে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়। দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা সেসময় বিদেশে থাকায় হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষা পান। বাবার লাশও দেখতে দেয়া হয়নি দুই মেয়েকে। খন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমানের সরকার দীর্ঘ ৬ বছর বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে দেশে ফিরতে দেয়নি। আওয়ামী লীগ ১৯৮১ সালে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই দলের সভাপতি নির্বাচিত করে।

অবশেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তারিখে নিজ দেশে ফিরেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁর বাবা। বাংলাদেশের বাঙালি জাতিকে  রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দিয়ে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু অপশক্তি বঙ্গবন্ধুকে জাতি ও রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া সমাপ্ত করতে দেয়নি। দেশে ফিরে শুধু শহীদ পিতার সন্তান হয়েই বেঁচে থাকেন নি শেখ হাসিনা। একদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করেছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এ পর্যন্ত ২০ বার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন এবং নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা পরিচয়ের পাশাপাশি শেখ হাসিনা আজ পুরো বিশ্বে শীর্ষ ও আলোচিত নেতৃত্বের একজন।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের নানা সংগ্রামে দ্রুত অতীত ভুলে যান, হোক সে অতীত গৌরবের বা গ্লানির। সাধারণ মানুষকে সবকিছু মনে করিয়ে দিতে হয়। আবার সত্য স্বীকারেও আমাদের এক ধরনের স্বভাবজাত দৈন্যতা রয়েছে। সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার মাত্রা প্রবল। এই তো সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক প্রশ্ন তুলেছেন, বঙ্গবন্ধু কি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন!! যে মানুষকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আবর্তিত হয়েছে, যার ঘোষণায় এবং আহবানে লাখ লাখ মানুষ অকাতরে নিজের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, সেই মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন কি না, প্রশ্ন করেছেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক!! এমন বেঈমানি দেখে মন খারাপ হয়ে যেতে পারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কিন্তু তিনি জানেন, দেশের মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর উপর ভরসা রেখেছে। তাই তো তিনি গুটিকয়েকের বেঈমানির জন্য গোটা জাতিকে ত্যাগ করতে পারবেন না, কোনোদিন করেননি।  যার পিতা, মাতা, ভাইদের আমরা হত্যা করেছি, সেই তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের ভাগ্য বদলের জন্য।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে গিয়েছিল অনেক। তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে নিজেদের দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠতে পারছি আমরা। মানুষ নিজের চোখের সামনেই উন্নয়ন দেখছে, কিন্তু অনেকে সেটা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। দেখেও যারা না দেখার ভান করছেন তাঁদের জন্য কিছু পরিসংখ্যান এখানে শেয়ার করলাম। বার্ষিক বাজেট : বি,এন,পি ২০০৬ = ৬৯,৭৪০ কোটি টাকা , আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ২,২২,৪৯১ কোটি টাকা, আওয়ামী লীগ ২০১৮ = ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকা; প্রবৃদ্ধি অর্জন : বি,এন,পি ২০০৬ = ৫.৭%, আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ৬.৭%, আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ৭.২৮%,  মাথাপিছু গড় আয় : বি,এন,পি ২০০৬ = ৪২৭ মার্কিন ডলার,  আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ১০১০ মার্কিন ডলার,  আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ১৭৫২ মার্কিন ডলার,  সাক্ষরতার হার : বি,এন,পি ২০০৬ = ৫১.৯০%,  আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ৬৫.০৪%,  আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ৭২.৭৬%,  দারিদ্র হার : বি,এন,পি ২০০৬ = ৪১.৫১%,  আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ২৯.০৩% ,  আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ২৪.৩০%,  সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা : বি,এন,পি ২০০৬ = ৩১০০ মেগাওয়াট,  আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ৮৫২৫ মেগাওয়াট আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ১৭,২০০ মেগাওয়াট , দেশে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী : বি,এন,পি ২০০৬ = ৪৭%, আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ৯০%, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ : বি,এন,পি ২০০৬ = ৩.৮৮ বিলিয়ন মা: ডলার আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ১৩.১১ বিলিয়ন মা: ডলার, আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ৩৩ বিলিয়ন মা: ডলার; রেমিটেন্স প্রবাহ :  বি,এন,পি ২০০৬ = ৬৪০ মিলিয়ন র্মাকিন ডলার, আওয়ামী লীগ ২০১৩ = ১.৪২ বিলিয়ন র্মাকিন ডলার
আওয়ামী লীগ ২০১৭ = ১৩ বিলিয়ন র্মাকিন ডলার।

দেশে নানাবিধ সংকট আছে সত্যি। বেকারত্ব নিয়ে ছাত্রসমাজের ভেতরে হতাশা আছে। এটাও তো সত্য যে, শেখ হাসিনার সরকার যত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন, সেটি কি আর কোন সরকার করেছে? আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় ছিল ২১ বছর। আর বঙ্গবন্ধু তো নিজের আমল ঠিকমত শুরুই করতে পারেননি, এর আগেই বিদেশী ষড়যন্ত্রে স্থানীয় খুনিরা জাতির পিতাকে খুন করেছে। এত বছরের জঞ্জাল শেখ হাসিনা একা ১০ বছরে দূর করবেন, এটা ভাবাও অন্যায়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, লোভ আর অনিয়ম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করার আগে, আমাদের নিজেদের দিকেও তাকানো দরকার নয় কি? আমরা যদি নিজেরা নিজে থেকে না বদলাই, তাহলে একা শেখ হাসিনা আর কত করবেন?

১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি আমাদেরকে চিরতরে বিলীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এখন আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা শেখ হাসিনাকে আরও লম্বা সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দিব কি, না?  শেখ হাসিনার নিজের পাওয়ার কিছু নেই, যা পাব আর যা হারাব, সব হিসেব আমাদের নিজেদেরই। শেখ হাসিনা সব হারিয়েও আমাদের শুধু দিয়েই চলেছেন।    

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত