‘ষড়যন্ত্র করলে তাহের থাকতেন সেনাবাহিনীতে’

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ১১:০৯

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল? এর প্রেক্ষাপটে যে বিপ্লব, প্রতি বিপ্লব হয়, তার কুশীলব কারা ছিলেন? এর সুফল পেয়েছেন কে? জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ তখন কেন সরকারে আসতে পারল না? অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম কেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়লেন? দেশের ইতিহাসের গোলযোগপূর্ণ সেই সময় খুব কাছ থেকে দেখেছেন তখনকার জাসদ নেতা, এখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। দৈনিক ঢাকা টাইমসের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে ওঠে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

নভেম্বর নিয়ে বিভ্রান্তি থেকে যাচ্ছে, এর কারণ কী?

৭ নভেম্বরের ঘটনা এখনো ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে। এর একটা কারণ হচ্ছে, যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে অভ্যুত্থান হয়েছিল তা অর্জিত হয়নি। অভ্যুত্থানের নায়ক কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম বা যে রাজনৈতিক দলটি (জাসদ) সহায়তা করেছিল তারা পরাজিত হয়েছিল।

পরাজয়টা কীভাবে হয়েছে?

কর্নেল তাহেরকে জীবন দিতে হয়েছিল। ফাঁসিকাষ্ঠে তাকে হত্যা করা হয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ওপর নিপীড়ন নেমে এসেছিল। এই অভ্যুত্থানে বিজয়ী হয়েছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। শুধু বিজয়ীই নয়, তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিবিপ্লব হয়েছে। প্রতিবিপ্লবের নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী শক্তি, যাদের দক্ষিণপন্থী শক্তি বললেও কম বলা হয়। এরা খুবই প্রতিক্রিয়াশীল।

দক্ষিণপন্থী শক্তি কারা?

এরা সরাসরি যুদ্ধাপরাধী। মুক্তিযুদ্ধেও বিরোধী শক্তি। তাদেরকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সরকারে নিয়ে এসেছেন। তাদের হাতে জাতীয় পতাকা দিয়েছেন। এই শাসনটা দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। যদিও জিয়াউর রহমান নিজেও একটা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে নিহত হয়েছেন। তার রাজনীতি দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এসেছিলেন। সে সময়

রাজনৈতিক পট কি পরিবর্তন হয়েছিল?

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ এবং এরপর খালেদা জিয়া এ রাজনীতি চালিয়ে গেছেন। এই সময়ে যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো ম্লান করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে নির্বাসিত করা। এমন একটা আবহের মধ্যে ৭ নভেম্বরের যে প্রকৃত ইতিহাস এটি ঢাকা পড়ে গেল। কারা এই অভ্যুত্থান ঘটাল, তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল, সেগুলো কোনোটাই জনসম্মুখে আসতে পারেনি।

নভেম্বরের সত্য ইতিহাস আড়ালে ছিল কেন?

বলা হয়, যারা পরাজিত হয় তাদের কথা এবং তাদের সঙ্গে যে সত্য জড়িয়ে থাকে তা প্রকাশিত হতে সময় লাগে। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় লাগে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমনও ব্যাপার আছে যে, সত্য হারিয়ে যায়। কোনো সময় সেটা আত্মপ্রকাশ করে না।  কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের যে নায়ক ছিলেন কর্নেল তাহের এ বিষয়টা শেষ পর্যন্ত যে সচেতন মহলে আলোচিত হয়েছে। ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।

এরশাদের সময়ও কি জাসদ কোনো অনুকূল পরিবেশ পায়নি?

এরশাদও জিয়ার মতো রাজনীতিই চালিয়ে যায়। ওই সময় কর্নেল তাহের কিংবা জাসদ কেউ কোনো আনুকূল্য পাননি। গণমাধ্যমও ছিল তাদের দখলে। তাদের মতো করেই প্রচারিত হয়েছে।  এরপর খালেদা জিয়া ক্ষমতা এসেও একই কাজ করেছেন।

এরপর তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তখন?

১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার এলো তখন কিছুটা হলেও কর্নেল তাহের এবং ৭ নভেম্বর সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশিত হলো।  আমার মনে আছে। সেই সময় ৭ নভেম্বর বিটিভিতে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল কর্নেল তাহেরের ওপর। নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমেদ পরিচালনা করেছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার আলোর মুখ দেখল। বিচার হলো। কিন্তু জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের গভীর অনুসন্ধান হয়নি। আর কর্নেল তাহের কিংবা ৭ নভেম্বর এসব বিষয়ে সত্য প্রকাশে আওয়ামী লীগের কোনো আগ্রহই ছিল না।  এরপর তো আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলো।

আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এলে তো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল...

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দেয়। জিয়াউর রহমান এই সংশোধনী এনেছিলেন। যার মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা- থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের যে ফরমান সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করার অধিকার রদ করা হয়। এই সংশোধনী যখন অপসারিত হলো তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে।

কী সেই ঘটনা?

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চে একটা রিট করা হয়। যেখানে বলা হয়, কর্নেল তাহেরের বিচারের নামে যে ফাঁসি হয়েছে সেটা একটা হত্যাকাণ্ড। সৌভাগ্যের কথা যে, সেই রিটে মহামান্য হাইকোর্ট বিচারটি অবৈধ বলে একটা রুল ইস্যু করে।  দীর্ঘ শুনানির মধ্য দিয়ে ২০১১ সালের ২২ মার্চ রায় হলো।  রায়ে বলা হলো, কর্নেল তাহেরের ফাঁসি একটি ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। এজন্য একজনকে যদি দায়ী করা হয়, সেটা জিয়াউর রহমান।

নভেম্বর নিয়ে বিএনপির অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

৭ নভেম্বর নিয়ে বিএনপি বলে এটা বিপ্লব সংহতি দিবস আর জিয়াউর রহমান হলেন তাদের নায়ক, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে এটা ছিল তাদের একমাত্র ঘোষণা। এই মিথটা আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে শুরু করে। সাধারণ মানুষও জানতে শুরু করে, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নায়ক কর্নেল তাহের ছিলেন। জিয়াউর রহমানকে কারাগার থেকে বের করেছিলেন। জিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহেরকে হত্যা করেছিলেন।

এখনো কারা কর্নেল তাহের কিংবা জাসদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে?

এই সময়টাতে যখন ধোঁয়াশা কেটে যাচ্ছিল তখন স্বাধীনতাবিরোধীরা আবার বিপুল শক্তি নিয়ে মাঠে নামে। আমরা লক্ষ্য করি বিভিন্ন গবেষক বের হয়। যেমন এনজিও কর্মকর্তা হয়ে যায় বড় গবেষক। তারা এমন বিভ্রান্তিকর চমক সৃষ্টিকারী খবর দিতে থাকে যেমন কর্নেল তাহের নাকি বলেছেন যে, শেখ মুজিবের লাশকে আমি বঙ্গোপসাগরে ভাসাব। এগুলো সব উদ্ভট। কর্নেল তাহের তো ঘোষণা দিয়েই সেনাবাহিনী ছেড়ে দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। একটা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ক্ষমতা দখল করবে কেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সম্পূর্ণতা দান করতে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে ফিরিয়ে আনতে।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাসদের বিরোধটা কোথায় ছিল?

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটা নীতিগত বিরোধের জন্য তারা বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু তাহের কখনো ষড়যন্ত্র করেনি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল কখনো ষড়যন্ত্র করেনি। ষড়যন্ত্র করলে তাহের থাকতেন সেনাবাহিনীতে। খোদ আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে ষড়যন্ত্র হয়েছে। জাসদের ভেতরে হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে কর্নেল তাহেরের অবস্থান কী ছিল?

এখানে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, যখন বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলে এবং পরে কর্নেল তাহেরের আবার গোপন বিচার হচ্ছিল, তখন তাহের তার জবানবন্দিতে বলেছেন জাতির জনক। সে সময় তো আওয়ামী লীগের লোকজনও বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক বলে না। তিনি তো আর বেঁচেও নেই। লরেন্স লিপশুলজের বইতে বলা আছে, জেলখানার অভ্যন্তরে জবানবন্দিতে তাহের বলছেন, ‘দে হ্যাভ কিল্ড ফাদার অব দ্য নেশন’।

আওয়ামী লীগের নেতারাও তো মাঝেমধ্যে জাসদ নিয়ে কথা বলেন।

কর্নেল তাহের এবং জাসদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় আওয়ামী লীগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। যেমন শেখ সেলিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং মাহবুব-উল হক হানিফের মতো নেতারাও একই সুরে কথা বলেন। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই লোকগুলো সেই লোক যারা এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগের ভেতরেও আরেকটি শক্তি হয়ে উঠেছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। সুতরাং একটা অশুভ আঁতাত সৃষ্টি হয়ে যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে। আবার জাতীয় পার্টির নেতা, একসময় আওয়ামী লীগ করত কাজী ফিরোজ রশীদ এই লোকজনও প্রচারণায় অংশ নেয়। এতে মানুষ কিন্তু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কারণ মানুষ দেখে আওয়ামী লীগের লোকজনও এদের বিরুদ্ধে বলে। তাহলে বোধহয় সত্যতা আছে।

কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন?

কর্নেল তাহের তো রাজনীতি করছিলেন। ষড়যন্ত্র করেননি। তিনি তো ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনী ছাড়েন। তিনি চিঠির আদলে একটা পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন। যেটা বিভিন্ন জায়গায় পরে প্রকাশিত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত