সেলফি তোলে সেলফিশে!

প্রভাষ আমিন
| আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৬, ২১:১২ | প্রকাশিত : ০৬ অক্টোবর ২০১৬, ২০:৫৮

সেলফি শব্দটি পুরোনো নয়, তবে এই প্রবণতাটি পুরনো, অনেক পুরনো। সেলফি আসলে আত্মপ্রেম। বিশ্বের বড় বড় শিল্পীরা আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন। আত্মপ্রতিকৃতির ডিজিটাল ভার্সন বলা যেতে পারে আজকের সেলফি’কে। ২০১২ সালে শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ঠাঁই পেয়েছে। ‘সেলফি’কে অক্সফোর্ড অভিধানে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে ‘একটি ছবি, যা নিজেরই তোলা নিজের প্রতিকৃতি, সাধারণত স্মার্টফোন বা ওয়েব ক্যামে ধারণ করা এবং তা যে কোনো সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করা।’ অক্সফোর্ড অভিধানের সম্পাদকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে একটি অনলাইন ফোরামে প্রথম সেলফি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সেলফি বা শিল্পীদের আত্মপ্রতিকৃতিই শুধু নয়, সেলফির এই প্রবণতার উৎস হাজার বছর আগের গ্রিক পুরাণে। নার্সিসাস জলে নিজের ছায়া দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল, আমি এত সুন্দর! এ বিস্ময় তার কাটেনি। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই ফুরিয়ে যায় তার জীবন। সেই থেকে অতি আত্মমগ্ন মানুষদের নার্সিসিজমে আক্রান্ত বলা হয়। তবে সব মানুষ নিজেকে ভালোবাসে; কেউ কম, কেউ বেশি। সবার ভেতরেই বাস করে একেকজন নার্সিসাস। নিজেকে ভালোবাসে বলেই মানুষ সবকিছু করে। সবাই খ্যাতি চায়; কেউ খেলে, কেউ লিখে, কেউ অভিনয় করে, কেউ গবেষণা করে, কেউ রাজনীতি করে, কেউ মাস্তানি করে, কেউ পরোপকার করে। এসবই কিন্তু করে মানুষ নিজেকে ভালোবেসে। তবে অন্য সবকিছুর মত নিজেকে ভালোবাসার মাত্রাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো-মন্দ মিশিয়েই মানুষ। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, ইতি-নেতি আছে। বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই ভালোর ভাগ বেশি। আর ভালো বেশি বলেই সভ্যতা এগিয়েছে। মন্দ বেশি হলে পৃথিবী এতদিনে ধ্বংস হয়ে যেতো। বলছিলাম মাত্রার কথা। সবকিছুরই মাত্রা থাকে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই বিপদ। সেলফি আবিস্কারের পর মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা নার্সিসিজমটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। বিস্ময়ের সাথে দেখছি, আমরা সবাই নিজেকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। কখনো কখনো সেই আত্মপ্রেম মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, যা বিপদ ডেকে আনে। বলা ভালো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের আত্মপ্রেম মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। শঙ্কাটা এখানেই।
মোবাইল ফোনে ক্যামেরা সংযোজনের পর থেকে বিশ্বের সব মোবাইল ব্যবহারকারীই একেকজন ক্যামেরাম্যান বনে যান। স্মার্টফোনে ফ্রন্ট ক্যামেরা আসার পর আরেক দফা উল্লম্ফন ঘটে এই প্রবণতার। ফ্রন্ট ক্যামেরা সেলফি তোলার জন্য। সেলফি তোলার ধারণাটা প্রথম এসেছিল, একা কেউ ঘুরতে গেলে, যদি ছবি তোলার মত কেউ না থাকে, তখনও যাতে ভালো লাগার মুহূর্তটুকু ধরে রাখা যায়; সে জন্য। শুরু থেকেই সেলফি তোলার সুযোগ দারুণ সাড়া ফেলে। সাধারণ মানুষ সেলিব্রেটিদের কাছে পেলে সেলফি তোলার আবদার করে। কিন্তু সেলিব্রেটিরাও সুযোগ পেলে সেলফি তোলেন। আস্তে আস্তে সেলফি প্রবণতা পরিণত হয় উন্মাদনায়। এখন প্রায় সব মোবাইলেই পেছনে এবং সামনে ক্যামেরা থাকে। এমনকি কোনো কোনো মোবাইলে পেছনের ক্যামেরার চেয়ে সামনে সামনের ক্যামেরা ভালো থাকে। সামনের ক্যামেরার মূল কাজ সেলফি তোলা। শুরু থেকেই সেলফি তোলা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাও হচ্ছে। এতটাই যে এখন অনেক অনুষ্ঠানে সেলফি তোলার নিষেধাজ্ঞা থাকে। আলোচনা-সমালোচনার বাইরে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে- ঝুঁকি। সেলফি তুলতে গিয়ে অনেকেই জীবন দিয়েছেন। পাহাড়ের খাদে দাঁড়িয়ে, চলন্ত ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে, মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে, গাড়ি চালাতে চালাতে, রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে, উচু ভবনের ছাদ থেকে- কতরকম সেলফি তুলতে গিয়ে যে কত মানুষ জীবন দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কোরবানির পশু জবাই করতে গিয়ে, অপারেশন থিয়েটারে অর্ধেক অপারেশন রেখে, মুমূর্ষু মানুষের শয্যাপাশে, এমনকি কবর দিতে গিয়েও মানুষ সেলফি তোলে। সেলফি তোলার এই প্রবণতা এখন ফান থেকে অসুস্থতার পর্যায়ে চলে গেছে। মার্কিন গবেষকরা অতিরিক্ত সেলফি তোলা এবং আপলোড করাকে এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই রোগের নামও দেয়া হয়েছে- সেলফিটিস।
বিশ্বজুড়েই তরুণ-তরুণীরাই সেলফি তোলেন বেশি। সেলফি না তুললে কোনো অনুষ্ঠান-আয়োজন পূর্ণতা পায় না যেন। বাংলাদেশেও সেলফি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সেলফি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সম্প্রতি ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানকে কক্সবাজারে নামিয়ে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে একটি হেলিকপ্টার। তাতে শাহআলম নামে একজন মারা যান। পরে হেলিকপ্টারের পাইলট বলেছেন, নিহত শাহআলম হেলিকপ্টারের দরজা খুলে সেলফি তুলছিলেন, তাতে বাতাসের ভারসাম্যহীনতায় বিধ্বস্ত হয় কপ্টারটি। এর পরপরই সেলফি তোলার বিপদ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সেই সমালোচনার আগুনে ঘি ঢেলেছেন সরকারি দলের তিন নেত্রী। তারা স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খাদিজা বেগম নার্গিসকে দেখতে সেলফি তুলে তা ফেসবুকে আপলোড করেছেন। এ নিয়ে এখন দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়। নেত্রীরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষমাও চেয়েছেন। তারা ক্ষমা পাবেন কি পাবেন না, সেটা তাদের অনুসারীরা দেখবেন। তবে এটা ঠিক, এই ঘটনার পর সেলফি নিয়ে স্পর্শকাতরতা আরও বাড়বে।
শুরুতেই বলেছি, সেলফির ধারণাটা এসেছে, বিরাণভূমি, যেখানে ছবি তুলে দেয়ার মত কেউ নেই, তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। কিন্তু সেলফি দ্রুত আমাদের বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর করে তুলছে। আগে কোথাও বেড়াতে গিয়ে সাথে ছবি তোলার মত কেউ না থাকলে, আশপাশের কাউকে ছবি তুলে দেয়ার অনুরোধ করতো মানুষ। এভাবে সামাজিক যোগাযোগ বাড়তো, বন্ধু বাড়তো। কিন্তু এখন সবাই বেড়াতে যাওয়ার সময় সবাই সেলফি স্টিক নিয়ে যান। আশপাশে কে আছে, না আছে, তাকিয়ে দেখারও ফুরসত নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে মগ্ন। বিভিন্ন  অ্যাঙ্গেলে সেলফি তুলে আপলোড করতেই ব্যস্ত সবাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্রুত আমাদের অসামাজিক ও সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত করছে। মানুষ সামাজিক জীব। একসাথে মিলেমিশে থাকবে। কিন্তু এখন সময়টা এমন হয়েছে, পাশের ফ্ল্যাটের নিকট প্রতিবেশীকেই কেউ চেনে না। এই যে অসামাজিকতা, এই যে স্বার্থপরতা, এই যে আত্মমগ্নতা- এর চূড়ান্ত, কদর্য রূপ সেলফি। নার্সিসিজমের রোগের নাম সেলফিটিস।
লেখক: সাংবাদিক
৬ অক্টোবর, ২০১৬
[email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত