সোনালি ব্যাগের হতাশা

যন্ত্রপাতির অভাবে হচ্ছে না পাটের পলিথিনের বাণিজ্যির উৎপাদন। প্রচলিত পলিথিনে পরিবেশ দূষণ। আশাহত পাট পলিথিনের উদ্ভাবক

তানিয়া আক্তার
ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:১২ | প্রকাশিত : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:৪০

প্রধানমন্ত্রী নাম ঠিক করে দিয়েছেন ‘সোনালি ব্যাগ’। এই ব্যাগ দিয়েই ক্ষতিকর পলিথিনের রাজত্ব দূর করে পরিবেশ রক্ষা আর পাটের পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন- দুটিই একসঙ্গে দেখানো হয়েছিল। বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিও সই হয়েছিল। কিন্তু বাজারে আসছে না পাটের পলিথিন।

সম্ভাবনা বলে বিবেচনা হলেও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে ‘সোনালি ব্যাগ’ নামে পাটের পলিথিন বাজারে আনা যাচ্ছে না। পরীক্ষামূলক উৎপাদন চললেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার মতো সক্ষমতাই অর্জন করতে পারেনি বাওয়ানি জুট মিল।

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাট থেকে পলিথিন (জুটপলি) উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে যুক্তরাজ্যের একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। সে সময়ের পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরীর উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

সেদিন মির্জা আজম বলেন, ‘আগামী ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে পাট থেকে পলিথিন উৎপাদন শুরু হবে। প্রথম দিকে স্বাভাবিক পলিথিনের তুলনায় এই পলিথিনের ব্যাগের দাম কিছুটা বেশি হবে। তবে উৎপাদন বাড়লে দামের সমন্বয় হয়ে যাবে।’

এই ছয় মাস শেষ হয়েছে গত এপ্রিলে আর নয় মাস গেছে জুলাইয়ে। কিন্তু পাটের সোনালি অতীত ফেরাতে আসেনি সোনালি ব্যাগ। মানুষ পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগে। এখানে-সেখানে ফেলে পরিবেশে দূষণ করছে।

এই বিলম্বের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এখনো দেশে না আসা। যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা বিজিএমইএ বলছে, যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। আগামী অক্টোবর বা ডিসেম্বরের মধ্যেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া যাবে।

পাটের আঁশ থেকে পলিমার তৈরির এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা মোবারক আহমেদ খান। ২০ বছর ধরে তিনি পাটের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন। এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি তাকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক দেয়।

বিজ্ঞানী মোবারক স্পষ্টতই হতাশ। তিনি মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাব আছে। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বড় স্কেলে উৎপাদনে আসার মতো মেশিনারিজ নেই। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। কিন্তু টাকা তো নেই।’

সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার ‘সোনালি ব্যাগ’কে পরিবেশ রক্ষার এক হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। এই ব্যাগ প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের চেয়ে দেড়গুণ বেশি শক্তিশালী। প্লাস্টিক না থাকায় এটি সহজে পচনশীল। সাধারণ পলিথিন যেখানে মাটিতে মিশে যেতে চারশ বছর সময় নেয়, সেখানে সোনালি ব্যাগ চসে সারের কাজ করবে কয়েক মাসের মধ্যে।

পরিবেশবান্ধব বলে এই পলিথিনে দেশের বাজার মাতের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বপ্নও দেখা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এলে তৈরি পোশাকের মতোই অর্থনীতিকে চাঙা করবে পাটের পলিথিন। উৎপাদন শুরু না হলেও অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে সোনালি ব্যাগ আমদানির আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

এই ব্যাগে বিপুল লোকসানে ভোগা পাটকলগুলোতে প্রাণ সঞ্চারের আশাও করা হচ্ছিল। প্রাথমিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল দিনে তিন টন। আর এর ফলে পাট চাষিরাও তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে বলে আশা করা হচ্ছিল।

হতাশ মোবারক আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি তো বিজ্ঞানী। আমার কাজটি আমি করেছি এবং করে যাব। কিন্তু ২০১৭ সালের এপ্রিলেই আমাদের কাজ শেষ। এখন ২০১৯ সালও শেষের দিকে। এখনো বাজারজাতকরণের কোনো আভাস পাচ্ছি না।’

পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা রাষ্ট্রীয় পাটকল করপোরেশন বিজেএমসির। সংস্থাটির চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নাসিম খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষামূলকভাবে দিনে এক লাখ ব্যাগ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। সব মেশিন এখনো এসে পৌঁছেনি। বন্দর থেকে খালাস হবে কয়েকটি।’

‘এছাড়া বিদেশ থেকে যে মেশিনগুলো অর্ডার করা হয়েছে সেগুলোও কিছু বাকি আছে। এখনো আমদানির নির্ধারিত সময় আছে। তবে আর্থিক কোনো সমস্যা নেই আমাদের। সোনালি ব্যাগ বাজারজাতকরণে যতটা আর্থিক সহায়তা সম্ভব আমরা সেই টাকা ম্যানেজ করতে পারব। শুধু প্রক্রিয়া অনুযায়ী যতটুকু সময় লাগা দরকার সেই সময়টাই লাগছে আমাদের।’

কবে আসবে এই ব্যাগ- এমন প্রশ্নে বিজেএমসি প্রধান বলেন, ‘সব ঠিক থাকলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই লোকাল মার্কেটে নিয়ে আসব। বিশেষ করে মেগাশপগুলো আগ্রহ দেখিয়েছে। উৎপাদিত সোনালি ব্যাগের আকার, দাম, গুণগত মান সম্পর্কে জনগণের প্রতিক্রিয়া শুনব তখন। বিভিন্ন অ্যাম্বাসি থেকেও সাড়া পাচ্ছি। তবে লোকাল ফিডব্যাকগুলো জেনে তারপর আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

তবে মোবাবক আহমেদ খান বলেন, ‘মেশিনারিজগুলো পুরোপুরি আমাদানি করা হয়নি এখনও। খ- খ- অংশ আসছে। আরও কিছু মেশিন বন্দরে আটকে আছে।’

বাজারজাতকরণের ইচ্ছাটাও কম বলে মনে করেন মোবারক। বলেন, ‘অর্থের অভাব তো রয়েছেই তবে ইচ্ছের অভাবটাও রয়েছে।’

বিজেএমসি প্রধান বলেন, ‘আমরা বেশ আশাবাদী। অর্থ বা ইচ্ছে, কোনোটারই অভাব নেই আমাদের। ম্যানেজারিয়াল লেভেলের কাজগুলো গুরুত্ব দিয়ে করে যাচ্ছি। এখানে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’

রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প পরিমাণে তৈরি হচ্ছে এই ব্যাগ। প্রকল্প প্রধান নাছিমুল ইসলাম বলেছেন, ‘মূল মেশিন প্রস্তুত আছে। শুধু সাপোর্টিভ মেশিনগুলো বাকি রয়েছে। প্রয়োজন মাফিক মেশিনগুলো আমদানির অর্ডারের মধ্যে আট থেকে নয়টা এসেছে। এখনো আসছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আশা করছি চলে আসবে।’

‘সোনালি ব্যাগ’ বাজারে আসার প্রতিদিনের বিলম্ব ক্ষতির কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’ এর এক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকায় প্রতিদিন এক কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ জমা হয়। সারা দেশের হিসাব কষলে এটি আরো অনেক বেশি। আর এই পলিথিন ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট স্থানে জমার বদলে ফেলা হয় এখানে সেখানে। নগরীর পয়োনিষ্কাষণের নালা আর খালগুলো ভরে উঠছে এই পলিথিনে। বুড়িগঙ্গার তলদেশেও জমেছে কয়েক ফুট পুরো পলিথিনের আস্তরণ।

ঢাকাটাইমস/০৭সেপ্টেম্বর/টিএএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :