বাজার তদারকে গোয়েন্দা ইউনিটের প্রস্তাব করব: মফিজুল

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২৮ | প্রকাশিত : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৫

একচেটিয়া কারবার কিংবা কারসাজির কারণে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার প্রায়ই অস্থির হয়ে ওঠে। তাতে বিপদে পড়ে ক্রেতাসাধারণ। আর বিড়ম্বিত হয় সরকার ও কর্তৃপক্ষ। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে বছর তিনেক আগে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ গঠন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন হলেন সাবেক বাণিজ্য সচিব (সিনিয়র সচিব) মফিজুল ইসলাম।

পেঁয়াজের বাজার বেশ কয়েক মাস ধরে অস্থিতিশীল। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ রাখতে ও সার্বিকভাবে কমিশন কী কাজ করছে? এ বিষয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন,  প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করতে বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের কথা ভাবছেন তারা। এই গোয়েন্দা ইউনিট বাজার মনিটরিং করবে। দেখবে বাজারের কোথাও অসুস্থ প্রতিযোগিতা হচ্ছে কি না। ব্যবসায় মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা, যোগসাজশ, জোটবদ্ধতা বন্ধ করাই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ বলে জানান সিনিয়র এই সচিব।

ঢাকা টাইমস: বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ে যাতে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সে রকম একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিযোগিতা কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানি। প্রতিষ্ঠার তিন বছরে এই প্রতিষ্ঠান কী কী কাজ করেছে?

মো. মফিজুল ইসলাম: বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন একটি নতুন প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে ২০১৬ সালে। প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ দেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজারসংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা। প্রতিযোগিতা আইনের উদ্দেশ্য হলো বাজারে অনৈতিক মুনাফার লোভে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকা- প্রতিরোধ করা। আমরা আইনের অধীনে কাজ করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে কিছু অভিযোগের ওপর রায় হয়েছে, যা জনস্বার্থে খুব প্রয়োজন ছিল। আমরা প্রথমত ক্রেতা-বিক্রেতাকে সচেতন করতে চাই। সেই সঙ্গে বলতে চাই কেউ যদি প্রতিযোগিতা আইনের পরিপন্থি কোনো কাজ করেন তবে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।

যদিও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কিছু থাকে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যবসায় মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা, যোগসাজেশ, জোটবদ্ধতা, কার্টেল এবং ডমিনেন্ট পজিশনকে অপব্যবহারের করার চর্চা আমরা লক্ষ করি। এটি বন্ধ করাই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ। নতুন হিসেবে আমরা এখনো লার্নিং স্টেজে আছি। সারা বিশ্বের বেস্ট যে প্রাকটিসটা সেটা অনুসরণ করার চেষ্টা করছি।

ঢাকা টাইমস: পেঁয়াজের বাজার বেশ কয়েক মাস ধরে অস্থিতিশীল। এ ব্যাপারে আপনারা কী কাজ করছেন?

মো. মফিজুল ইসলাম: দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ কিছু কাজ আমরা হাতে নিয়েছি। বর্তমানে পেঁয়াজের বাজার লাগামহীন। আমরা পেঁয়াজ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চেয়েছি তারা কত দামে পেঁয়াজ কেনেন ও কত দামে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করেন। তবে জনবল সংকটের কারণে আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না।

ঢাকা টাইমস: আপনি দায়িত্ব নেয়ার পরপরই বাজারে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। আপনার কী মনে হয়, এই সংকটের কারণ কী?

মো. মফিজুল ইসলাম: মূলত সাপ্লাই চেইন ডিসরাপশনের কারণে পেঁয়াজে এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের পেঁয়াজের বাজার ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করে। ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা পরই কিন্তু বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া শুরু করল। তবে আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি ঘোষণার পরপরই দামটা হুট করে বেড়ে গেল। এটা বোধহয় অনাকাক্সিক্ষত ছিল। কারণ তখন আমাদের জানামতে প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন  পেঁয়াজ দেশে মজুদ ছিল। যেগুলোর মূল্য ২৫-৩০ টাকার ওপরে ছিল না। তখন ক্রেতা এই দামে পেঁয়াজ পেতে পারত। এ  পেঁয়াজ দিয়ে অন্তত ৫০-৬০ দিন আমরা চলতে পারতাম। দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগটা নিতে পারে।

ঢাকা টাইমস: বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতার কথা কী মনে করেন?

মো. মফিজুল ইসলাম: এখনো আমাদের নিজস্ব জনবল কিন্তু একজনও নেই। এখানে ১০-১২ জন অফিসার আছেন যারা প্রেষণে কাজ করছেন। তবে আমি নিয়োগপ্রাপ্ত। অন্যান্য স্টাফ আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে। ৩০-৩৪ জনের জনবল নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাদের নিয়োগ হয়ে গেলে আমাদের নিজস্ব জনবল হবে। ভবিষ্যতে হয়তো কাজের ধরন অনুযায়ী আমাদের আরও জনবলের প্রয়োজন হবে। একটা গোয়েন্দা ইউনিট হয়তো প্রয়োজন হবে, সেভাবে আমরা জনবল নিয়োগ করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া কমিশনের জন্য চারজন সদস্য প্রয়োজন। সেখানেও আমাদের শর্ট আছে। যখনই আমরা এসব পেয়ে যাব, আমরা ফুল সুইয়িংয়ে কাজ করতে পারব।

ঢাকা টাইমস: প্রতিযোগিতা কমিশনের মাধ্যমে একজন ক্রেতা কিংবা ভোক্তা কী কী সুবিধা পেতে পারে?

মো. মফিজুল ইসলাম: আমরা সাধারণত ক্রেতার স্বার্থ আদায়ে কাজ করি। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা থাকলে পণ্যের দাম ও মান ঠিক থাকবে। এতে ক্রেতা পরোক্ষভাবে লাভবান হবে। আমাদের কাজ হলো বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। একচেটিয়া ব্যবসা ও যোগসাজশ করে কেউ যাতে ব্যবসা না করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। করে আমরা যদি বাজার স্থিতিশীল করতে পারি, তাহরে ক্রেতাদের একটি আস্থার জায়গা তৈরি হবে।

ঢাকা টাইমস: বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের কাছে মার্কেটের ফুল এসেসমেন্টটা ছিল না। প্রতিযোগিতা কমিশন যে ভূমিকা রাখতে পারত সেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আপনার চ্যালেঞ্জটা কী?

মো. মফিজুল ইসলাম: সরকার কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ করে না। বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে সেদিকে খেয়াল রাখে। যেমন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে। আর ব্যবসায়ীরা যাতে জোটবদ্ধতা না করতে পারে সেদিকে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন কাজ করে। তো এখানে কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারকে এককভাবে দায়ী করা বোধহয় ঠিক হবে না। বিষয়টি খুবই স্পষ্ট- পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য। এটা রাতারাতি তৈরি করা যায় না। রাতারাতি আনাও যায় না কোথা থেকে।

পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করল ভারত। এই সাপ্লাই চেনটার যখন ডিজরাপশন হলো তখনই পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেল। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে তাদের সহযোগিতার কথা বলল। ফলে কিছু কিছু ব্যবসায়ী ব্যক্তিগতভাবে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছে। আবার সরকার কিন্তু নিম্ন আয়ের লোকজনের মধ্যে স্বল্পদামে টিসিবির প্রতিদিন মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। সরকারের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই।

ঢাকা টাইমস: প্রভাবশালী গোষ্ঠী যারা এককভাবে কোণো পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে, প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিবে?

মো. মফিজুল ইসলাম: সরকারের চেয়ে কোনো গ্রুপ শক্তিশালী নয়। আইন অনুযায়ী কাজ হবে। আমাদের নিজস্ব আইন রয়েছে, সেই যে হোক না কেন আমরা আমাদের আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিব। আমার কোন গ্রুপ বা দলের কাছে নতি স্বীকার করবো না।

ঢাকা টাইমস: বাজারের একচেটিয়া কারবার বন্ধে আপনার পরামর্শ কী?

মো. মফিজুল ইসলাম: প্রথমেই বলব, আমাদের নৈতিকতার জায়গা তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই লাভ করবে কিন্তু সেটা যেন অস্বাভাবিক না হয়। মানুষকে কষ্ট দিয়ে যেন মুনাফা না করে এইটা আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। সরকার ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সাহায্য করছে। পেঁয়াজ আমদানিতে ট্যাক্স ফ্রি করেছে সরকার।

ঢাকা টাইমস: তিন বছরে প্রতিযোগিতা কমিশনের অর্জন কী?

মো. মফিজুল ইসলাম: প্রতিযোগিতা কমিশন বাজারকে স্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে। এক বছর আগে আমরা বিআইডিএসকে দিয়ে পেঁয়াজ ও চালের ওপর স্টাডি করাতে পারি। তার মানে বলা যায়, আমরা অনেক আগে থেকেই বাজার পর্যবেক্ষণ করছি। সেখানে বিআইডিএস আমাদের কিছু রিকমেন্ডেশন দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যারা যারা কনসার্ন, যেমন বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংস্থা, তাদের পাঠিয়েছি।

ঢাকা টাইমস: প্রতিযোগিতা কমিশনের জন্য গোয়েন্দা বিভাগ করা হবে বলেছেন। এটা নিয়ে একটু বিস্তারিত বলুন।

মো. মফিজুল ইসলাম: বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করতে কাজ করবে বিশেষ এই গোয়েন্দা ইউনিট। মূলত এই ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বাজার মনিটরিং করবে। বাজারে পণ্যের দাম তারা টাইম টু টাইম মনিটরিং করবে। তারা দেখবে বাজারের কোথাও অসুস্থ প্রতিযোগিতা হচ্ছে কি না। প্রতিযোগিতা আইন কেউ অমান্য করছে কি না সেটা তারা সরেজমিনে গিয়ে দেখবে। আমরা যে প্রবিধান তৈরি করছি সেটাতে তারা কীভাবে কাজ করতে পারে তা উল্লেখ থাকবে।

এ ক্ষেত্রে হয়তো আইনের সংশোধন হবে না, তবে তারা কীভাবে কাজ করবে তা হয়তো প্রবিধানে উল্লেখ করা থাকবে। এটা এখনো আমার চিন্তার মধ্যে রয়েছে। আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠাব। সরকার যদি অনুমতি দেয় তারপর হয়তো আমরা এটা নিয়ে কাজ করতে করব।

ঢাকা টাইমস: আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. মফিজুল ইসলাম: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :