মোবাইল মগ্নতায় লাখ টাকা খোয়া!

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭:১৩ | প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:৫১

আজমেরী গ্লোরী বাসটি যাবে সদরঘাট। ভদ্রলোক আমার সামনের সিটে বসেছেন। জানালার পাশে। বেশভূষায় চাকচিক্য নেই। শীতের কারণে গায়ে জড়িয়েছেন কালো কোট। তাও ধুলো-ময়লায় ধূসর। গাত্রবরণ কালো। কেশগুলোও পিছু হটেছে। তাই কপালটা বড়ো। কিন্তু তার ভাগ্যে যা ঘটলো তা বড় কপালের সঙ্গে প্রকৃতির প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। জোয়ার সাহারা থেকে উঠেছি। কিছুসময় রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার সামনে। সিট পাইনি তখনো। তখন থেকেই দেখছি তিনি মুঠোফোনের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন। নাটক দেখছেন। কানে হেডফোন।

বাসটি স্টাফ রোড পার হলে একটা সিট মিললো। বসলাম তার পেছনে। তখনো তিনি মগ্ন মুঠোফোনে। বনানীতে ভিড় ঠেলে নামলেন কয়েকজন যাত্রী। উঠলেন তারও বেশি। একজন এসে মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত লোকটির ডান পাশে ফাঁকা সিটে বসলেন। একটা সময় দেখলাম পাশে বসা ওই লোকটি মুঠোফোন হাতের ব্যক্তির মাথার খুব কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে আছেন। খেয়াল করলাম, তিনিও ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে নাটকের দর্শক হয়েছেন। নাবিস্কো, তিব্বত পার হয়ে বাসটি র‌্যাংগস টাওয়ার ভেঙে গড়া উড়াল সেতুর মুখে এসে থামলো। ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। ঠেলেঠুলে কিছু যাত্রী নেমে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সামনের সিটের ডান পাশে বসা লোকটি, যিনি বনানী থেকে উঠেছিলেন তিনিও নেমে যাচ্ছেন। আর তখনই জানালার ধারে বসা যাত্রীটি খানিক উচ্চৈঃস্বরে উদ্দেশহীন বলতে লাগলেন, ‘এই ভাই লোকটাকে ধরেন! এই লোকটাকে ধরেন! ধরেন না লোকটাকে...’। নামা-ওঠায় ব্যস্ত যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বাস থেকে নেমে গেলেন।

সবার মতো আমিও তাকিয়ে আছি। কোন লোকটার কথা বলছেন? বুঝতে পারছি না। কেন বলছেন, তাও না। এবার উদ্বিগ্ন লোকটি জানালা গলিয়ে হাত বের করে একজন লোককে দেখালেন। ‘এই যে এই লোকটাই। ধরেন তো ভাই, ধরেন।’ না, এবারও কোনো কাজ হলো না। কেউ এগিয়ে এলো না। তিনি যাকে দেখাচ্ছিলেন তিনি দেখতে শুনতে ভদ্রবেশ। উঁচু-লম্বা। রুচিশীল পোশাক গায়ে। ‘কিছুই হয়নি’ ভাব করে তিনি হন হন করে হেঁটে গেলেন। এবং নির্বিঘ্নে পথ পার হয়ে ওপাশে চলে গেলেন। বাসটিও আস্তে আস্তে চলছে তখন।

এবার বাসের লোকজন জানতে চাইলো, ‘কী হয়েছে ভাই?’

‘আরে ভাই টাকা নিয়া গেছে।’ ভদ্রলোক জবাব দিলেন।

একযাত্রী বললেন, ‘টাকা নিয়ে গেছে মানে? কত টাকা নিছে?’

ভদ্রলোক একটা আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন।

‘এক হাজার?’

‘আরে না ভাই। এক লাখ।’

কাছাকাছি বসা শ্বেতশুভ্র দাড়িমুখের বয়স্কযাত্রী বললেন, ‘বলেন কী? নিলো কীভাবে? রেখেছিলেন কোথায়?’

ভদ্রলোক এবার নিজের কোটের ডানপাশটি উল্টে দেখালেন। ‘এই যে এই খানে। কাইটা নিছে।’

দেখলাম কোটের আস্তিনে ডানপাশের পকেটের নিচে এলোপাতাড়ি কাটা। টাকাটা ওখান থেকেই বের করেছে।

বললাম, ‘আপনার সঙ্গে তো ব্যাগ আছে দেখছি। টাকা পকেটে রাখলেন কেনো?’

‘আরে ভাই ভয়ে রাখছি। ব্যাগে রাখলে পুলিশে চেক করে। বলে এতটাকা কই পাইলি?’ ভদ্রলোক বললেন।

এক যাত্রী বললেন, ‘ওই লোকটা জানলো কীভাবে এখানে টাকা রাখছেন?’

‘হয়তো গায়ে বাড়ি লাগছে। বান্ডিল তো। তখন বুঝছে।’

বয়স্ক ব্যক্তিটি গলা কিছুটা কঠিন করে বললেন, ‘আপনি উঠেছেন কোত্থেকে?’

‘টঙ্গী থেকে।’

‘সেই তখন থেকে দেখতেছি, মোবাইল নিয়ে আছেন। একটা লোক আপনার পাশে বসে পকেট কাটলো আপনি বুঝলেন না? এত মগ্ন থাকলেন?’

ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বললেন, ‘লাখ লাখ টাকা নিয়া চলাফেরা করি চাচা। কোনো সময় তো এমন হয় না।’

‘কী করেন আপনি?’

‘ব্যবসা করি, পূবাইলে। মোবাইল এক্সেসরিজের। মাল কিনতে গুলিস্তান যাইতেছিলাম।’

আরেকজন বললেন, ‘আপনে তো শুধু বলছিলেন লোকটাকে ধরেন। টাকার কথা তো বলেন নি। আর আপনি বসে থাকলেন কেনো? পেছন পেছন যেতে পারলেন না?’

‘ভাই, পারলে তো যাইতাম। এত ভিড়। তার ওপর আমার পা ভাঙা। অপারেশন হইছে। জোরে হাঁটতে পারি না।’ লোকটি কাতর গলায় জবাব দিলেন।

বাসের যাত্রীরা এতক্ষণ তার মুঠোফোন মগ্নতা নিয়ে যতটা ক্ষুব্ধ ছিল, তা হিম হয়ে এলো। নিরুপায় লোকটির দিকে তাকিয়ে কেউ বললেন, ‘কী আর করবেন ভাগ্যে ছিল।’ কেউ বললেন, ‘আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। কী করবেন এখন।’ কেউ আবার সান্ত¦নার ভঙ্গিতে বললেন, ‘টাকা তো মানুষই কামায়। মনে করেন ব্যবসায় লোকসান হইছে।’

ভদ্রলোকের চোখ তখন টলটল করছে। তিনি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদছেন। তার চোখের পানির ফোঁটায় ফোঁটায় মুঠোফোনের স্ক্রিনটি ঘোলা হয়ে আসছে।

......................... ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :