শিশু-কিশোরদের বুলিং ঠেকাবেন কীভাবে?

ঢাকাটাইমস ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ২৯ মে ২০২০, ১২:০৫

নয় বছরের শিশুটির দুই চোখ থেকে গাল বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। সে বলছে, সে মরে যেতে চায়। কেউ যেন তাকে মেরে ফেলে। কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার ওই শিশুটির ভিডিও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। বামন শিশুটি তার সহপাঠীর ‘বুলিং’ বা উৎপীড়নের শিকার বলে জানান তার মা।

দেশে দেশে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। শিশু-কিশোরদের ঠিকভাবে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা অর্জনের পথে বুলিংয়ের মতো ঘটনা এখন গোটা বিশ্বেই চিন্তার কারণ। সাধারণত ১২-১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বুলিংয়ের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

সহপাঠী কিংবা সমবয়সী কাউকে শারীরিক-মানসিক উৎপীড়ন বা হয়রানি, অর্থাৎ ‘বুলিং’ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারও গায়ে হাত দেওয়া, ধাক্কা মারা, লাথি মারা, ফেলে দেওয়া ইত্যাদি শারীরিক উৎপীড়নের উদাহরণ। আর খারাপ কথা বলা, ভয় দেখানো, কটাক্ষ করা ইত্যাদি মৌখিক মানসিক উৎপীড়নের মধ্যে পড়ে।

আবেগীয় উৎপীড়নও শিশু-কিশোরদের ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। কারও সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া, সহপাঠীদের সঙ্গে মেশার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ এই আবেগীয় উৎপীড়নকে বলে ‘রিলেশন্যাল বুলিং’। বর্তমানে আরও এক ধরনের ‘বুলিং’ দেখা যাচ্ছে, যার নাম ‘সাইবার বুলিং’। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ব্যবহার করে চলে ভয় দেখানো, হেয় প্রতিপন্ন করা বা মানসিক নির্যাতন।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ছাত্রছাত্রীদের ১০-২৫ শতাংশ কখনো না কখনো ‘বুলিং’-এর শিকার হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা গেলেও মেয়েদের মধ্যেও তা বিরল নয়। কিশোরদের ক্ষেত্রে শারীরিক এবং কিশোরীদের ক্ষেত্রে মৌখিক উৎপীড়নের ঘটনা বেশি ঘটে।

কারা এই জাতীয় অত্যাচারের শিকার হয়

সাধারণত শারীরিক বা মানসিকভাবে দুর্বলেরাই হয়রানির শিকার হয়। শারীরিকভাবে দুর্বল বা রুগ্ণ; অতিরিক্ত মোটা, বেঁটে; যারা কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, অন্যদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না, বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা কম, জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি কারণে ক্লাসে সংখ্যালঘু, তারাই সাধারণত এই ধরনের অত্যাচারের শিকার হয়।

বুলিংয়ের প্রভাব

বুলিং-এর ফলে স্কুল না যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমতে থাকে। এর সঙ্গে খিদে ও ঘুমের সমস্যা, মানসিক অবসাদ ও উদ্বিগ্নতার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তীব্র মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি, শারীরিক সমস্যাও, যার মধ্যে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা অন্যতম, দেখা দিতে পারে।

কারা বুলিং করে

বুলিং যারা করে, অনেক ক্ষেত্রেই এদের মধ্যে ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা থাকে। বিশেষ করে ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার’ (প্রধান লক্ষণ মনোযোগের অভাব, অতি চঞ্চলতা ও হঠকারী আচরণ), ‘কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার’ (প্রধান লক্ষণ অসামাজিক আচরণ, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা, আচরণে ঔদ্ধত্য, জীবজন্তু বা অন্য কোনো মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন ও ক্ষতি করার প্রবণতা, মিথ্যা কথা বলা, স্কুল থেকে পালানো, চুরি করা ইত্যাদি) রোগে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের মধ্যে অত্যাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি দেখা যায়। আবার, ক্লাসে জনপ্রিয় হওয়ার লোভেও অনেক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর প্রবণতা দেখা যায়।

বিভিন্ন সিরিয়াল, সিনেমা বা ভিডিও গেমে দেখানো উৎপীড়ন বা ওই জাতীয় কোনো দৃশ্য শিশু-কিশোর মনে প্রভাব ফেলে, যা তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। বাবা-মায়ের কড়া শাসন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, পারিবারিক অস্থিরতা, পরিবারের কোনো সদস্যের নেশা করার প্রবণতা ইত্যাদিও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই জাতীয় প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

কীভাবে রোধ হবে বোলিং

বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শিশু-কিশোররা বাবা-মাকে নিপীড়নের বিষয়ে বলতেও পারে না। এতে সমস্যা আরও বাড়ে। বাবা-মা বাচ্চার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশলে এমন ঘটনার আঁচ পাওয়া অনেক সহজ হয়। তাই সতর্ক থাকা দরকার। হঠাৎ করে বাচ্চার পরীক্ষার ফল খারাপ হতে থাকলে, খিদে ও ঘুম কমে গেলে, স্কুলে যেতে না চাইলে, শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ খোঁজখবর নিন। নিয়মিত স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ জরুরি।

তবে মূল পদক্ষেপ প্রয়োজন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তরফেই। বন্ধুর সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়, তা বাচ্চাকে শেখানো ও বন্ধুত্ব স্থাপনে উৎসাহিত করার দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। শিক্ষক-ছাত্রদের সুসম্পর্ক, ক্লাস ও খেলার মাঠে উপযুক্ত নজরদারি এই জাতীয় ঘটনা কমাতে পারে। এ ছাড়া, ‘বুলিং’-এ জড়িত ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কমাতে পারে।

এ ছাড়া মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের উপযুক্ত ব্যবহারে উসাহিত, অতিরিক্ত ব্যবহারে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবতে পারেন অভিবাবকরা।

আর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ‘বুলিং’ সম্বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এই ক্ষতিকর প্রবণতাটি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

(ঢাকাটাইমস/২৯মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :