পাপ বাপকেও ছাড়ে না!

অ্যাডভোকেট আবু তালেব
| আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২০, ০৮:২৬ | প্রকাশিত : ১৪ জুলাই ২০২০, ২২:৪০

মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। আমার জানামতে তিনি ১৯৯৮ সনে এসএসসি পাস করেছেন। সাতক্ষীরা জেলা স্কুল হতে। পরে আর লেখাপড়া করেছেন তার তথ্য পাওয়া যায় না। ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৯৮ সনে একাই। পরে সপরিবারে। সাতক্ষীরার সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে। আজ তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। অসংখ্য কোম্পানির চেয়ারম্যান। চলেন গ্রুপ বডিগার্ড নিয়ে, ব্যবহার করেন ফ্ল্যাগ গাড়ি। বাড়ি আছে আমেরিকাতেও। তার স্ত্রী সেখানেই ছিলেন।

বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি হতে শুরু করে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যাদের ওপর তাদের মধ্যে উপর সারির প্রায় সকলের সাথেই তার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তোলা ছবি আছে। ছবি আছে বর্তমানে বাস্তবের বিরোধী দলীয় নেতাদের সাথেও। ঠিক তেমনি আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপরের সকলের সাথে ছবি। এগুলো সাহেদ নিজেই বিভিন্ন মিডিয়াতে আপলোড করেছেন যা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রং ছড়াচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যমে শুনলাম যে, তিনি একটি মিডিয়াতে চাকরি করার মাধ্যমে তার প্রফেশন শুরু করেন। সাথে সাথে ভাবলাম যে বাপ-দাদার কিংবা মামা-খালুর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা কিংবা টিভি চ্যানেল না থাকলে একজন এসএসসি পাস করা লোক কী পদে চাকরি করতে পারেন!

তারপরে আবার টেলিভিশনের টকশোর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। চ্যানেল আই'তে জিল্লুর রহমান পরিচালিত তৃতীয় মাত্রায়ও তার সরব উপস্থিতি ছিল। যতগুলো টিভি চ্যানেলের টকশোতে আসতেন সেই টিভির স্ক্রলে লেখা থাকত ‘সদস্য, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে র‌্যাব দেশের করোনাকালীন এ ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে যারা প্রতারণা করছে তাদের মুখোশ উন্মোচনে সাহসী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আর তাদের পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন নিশ্চয়ই। এজন্য আমরা তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ।

করোনার টেস্ট করা নিয়ে সাহেদের প্রতারণার বিষয়ে যখন তথ্য বেরিয়ে এলো, তার বিরুদ্ধে মামলা হলো ঠিক তখনই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হলো, যে সাহেদ আওয়ামী লীগের কেউ নন। তিনি আওয়ামী লীগ কিংবা এর অঙ্গ সংগঠনের কোনো কমিটিতে কখনো ছিলেন না।

প্রশ্ন জাগে তাহলে বছরের পর বছর জনসাধারণের নিকটে টেলিভিশন মিডিয়াতে যখন তিনি তার এরকম দলীয় পরিচয় দিয়ে বেড়াতেন তখন কেন দল হতে তার পদ ও পদবী ব্যবহারকে অস্বীকার করে এরকম বক্তব্য দেওয়া হলো না? নাকি তখন সংশ্লিষ্ট কারো চোখে পড়েনি, না এখন ধরা পড়েছে বিধায় আওয়ামী লীগের কেউ নন হয়ে গেছেন সাহেদ?

প্রায় সকল প্রথম সারির রাজনৈতিক দলেই দেখা যাচ্ছে যে কেউ একজন অপরাধ করে ধরা খেলে তাকে দল হতে বহিষ্কার করা হয়। আর বলা হয় যে তিনি দলের কেউ নন কিংবা তার অপকর্মের দায় দল নেবে না। ঠিক আছে। কিন্তু বছরের পর বছর এরকম অপরাধ করে যাওয়া ব্যক্তিটিকে দল বিক্রি করে খাওয়ার সময় ধরা যায় না কেন? বহিষ্কার করা হয় না কেন? এর মূল কারণ এটা একটা চেইন। উপর হতে সবার মাঝে বিতরণ হয়। তাই জনগণ এখন বুঝতে শুরু করেছেন। সবার চোখে ধূলো দেওয়া কি এত সহজ? আমি মনে করি যে জনসাধারণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করলেও দু-একবার বানানো যায় কিন্তু সব সময় নয়।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারে দেখলাম যে রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করার সময় সাহেদ তাকে ফোন দিয়েছিলেন। আমার প্রশ্ন হলো দেশের কতজন মানুষ এরকম অন্যায় কাজ করার পরে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে ফোন দেওয়ার সাহস পান বা সুযোগ পান? তাহলে বোঝা যায় যে সাহেদ কিংবা জি কে শামীমদের খুটির জোড় খুবই মজবুত।

আমার মতো অল্প চিন্তার মানুষ হয়তো ভেবেও পাবেন না যে সাহেদ অভিযান চলার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিলেন এবং তার স্ত্রীর স্বীকৃত মতে তারসাথে সর্বশেষ ৬ জুলাই মোবাইল ফোনে কথা হলো। তিনি এখনো কীভাবে আইনের হাতে ধরা পড়লেন না? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে একঘণ্টার মধ্যে তাকে ধরা সম্ভব। তিনি এমন কি ভি.ভি.আই.পি কিংবা মাফিয়া ডন যে তাকে ধরতে এখনো সবাই আদা জল খেয়ে বেড়াচ্ছেন।

সাহেদের সমবয়সীদের মধ্য হতে যারা বিসিএস (প্রশাসন) হয়েছেন তারা এখনো যুগ্মসচিবও হতে পারেননি। আর সাহেদ সচিবদেরও হাতের তুরুখে নাচিয়েছেন। বর্তমান ডিজি হেলথ ডা. আবুল কালাম আজাদ করোনা টেস্টের জন্য সাহেদের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তির পূর্ব শর্ত এটা হওয়া কি উচিত ছিল না যে তার হাসপাতালের লাইসেন্স থাকতেই হবে? আইনের চোখে এই চুক্তি কোন চুক্তি হতে পারে না। এটা জালিয়াতি ছাড়া কিছু নয়। এই জালিয়াতির দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সকলের। তাদের বিরুদ্ধে একই মামলা হওয়া বাঞ্চনীয়-যা সাহেদের বিরুদ্ধে হয়েছে ও হবে।

একটু দেশের বাহিরের প্রসঙ্গে বলি। নিউজিল্যান্ডকে করোনামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে মানুষ সি-বিচে যাওয়া শুরু করে দিলো। ফলে সেখানে নতুন একজন করোনা রোগী ধরা পড়ার কারণে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জেরার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফলাফল তার পদত্যাগ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পদত্যাগের কোনো চর্চা নেই। তবে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ভিন্ন ও অজ্ঞাত কারণে পদত্যাগ করেছিলেন।

আমাদের দেশে যখন একটা ঘটনা উন্মোচিত হয় তখন আমরা সবাই সেটা নিয়েই থাকি। এক ঘটনা অন্য ঘটনাকে কবর দেয়। তখন তদন্ত বলেন আর আগের ঘটনার অন্তরালে কারা আছেন তা অকালে হারায়। পাপিয়ার কেসের অগ্রগতি কিংবা বুয়েটের আবরার হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থার খবর আমরা কেউ জানি কি? না মিডিয়া, না আমরা নাগরিকরা কেউ জানি না।

দেখলাম, দুদকের সচিব মহোদয় বলেছেন যে সাহেদের বিষয়ে তারা তদন্ত করবেন। প্রশ্ন হলো এখন কেন-এর আগে তারা কি ঘুমিয়ে ছিলেন? সাহেদ কে, কীভাবে এত টাকার মালিক হলেন, এম.এল.এম ব্যবসার নামে কাদেরকে নিঃস্ব করেছেন-তার খবর কি দুদক জানত না? যদি উত্তর না হয়, তাহলে বুঝতে হবে-এ প্রতিষ্ঠান একেবারেই ব্যর্থ। থাকা আর না থাকা সবই সমান। সাহেদের বিরুদ্ধে এর আগেই ৩২টি মামলা ছিল। দেশের সাধারণ নাগরিককে ঠকানোর মামলা।

পুলিশ প্রশাসন নাকি তার বিষয়ে ২০১৬ সনের আগেই বিভিন্ন জায়গায় তথ্য দিয়েছিল যে তিনি একজন প্রতারক। আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই পুলিশই আবার তাকে ভি.আই.পি'র মর্যাদা দিয়ে 'সাজেক' ভ্রমণে সহায়তা করেছেন। সব সম্ভবের দেশ-আমার সোনার বাংলাদেশ।

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন যে সাহেদ ধরা পড়লেই বা কি! সম্রাট কিংবা জি. কে শামীম যেভাবে চিকিৎসার নামে বি.এস.এম.এম. ইউ হাসপাতালের কেবিনে আছেন, ঠিক তেমনি যে কোন একটি রোগ দেখিয়ে তিনিও একটা কেবিন ভাড়া করে কিংবা রাষ্ট্রের টাকায় সেখানে আরামসে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটাবেন।

সক্রেটিস বলেছেন যে ‘যার টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত। আর যার টাকা নেই তার কাছে আইন মাকড়সার জালের মত’। অর্থাৎ টাকাওয়ালাকে আইন আটকাতে পারে না, অর্থহীনরা আইন নামক মাকড়সার জালে আটকা পড়েন।

আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এই যে যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন। দেশের জনগণ আল্লাহর উপর সর্বশেষ ভরসাটা ঠিকই রাখেন। আর আল্লাহ কাউকে একেবারে ছেড়ে দেন না, শুধু ছাড় দেন মাত্র। বিচার করার জন্য সময় নেন। আজ কিংবা কাল-বিচার হয়ই। দুনিয়াতেও হয়, পরকালেও হবে। মৃত্যুর সাথে সাথেই শুরু হবে। আমরা কেউ পালাতে পারবো। তাই আমরা লোভ করি, ঠিক আছে কিন্তু অনৈতিক লোভ নয়। কারণ তাতে পাপ হয়, পাপ সর্বশেষ বাপ অর্থাৎ রাঘব বোয়ালকেও ছাড়ে না। আর পাপে মৃত্যু অনিবার্য।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :