বাংলাদেশি সুকুমার মৃধা কীভাবে ভারতে বিপুল সম্পদ কিনলেন?

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ১৯:১৫ | প্রকাশিত : ১৪ মে ২০২২, ১৮:৫১
পিকের আইনজীবী সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা

কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচারে অভিযুক্ত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের খবরে আবারও আলোচনায় এসেছে সম্পদ দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর আইনজীবী সুকুমার মৃধার নাম, যিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন।

সুকুমার মৃধা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আইনি পেশায় জড়িত ছিলেন। রাজধানীর ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ তলায় সুকুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসে দীর্ঘদিন ধরে পি কে হালদার ও তার পরিবারের সদস্যদের কর ফাইলের কাজ করেছেন তিনি। এ সূত্র ধরেই তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পি কে হালদার দেশ থেকে পালিয়ে গেলে দুদকের জালে আটকে যান সুকুমার ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা। গেল বছরের শুরুতে পি কে হালদারের ‘অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের’ মামলায় দুদক সুকুমার-অনিন্দিতাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তারা নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তখন দুদক জানায়, পি কে হালদার বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর তার অবৈধ সম্পদ দেখাশোনা করতেন সুমুকার ও অনিন্দতা মৃধা। পিকে হালদারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানও করেন সুকুমার মৃধা। পি কে হালদার ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত প্রায় ১০০ কোটি টাকা তার মা লিলাবতী হালদারের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে রাখেন। পরে লিলাবতী হালদারের ব্যাংক হিসাব থেকে সুকুমার মৃধা, অবন্তিকা বড়াল ও অনিন্দিতা মৃধার মাধ্যমে আবার পি কে হালদারের কাছে হস্তান্তর ও স্থানান্তর করা হয়।

এছাড়া সুকুমার মৃধার প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ এবং তার মেয়ে অনিন্দিতার প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এসব পি কে হালদারের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ।

ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ তলায় বেনামি প্রতিষ্ঠান

ওই ভবনের ১০ তলার পুরোটাই বেনামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ভবনের ঠিকানা ব্যবহার করেই হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা লিমিটেড, সন্দীপ ইন্টারন্যাশনাল, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল, বর্ণা, ইমেক্সো, আরবি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা হয়।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পি কে পরিবারের কর ফাইল প্রস্তুত করত সুকুমার। সম্পর্কের কারণেই ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারে ‘হাল এন্টারপ্রাইজে’র সাইনবোর্ড টানানো হয়। পি কের উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক পদে যুক্ত হন সুকুমারের মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা। ওই প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ৪০ কোটি টাকা ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেনি। তখন সুকুমার মৃধার মেয়ের নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসির শেয়ারও কেনা হয়।

৪২৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ছয় হাজার ৮০ কোটি টাকা লেনদেনের মামলায় সদ্য ভারতে গ্রেপ্তার পি কে হালদারসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রয়েছে।

‘অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের’ এই মামলায় গত বছরের জানুয়ারিতে পি কে হালদারের ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে গ্রেপ্তার করে দুদক। দুদক সুকুমার মৃধার প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ এবং তার মেয়ে অনিন্দিতার প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পায়।

ভারতে বাড়ি ও মাছের ভেড়ির ব্যবসা

ভারতী পল্লি এলাকার পাশে নবজীবন পল্লিতে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি পাওয়া গেছে পি কে হালদারের আত্মীয় প্রণব কুমার হালদারের। ঠিক তার পাশেই আরেক বিলাসবহুল বাগানবাড়ি সুকুমার মৃধার। মাছ ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও এলাকাবাসী সুকুমার মৃধার বিলাসী জীবন দেখে সব সময়ই সন্দেহ করতেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসে, এই এলাকাতেই একাধিক সম্পত্তি ক্রয় করেছে পি কে হালদার- সুকুমার মৃধা। এর মধ্যে শুক্রবার শুধু অশোকনগরেই তিন বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। যার একটিতে এতদিন একাই থাকতেন সুকুমার মৃধার জামাতা সঞ্জীব হালদার। প্রায় দুই বছর আগে শেষবার সুকুমার মৃধা অশোকনগরের এই বাড়িতে গিয়েছিলেন।

সূত্র জানায়, সঞ্জীব হালদার নিজেও বাংলাদেশি নাগরিক। পি কে হালদারের ভাই প্রীতিশ তিন থেকে চার বছর আগে বাড়িটি সুকুমার মৃধার নামে হস্তান্তর করেন।

শুক্রবার সকালে ভারতের অর্থ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) কলকাতাসহ অশোকনগরের অন্তত দশটি জায়গায় অভিযান চালায়। অশোকনগরে পিকে হালদার চক্রের আরেক সহযোগী স্বপন মিত্রের বাড়ি থেকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত একাধিক নথিও জব্দ করে তারা। পরে দীর্ঘ জেরার পর পি কে হালদারকে আটক করে ইডি।

ইডির তদন্ত সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিন এক প্রতিবেদনে বলেছে, অশোকনগরের ভারতী ক্লাব এলাকার সুকুমার মৃধা পিকে হালদারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে পিকে হালদারের লুট করা অর্থ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিপুল সম্পত্তি ক্রয়ে সুকুমারের যোগসাজশ রয়েছে।

নিউজ এইটিন বলছে, বেশ কয়েকবছর আগে কয়েক কাঠা জায়গার ওপরে বিলাসবহুল বাগানবাড়িগুলো তৈরি করা হয়। সুকুমার, প্রণব, স্বপন- এরা প্রত্যেকেই পিকে হালদারের পাচার করা অর্থে হঠাৎ বড়লোক হয়ে যাওয়ায় সেখানকার স্থানীয় মানুষের মনেও তাদেরকে নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন।

বাংলাদেশ থেকে পিকে হালদারের পাচার করা টাকায় অশোকনগর, কলকাতা ছাড়াও দিল্লি, মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে সুকুমার মৃধার যোগসাজশে বিভিন্ন সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে ধারণা ভারতের অর্থ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর।

দুদক কী বলছে

সুকুমার মৃধা বাংলাদেশ থেকে ভারতে অর্থ পাচার করলে সেটি ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, ‘ভারতের কর্তৃপক্ষ যদি নিশ্চিত করে এই অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে, তাহলে আদালতের মাধ্যমে আমরা সেটা জব্দ করতে পারবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন ইতোমধ্যে জানিয়েছেন পিকে হালদারকে দেশে ফেরাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শনিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাইনি। জানা মাত্রই তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ঢাকাটাইমস/১৪মে/এসএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :