রূপালী লাইফের কারসাজি চক্র মেঘনা লাইফেও?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ২১:৫২ | প্রকাশিত : ০৫ জুন ২০২৩, ২১:০৫

একে তো ‘দুর্বল’ কোম্পানি। তার ওপরে আবার ‘মৌল ভিত্তি’ নেই শেয়ারের। এরপরও বাজারে উল্লম্ফনে রূপালী লাইফের পিছু পিছু ছুটছে মেঘনা লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ারের দর। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে একটি ‘চিহ্নিত’ চক্র এ অপকর্ম করছে বলে ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপালী লাইফের শেয়ার নিয়ে যে চক্রটি ‘গ্যাম্বলিং’ করছে, ঠিক একই চক্র এবার টার্গেট করেছে মেঘনা লাইফকে। এই চক্রের কারসাজিতেই দুর্বল কোম্পানিটির শেয়ার মাত্র ১৫ কার্যদিবসে ৬৭ টাকা থেকে ১১৩ টাকায় পৌঁছেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে যেসব শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি হচ্ছে সেসব শেয়ারের ওপর নজর রাখছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—বিএসইসি। উল্লম্ফনে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বিষয়ে ‘তেমন কিছু’ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থার কথাও বলছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

আর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ—ডিএসই বলছে, শেয়ারের দর কমা-বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি হলে তারা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিতে একটি চক্র রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে নেমেছে। এরইমধ্যে দুর্বল কোম্পানিটির শেয়ার দর ৯০ টাকা থেকে ২২৩ টাকায় পৌঁছেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপালী লাইফের শেয়ারের পেছনে থাকা একই চক্রই এবার টার্গেট করেছে মেঘনা লাইফের শেয়ারে। প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য আয় না থাকলেও শেয়ারের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৪ মে মেঘনা লাইফের শেয়ার ছিল ৬৭ দশমিক ৮০ টাকা। ২৮ মে তা পৌঁছে ৯০ দশমিক ৮০ টাকায়। গত রবিবার ওই শেয়ারের দাম ওঠে ১০৩ দশমিক ১০ টাকা। আর গতকাল সোমবার ১১৩ টাকা ৪০ পয়সা। কোম্পানিটি এদিন পুঁজিবাজারের ২০ শীর্ষ কোম্পানির মধ্যে দ্বিতীয় নম্বরে ছিল।

বিনিয়োগকারীদের অনেকেই মনে করেন, বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতনের পেছনে একটি মহলের কারসাজি রয়েছে। বিনিয়োগকারী সেজে ছোট-বড় এসব চক্র দেশের পুঁজি বাজারে সক্রিয় রয়েছে।

এসব কথিত বিনিয়োগকারীরা (গ্যাম্বলার) লোভের ফাঁদে ফেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতানোর ছক কষছেন। কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

অভিযোগ উঠেছে, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত পুঁজিবাজারের বিতর্কিত বিনিয়োগকারী লুৎফুল গনি টিটুর পাতানো ছকেই রূপালী লাইফ ও মেঘনা লাইফের শেয়ারের দাম রাতারাতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এই চক্রটি একের পর এক বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিএসইসি সূত্র বলছে, একইভাবে টিটু ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত সহযোগীদের নিয়ে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩২ টাকা ৭০ পয়সায় তোলে।

কারসাজির এই প্রক্রিয়ায় লুৎফুল গনি টিটু, তার স্ত্রী শাম্মি নেওয়াজ ও টিটুর প্রতিষ্ঠান সাতরং এগ্রো ফিশারিজ মোট ১ কোটি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫৭ টাকা মুনাফা করে।

ইতোমধ্যেই লুৎফুল গনি টিটু শেয়ার কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত। তার দুটি কোম্পানিকে মোট ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ কারসাজিতে টিটুর স্ত্রীকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে বিএসইসির তদন্তে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে লুৎফুল গনি টিটুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে ঢাকা টাইমস। টিটুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোনকল করে এবং বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।

বিএসইসির সূত্র বলছে, অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে রূপালী লাইফ ও মেঘনা লাইফসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ আছে কি না তাও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

এই মূল্য বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক বলছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরাও। তারা বলছেন, এক শ্রেণির কথিত বিনিয়োগকারী পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম উপায়ে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়াচ্ছেন।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে অর্থ হাতানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য। শেয়ারবাজারে কারসাজি চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠায় এভাবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে।

ডিএসইর একটি সূত্র জানিয়েছে, মেঘনা লাইফ ও রূপালী লাইফের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির পেছনে টিটুর হাত থাকার যেকথা বাজারে আলোচনা হচ্ছে, সে বিষয়ে ডিএসইর নজরদারি করছে।

অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিগুলোকে নজরে রাখা হয়েছে বলে ঢাকা টাইমসকে জানিয়েছেন ডিএসইর উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুর রহমান।

তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘দাম ওঠা-নামা শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের দাম উঠতে থাকে, তাদের নজরে রেখে ডিএসই পর্যালোচনা করে থাকে। কারসাজি বা কৃত্রিমভাবে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

পুঁজিবাজারে এমন কারসাজির বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয় না বলেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন।

ঢাকা টাইমসকে এ পুঁজিবাজার বিশ্লেষক বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ই দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শেয়ার কিনে নিয়ে কারসাজি করছে। তাদের কারসাজির কারণে সেসব শেয়ারের দাম বাড়ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ পুরো বাজার।’

‘তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। কারসাজির ফলে ৩৫ টাকার শেয়ার হয়ে যায় ৩০০ টাকা, ৮০ টাকার শেয়ার হয়ে যাচ্ছে ১ হাজার টাকা। সবকিছু মিলিয়ে বাজারে যে তারল্যটা থাকার কথা তা আর থাকে না।’

ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধোন বলছে, চক্রটি ছক কষে কম দামে মেঘনা লাইফের শেয়ারের বেশিরভাগ কিনে হাতে নিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়েছে। তারা নিজেদের লোক দিয়ে উচ্চমূল্যে ওই শেয়ার কিনতে থাকে। এর ফলে দাম উঠতে থাকে।

অন্যদিকে বাজারে আলোড়ন তোলা হয়, মেঘনা লাইফের শেয়ারের দাম আরও বাড়বে। আর তাদের সাজানো ফাঁদে ফাঁসাতে ভুয়া প্রচারণা (ফলস মার্কেটিং) চালানো হয়। এভাবেই অতি উচ্চমূল্যে ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে মেঘনা লাইফের শেয়ারগুলো বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতানোর পাঁয়তারা করছে চক্রটি। এভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত বিনিয়োগ হাতিয়ে পকেট ভারী করতে চাচ্ছে পুঁজিবাজারের চিহ্নিত ওই চক্রটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইন্সুরেন্স খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। তেমন কিছু দেখা গেলে আমার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে তদন্তের নির্দেশ দেবো।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগ বেশ পুরনো। তবে শেয়ার বাজারে বড় আকারের কেলেঙ্কারি ঘটে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে। ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। শুধু একটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল দুজনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

(ঢাকাটাইমস/০৫জুন/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ

বেড়ার মেয়র আসিফ ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, দেশ ছাড়লেন কীভাবে? কৌতূহল সর্বত্র

শিক্ষকদের পেনশনের টেনসনে স্থবির উচ্চশিক্ষা

কেরাণীগঞ্জে দেড় কোটি টাকার নিষিদ্ধ ব্রাহমা গরুর সন্ধান

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর উদ্যোগ কতটা গ্রহণযোগ্য? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সর্বজনীন পেনশনে অনীহা কেন, যা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকনেতারা

সাদিক অ্যাগ্রোর সবই ছিল চটক

ঢাকা মহানগর বিএনপি ও যুবদলের কমিটি দিতে ধীরগতি যে কারণে

রাসেলস ভাইপার আতঙ্ক: উপজেলা হাসপাতালগুলোতে নেই চিকিৎসা সক্ষমতা

মাগুরায় বাড়ি-জমি উত্তম কুমারের: কোথাও খোঁজ নেই তার, দুদকের অনুসন্ধান সম্পন্ন

কোথায় পালিয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার, জানে না পুলিশ, স্থায়ী বরখাস্ত হলেই ডুমাইনে ভোট

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :