বিজয়ের বীরত্বগাথা

বৃষ্টির মতো নয়, টার্গেট করে গুলি করার নির্দেশ ছিল

মেহেদী হাসান, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৬:২২

বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দীন আহমেদ হাওলাদার- দেশকে ভালোবেসে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। শত্রুর কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। যুদ্ধকালিন সেই স্মৃতিকথা তিনি তুলে ধরেছেন ঢাকা টাইমস প্রতিবেদক মেহেদী হাসানের কাছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দীন আহমেদ হাওলাদার বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার নওপাড়ার জয় বাংলা বাজারের পশ্চিম পাশে। ১৯৫১ সালের পহেলা ডিসেম্বর আমার জন্ম। যখন আমি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জেনারেল আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট। সেসময় চতুর্থ শ্রেণির একটি পাঠ্যপুস্তকের নাম ছিল ‘আমার জানতে হবে’। ২৫-৩০ জন মন্ত্রিসভার সদস্যদের ছবি ছিল যার মধ্যে একজনও বাঙালি সদস্যের ঠাঁই ছিল না। সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। তখন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের গভর্ণর ছিলেন আজম খান। তিনিও ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী।

তিনি বলেন, বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের এমন বিমাতাসুলভ ও হিংসাত্মক আচরণ ছোটবেলা থেকেই আমার মনে দারুণ ক্ষোভের উদ্রেক করে। বড়দের কাছে শোনা ও নিজের দেখা পাকিস্তানীদের কর্মকাণ্ড বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকে। আমরা বইয়ে পড়েছি আমাদের দেশের লোকসংখ্যা চার কোটি ওদের তার চেয়ে কম ছিল। অথচ আমাদের বেশি হওয়া সত্বেও মন্ত্রী সভায় একজনেরও স্থান হয়নি। সর্বক্ষেত্রে ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য ও অবহেলা। স্কুলে আমরা বাঙালি কবি গোলাম মোস্তফা সাহেব রচিত জাতীয় সংগীত পরিবেশন করতাম। তখন জাতীয় সংগীতটি ছিল- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ পূর্ববাংলার শ্যামলময় পঞ্চ নদীর তীরে অরুণীময় ধুসর সিন্ধুর মরু সাহারায় ঝাণ্ডা জাগে যে আজাদ’। সামরিক সরকার ক্ষমতায় বসে জেনারেল আইয়ুব খান ওই জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করে তখন উর্দুতে চালু করে যা আজও পাকিস্তানে বহাল।

আমরা নতুন সংগীত গাইতাম। কিন্তু কিছুই বুঝতাম না। ১৪ আগস্টকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস বলা হতো। আমরা বলতাম পাকিস্তান দিবস সেটা খুব জমকালোভাবে পালন হতো। ওইদিন পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ প্রচার হতো রেডিওতে। তার ভাষণে উল্লেখ ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুর কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বাংলা ভাষার তার কাছে কোনো মূল্য ছিল না।

তিনি জানান, কখনোই উর্দুতে কথা বলতে পারেননি তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দীন বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের পর দেশের সবাই অসহযোগ আন্দোলন করতে লাগলো। তখন আমি রংপুরে চাকরি করি। এক পর্যায়ে আমি গ্রামের বাড়ি চলে আসি। সেখানেও দেখি একই অবস্থা। যেহেতু আমাকে ২৮ তারিখ বেতন নিতে হয়, তাই ২৫ মার্চ তারিখে গ্রামের বাড়ি থেকে আমি রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কিন্তু ২৫ মার্চ ঢাকায় আটকা পড়ে যাই। ২৫ ও ২৬ মার্চ- এই দুই রাত আমি ঢাকা শহরে ছিলাম। কী বীভৎস সেই রাত! অগণিত নীরিহ মানুষকে হত্যা করা হয়। পরে আমরা কয়েকজন মিলে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলাম। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধে চলে যাই তার আগে আমার চাকরিতে একটি পদোন্নতি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমি যখন অর্ডারগুলো পাই স্বাধীনতার পরে তখন দেখা গেল ওই সরকার আমলেই আমার পদোন্নতি বাতিল করে এবং মার্শাল-ল- বি জোনের অধ্যাদেশে আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

যুদ্ধের ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের শরীয়তপুর জেলা ছিল তখন বৃহত্তর ফরিদপুরের অংশ। কোনো পাকা রাস্তা না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ওই অঞ্চলে পাকিস্তান আর্মিরা যেতে ভয় পেত।

আমাদের এলাকাটি ছিল নদীপথ এবং আমাদের কয়েকজনের দায়িত্ব ছিল কর সুরেশ্বর লঞ্চঘাট ও ওয়াপদা লঞ্চ ঘাটে। এই দুটো ঘাট লঞ্চ বা শিপে আসার শত্রুপক্ষের একমাত্র প্রধান পথ ছিল। এখানে দুইটা যুদ্ধ হয়েছে। ১০ অক্টোবর ভেদেরগঞ্জ থানার যুদ্ধে আমরা প্রায় চার পাচঁশ মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেছিলাম। ১০ অক্টোবর খুব ভোরে যুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং রাত ১২ টায় শেষ হয়। আমাদের পক্ষে ৪-৫ জন ও শত্রুপক্ষের ৮৫ জন নিহত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ নেয়া প্রসঙ্গে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বাগমারা ট্রেনিং সেন্টারে চার সপ্তাহের ট্রেনিং শেষে মেলাঘর নামক স্থানে অস্ত্রের জন্য অপেক্ষাকালে মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি এম এ জি ওসমানী সাহেব ও খালেদ মোশারফ সাহেব আমাদের ওখানে যান। আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন কর্নেল ওসমানী সাহেব।

সকল মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পাকিস্তানিদের সঙ্গে তোমরা যুদ্ধ করবে হিসেব করে। আমরা যে কটা গুলি দেব তা পর্যাপ্ত নয়। ওরা বৃষ্টির মতো ছাড়বে। কিন্তু তোমাদের বৃষ্টির মতো ছাড়লে হবে না। তোমাদের প্রত্যেকটা গুলি মূল্যবান এবং প্রত্যেকটা গুলি ঠিক টার্গেট মতো ফেলতে হবে। তারপর আমরা ওখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমাদের ট্রেনিং গুলো হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্য। আমরা আসা- যাওয়ার পথে বৃহত্তর কুমিল্লার গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা যেভাবে আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করেছে, আমাদের সহযোগিতা ও দোয়া করেছে তা ব্যক্ত করার ভাষা নেই। ১২৬ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আমরা একসঙ্গে ছিলাম।

ব্যক্তিগতভাবে পুরো দুই মাস আমি সুরেশ্বর ও ওয়াপদা ঘাটে বাঙ্কারে ডিউটি করেছি। আজও মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা। যে সৌভাগ্য শুধু আমার একার নয়- সমগ্র জাতি ও দেশবাসী তখনকার সাত কোটি মানুষের যারা জীবিত ছিল। ওই সাত কোটি মানুষের সৌভাগ্য যে, তারা একটা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছে।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার দুটো স্মৃতির কথা আজও মনে পড়ে। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় মাঝে মাঝে পীড়া দেয় এই প্রজন্মের ছেলেরা হয়তো সত্যি বললে বিশ্বাস করবে না। আমাদের ট্রেনিংয়ের সময় ভারতে অতি মোটা চালের ভাত ও পঁচা ডাল খেয়ে থাকতাম। একদিন দুপুর বেলা যখন খাবারের লাইনে দাঁড়ালাম তখন সবার পেটেই প্রচণ্ড ক্ষুধা। কড়া দুপুরের সময় ডান দিক থেকে খাবার নিয়ে আসছে আমার ডান পাশে একজন মুক্তিযোদ্ধা লাইন ভেঙে সামনে ঢুকে পড়ায় আমি তাকে ভর্ৎসনা করায় সে লাইনের শেষ মাথায় চলে গেল। তার পর্যন্ত খাবার পৌঁছানোর আগেই ক্ষুধার জ্বালায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। অজ্ঞান হওয়া বন্ধুটিকে সেবা দিয়ে সুস্থ করা হয়।

তিনি বলেন, ক্ষুধার জ্বালা যে কি জ্বালা বিষয়টি পরে অনুধাবন করেছি। ঘটনাটি আজও আমাকে পীড়া দেয়- জানিনা, সেই মুক্তিযোদ্ধাটি বেঁচে আছেন কি না! যদি বেঁচে থাকেন তার জন্য আমার শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও দীর্ঘায়ু কামনা। প্রয়াত হলে বিনম্র শ্রদ্ধা ও জান্নাত কামনা করি। আমি মাঝে-মধ্যে দোয়া করি, সে যেন আমাকে ক্ষমা করেন।

আরেকদিনের ঘটনা হলো মেলাঘরে হাজার হাজার মানুষ। ওটা ছিল বনাঞ্চল। পায়খানা প্রসাবের জন্য অনেকেই ঝোপঝাড়ে চলে যেত। একদিন আমি ও আরেকজন বন্ধু সে কাজে হেঁটে যাচ্ছিলাম। মাঠে পৌঁছলে একজন বয়স্ক হিন্দু কৃষক আমাদের বললেন, বাবা তোমরা কবে যাবে এদেশ থেকে? তা আমি বললাম কি কাকা আপনাদের কি খারাপ লাগে আমাদেরকে দেখে? তিনি বললেন, না কাকা- এ বছর তোমরা পায়খানা প্রস্রাব করে চাষাবাদের জমিগুলো একেবারে নষ্ট করে ফেলছো। জমিতে পা রাখার জায়গা নেই তাই বললাম। যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে এ বছর চাষাবাদ করতে পারবো কি না ভগবান জানেন। আমরা খুব হাসলাম; তিনি আমাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন, আশির্বাদ করি, তোমরা যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করো। তোমরা আমার কথায় মনে কিছু নিও না।

তিনি বলেন, আমরা অনেকগুলো অস্ত্র চালনা শিখেছিলাম, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- এসএমসি, এসএমজি,থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এমকে-৫, এসএলআর, এলএমজি এবং হ্যাণ্ড গ্রেনেড। এর মধ্যে সবচেয়ে একটা হালকা অস্ত্র ছিল তার নাম ছিল এসএমসি। ওই অস্ত্র দিয়েই একটি ছেলে মারা যায়। ছেলেটার নাম ছিল আলাউদ্দিন। তারপর থেকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে ওই অস্ত্র হাতে নিতাম। যে ছেলেটা মারা গিয়েছিল সে নাকি ১৫ দিন আগেও একবার দেশে ঢুকতেছিল কিন্তু কুমিল্লা এসে পাকিস্তান আর্মির সম্মুখীন হওয়ায় তারা আবার ইন্ডিয়াতে ফেরত যায়। কিন্তু তার বাড়িতে তার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে পাকিস্তানীদের গুলিতে মারা যাওয়ার। অথচ সে পাকিস্তানিদের হাতে মারা যায়নি- এক্সিডেন্টলি মারা গেছে। এসব স্মৃতি যখন মনে পড়ে মনটা ভারি হয়ে ওঠে। স্মৃতিপটে চিরজাগরুক সেই মুক্তিযুদ্ধ।

(ঢাকাটাইমস/০৫ডিসেম্বর/এমএইচ/বিবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :