শহীদ দিবসের পরদিনই দখলদারের মুঠোয় ঐতিহাসিক আমতলা গেট

তানিয়া আক্তার, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:১০ | প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:২১

রাজকীয় দুর্গের ন্যায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির অস্তিত্বের স্মারক ঐতিহাসিক আমতলা গেট। আম্রমুকুলে ছেয়ে গেছে গেটঘেঁষা আমগাছ। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পরদিনই আমতলার চারপাশ অবৈধ দোকানদারদের দখলে চলে গেছে। নোংরা, ময়লা আর স্যাঁতসেঁতে এক অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। এত অর্থবহ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থানটি সংরক্ষণে অবজ্ঞা, অনিয়ম আর অনাদর সাক্ষ্য দিচ্ছে বাঙালি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি অমলিন রাখায় নিদারুণভাবে অক্ষম। এমনটাই মনে করছেন সমাজ-বিশ্লেষকরা। সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে এর সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।

সরে জমিনে দেখা যায়, অমর একুশে ফেব্রুয়ারির পরদিন বৃহস্পতিবার দখলদারদের মুঠোয় চলে গেছে ভাষা আন্দোলনে স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত দেখা যায় দখলদারদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ নেই প্রাঙ্গণটির। গেটের গায়ে ভাষা আন্দোলনের ছবি সম্বলিত কয়েকটি ব্যানার সাঁটানো থাকলেও এই সাইনবোর্ড ঘেঁষেই বসেছে বাহারি ভাসমান দোকান।

গেটের সামনে বসে টুং টাং শব্দে স্বাভাবিক দিনের মতো চা বিক্রি করছে এক কিশোর। ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সূচনা যে গেট, এর ইতিহাস জানা নেই তার।

পাশেই পানের ডালা সাজিয়ে বসেছেন মুন্না নামের এক তরুণ। তার বয়সি দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালে এই গেট দিয়ে ভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছেন সেটি জেনেও বসেছেন। পেটের দায়ে বিবেককে সাড়া দিচ্ছেন না এই তরুণ।

পান বিক্রেতা মুন্না বলেন, ‘সব জানি। এখানে কী হইছিল। কিন্তু কি করার আছে। পেট তো চালান লাগবো।’

গেটটি তালাবদ্ধ নয়। একটি কাপড়ের সুতোয় বেঁধে রাখা হয়েছে। গেটের গায়ে সতর্কতামূলক এক বার্তা লেখা রয়েছে এমন, ‘এখানে ডাক্তারের বাসা, আড্ডা দেওয়া ও সিগারেট খাওয়া নিষেধ।’ স্থানীয়রা জানালেন এখানে এক গাইনি ডাক্তারের পরিবার বাস করেন।

হাত পাখা থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের বাতলি, কমোড, মাদুর, বালিশ, কম্বল, ডাব, এয়ার ফ্রেশনার, টিস্যু, ব্রাশ-বিস্কুটসহ হেন জিনিসের অভাব নেই।

বিকালে টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত এনে কয়েকটি বেঞ্চ বসিয়ে গ্রাহককে ভাত খাওয়াচ্ছেন কয়েকজন। এর পাশেই আটার রুটি আর নানা রকম ভর্তাসহ চিতই পিঠার পসরা সাজিয়ে বসেছেন নারীরা।

সন্ধ্যা ঘনাতেই দোকানির সংখ্যা বাড়তে থাকলো। গরম দুধ আর সিদ্ধ ডিম নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।

গেটের মুখোমুখি ঝুড়িভর্তি কলার কাঁদি নিয়ে বসেছেন আবদুস সালাম। গত ৩০ বছর ধরে এই গেটের সামনে কলা বিক্রি করছেন। ইতিহাসটিও অজানা নয়। তবে বিক্রি করা ঠিক কি না জানা নেই। ফলে প্রতিদিন কলা বিক্রির উদ্দেশ্যে চলে আসেন এখানে।

কলা বিক্রেতা আবদুস সালাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তিরিশ বছর ধইরা কলা বিক্রি করতাছি। এই গেইট দিয়া আন্দোলন হইছিল। অহন এর সামনে কলা বেচা যাইবো না?’

সবেমাত্র সিগারেটের ট্রলি নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়েছেন এক বিক্রেতা। এমন সময় শুনতে পেলেন তাদের উঠিয়ে দিতে অভিযান শুরু হবে। মিনিট কয়েক ট্রলি এদিক-সেদিক নড়াচড়া করে নিশ্চিত হলো আজ আর অভিযান হবে না। সুতরাং যথারীতি বেচা-বিক্রি করে যাচ্ছেন।

এখানে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের এক দোকানি জানান, ‘৩০ থেকে ৪০টির মতো দোকান থাকলেও এখন অনেকটা কমেছে। গতকালই একমাত্র দিন যে, জায়গাটি ছিল বেশ পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে। কিন্তু আজই (বৃহস্পতিবার) আবার হকাররা বসতে শুরু করেছে।’

জানা গেছে, কালা চাঁন নামে একজনের দায়িত্বে এই অরাজকতা চলে। অভিযানের আগেই এখানকার দোকানদারদের জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নিশ্চিতভাবে কেটে পড়েন। এখানে বসতে হলে ৫০ টাকার নিচে কোনো চাঁদা দেওয়ার নিয়ম নেই। দোকানভেদে বিক্রির ওপর দিতে হয় নানারকম চাঁদা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাভুক্ত এ আমতলা গেট নিয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গতকাল দেখেছিলাম সব ঠিক আছে। আজ কেমন আছে জানা নেই। তবে হকারদের বসার কারণে যানজটের সৃষ্টিও হয়। আমি কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। আমি শুধু জানাতে পারি আর কিছু করার নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সমাজ-বিশ্লেষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা তো কিছুই সংরক্ষণ করতে পারছি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমগাছটি কেন কেটে ফেলা হয়েছে সেটিও জানি না। কারণ ভবন সংস্করণের মতো ঘটনা তো নেই। আমাদের মধ্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রচণ্ড উদাসীনতা রয়েছে। সাধারণ মানুষের এখানে কিছু করার নেই। কিন্তু যারা দায়িত্বে রয়েছেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রকার আগ্রহ নেই। ঐতিহাসিক আমতলা গেট শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই নয়, এটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্যও বটে। সুতরাং এটি সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। সবকিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলোকে রক্ষা করতে হয়। এই যত্নটাই নেওয়া হচ্ছে না।’

(ঢাকাটাইমস/২৩ফেব্রুয়ারি/কেএ/এসআইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :