ফুটবলার থেকে সংসদ সদস্য, সোনা চোরাচালানেও জড়ান আনার?

​​​​​​​ঝিনাইদহ প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ২১:০৫ | প্রকাশিত : ২৩ মে ২০২৪, ১৬:৪৯

ঝিনাইদহ- আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার কিছু দিন আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বুধবার সকালে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর আসে, কলকাতায় তিনি খুন হয়েছেন।

তারপর থেকেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে তার ভালো-মন্দ যাবতীয় খবরাখবর মানুষের সামনে উঠে আসে। কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেনে তাকে খুন করা হয়। ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা জানান।

আলোচিত এই সংসদ সদস্যের মৃত্যু ঘিরে রহস্য দেখা দিয়েছে। উঠছে নানা প্রশ্নও। তবে সব প্রশ্নের ভিড়ে একটি বিষয় সবাই জানতে চায়। কে এই এমপি আনার, কীভাবে তিনি বেড়ে উঠেছেন কেনইবা তাকে ঘিরে এত আলোচনা?

আনোয়ারুল আজীম আনারের জন্মস্থান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মধুগঞ্জ বাজার এলাকায়। ১৯৬৮ সালে তিনি জন্মগ্রহন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ঝিনাইদহ- আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি ২০১৪, ২০১৮ ২০২৪ সালে টানা তিনবার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন।

ফুটবল দিয়ে আনোয়ারুল আজীম জীবন শুরু করেন। ১০ বছর বয়স থেকে তিনি দুরন্ত ফুটবলার ছিলেন, তার সঙ্গে ফুটবল খেলা অনেক বন্ধু স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

১৯৯১ সালে আজীম বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি পৌরসভার কাউন্সিলর থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন শুরু করেন এবং পর পর তিনি দুবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন জনপ্রতিনিধি। গরিবের আপনজন বলে খ্যাত আজীমের মৃত্যুতে উপজেলাজুড়ে শোকের মাতম বইছে।

আজীমের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে এলাকায়। আবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় বিরোধের কারণেও তিনি এবার এমপি নির্বাচনে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েন।

এলাকাবাসী বলছে, এক সময়ের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন আনার। অস্ত্র বিস্ফোরক দ্রব্য পাচারের হোতা হিসেবেও পুলিশের খাতায় নাম ছিল তার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দুধর্ষ সন্ত্রাসী চরমপন্থিদের গডফাদার হিসেবে পরিচিতি পান। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে নয়টির বেশি মামলা ছিল।

ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামি হিসেবে পুলিশ একবার তাকে আটক করলেও তার ক্যাডাররা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যৌথ বাহিনীর অপারেশনের সময় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

ঝিনাইদহের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালের দিকে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে আনার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ভারতের বাগদা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বাঘাভাঙ্গা সীমান্ত পথে চোরাচালান করতেন তিনি। এই মাদক কারবারের মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিকও বনে যান এমপি আনার।

১৯৯১ সালে আনার ঝিনাইদহের আরেক চোরাকারবারি পরিতোষ ঠাকুরের সঙ্গে মিলে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। স্বর্ণের বড় বড় চালান রাজধানী থেকে বাঘাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার করতেন তারা।

১৯৯৬ সালে আনার বিএনপি থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মাদক স্বর্ণ চোরাচালানের কারবারের সঙ্গে কালীগঞ্জ পৌরসভার এক কমিশনারের হাত ধরে অস্ত্র চোরাকারবারে জড়ান তিনি। তার অবৈধ অস্ত্রের চালান চরমপন্থি ক্যাডার রবিনের কাছে বিক্রি হতো।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গার লোকনাথপুর এলাকা থেকে ১২ কেজি ৯৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটক করে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর। চোরাকারবারিরা নিশ্চিত হয় যে, দর্শনা শ্যামপুরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম স্বর্ণগুলো ধরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনায় টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন সাইফুল। ওই হত্যা মামলায় আনারসহ আসামি করা হয় ২৫ জনকে। কুষ্টিয়ার চরমপন্থি নেতা মুকুল, শাহীন রুমী, ঝিনাইদহের চোরাকারবারি পরিতোষ ঠাকুর, আনারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে পরের বছর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়ে বেশিরভাগ মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন আনার।

বুধবার সকালে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টিভি নাইন বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১২ মে কলকাতায় যান আনার। একজন অফিসারের ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন তিনি। বরানগর এলাকার গোপাল বিশ্বাস নামে এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেন আনার।

গত ১৩ মে দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাড়া করা গাড়িতে ওঠেন আনার। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার এই মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু বলেন, আমি টেলিভিশনে আনারের মৃত্যুর খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার বাসভবনে ছুটে আসি। এখানে এসে দেখি হাজার হাজার মানুষ আহাজারি করছে। আমি সবার উদ্দেশ্যে বলবো এভাবে যারা আনারকে হত্যা করেছে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।

কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘আমরা একজন নেতাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি, বিষয়টি কিছুতেই মানতে পারছি না।’

(ঢাকাটাইমস/২৩মে/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :