ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব, ভোগান্তিতে উপকূলবাসী, পৌঁছায়নি সরকারি ত্রাণ সহায়তা

আব্দুল কাইয়ুম, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
 | প্রকাশিত : ২৮ মে ২০২৪, ২০:৫৫

ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে উপকূলবাসীর মাঝে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো ক্ষত। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কুয়াকাটা উপকূলের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে। শনি, রবি ও সোম এই তিন দিন রেমাল তাণ্ডব শেষ হলেও এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি সরকারি ত্রাণ সহায়তা। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্যোগ কবলিত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি উপকূলের কোনো কাঁচা বসত বাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুয়াকাটার বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল-মোটেলও।

সমুদ্র সংলগ্ন বেড়িবাঁধের বাইরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অনেকে হারিয়েছেন মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই। পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারিয়েছেন জীবিকার্জনের শেষ সম্বলটুকু। এছাড়া সড়কের পাশে বসানো অনেক বৈদ্যুতিক খুঁটি ধসে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে গাছপালা, ফসলি জমি, মাছের ঘেরের।

রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে সোমবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ২২ ঘণ্টা রেমাল তাণ্ডবে আতঙ্কে ছিল উপকূলবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় রেমাল বারবার গতি পরিবর্তন করেছে। পূর্ব দিক থেকে শুরু হলেও কখনো পশ্চিমে কখনো দক্ষিণে আবার কখনো উত্তর দিক থেকে বইছিল ঝড়ো হাওয়া। উপকূলের মানুষ চার দিক দিয়ে আগাত হানার মত এমন নজিরবিহীন দুর্যোগের সম্মুখীন আর কখনও হইনি।

তবে কুয়াকাটা সৈকত সুরক্ষা বাঁধের কারণে বেড়িবাঁধের বাইরের মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পেয়েছে।

মো. কবির, আউয়াল ও মিরাজসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পর্যটকের যাতায়াত সুবিধার জন্য সৈকতের কোলঘেঁষে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কি.মি.নতুন একটি সড়কের কাজ চলমান রয়েছে, সেটিও বিভিন্ন পয়েন্টে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড়ে ভেঙ্গে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুরক্ষা বাঁধের বস্তা সরে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এলোমেলো করে দিয়েছে সৈকত এলাকার সবকিছু। এতে সৈকতের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি ঝুঁকি বেড়েছে পর্যটকদের। সমুদ্রের ঢেউয়ের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশাল বনভূমি।

কুয়াকাটা আবাসিক হোটেল ‘সৈকতের’ মালিক জিয়াউর রহমান জানান, এমন ঝড় তিনি আর দেখেননি। চারদিক দিয়ে বাতাসের আক্রমণে মানুষ দিশেহারা হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, দুইদিনব্যাপী দুর্যোগে তার হোটেলের ৮টি পানির ট্যাংকি পাঁচ তলার ছাঁদ থেকে পড়ে গেছে। এতে় তার প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। শুধু তার হোটেলই নয়, এমন অনেক আবাসিক হোটেল ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানান তিনি।

তবে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস এবং ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সমুদ্র উপকূলের মানুষ এটিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। শনিবার বিকাল থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে নির্দেশনা দিলেও কাউকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে দেখা যায়নি। পরে রবিবার বিকালে ঘুর্ণিঝড়ের ভয়ানক রূপ দেখে কুয়াকাটা আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে মানুষ।

এদিকে শনিবার রাত থেকে রেমালের তাণ্ডবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় পুরো উপকূল। এর সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট ও ক্যাবল নেটওয়ার্ক বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় আবাসিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে পানির সংকট দেখা দেয়।

কৃষি বিভাগের মতে, ভারী থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত এবং জোয়ারের অতিরিক্ত পানিতে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে কৃষকের যে ক্ষতি হয়েছে তার প্রভাব পুরো দেশের উপর পড়বে।

কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে শুধু কলাপাড়ায় মৎস্য খাতে ১৫'শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতে দুই কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।

পর্যটন খাতেও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে জানান কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ।

দীর্ঘ সময় ধরে রেমাল তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর বেশির ভাগই দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পর এসব মেরামত করবে নাকি দু-মুঠো ভাতের জন্য কর্মের সন্ধানে বের হবে এ নিয়েই চলছে তাদের ভাবনা।

বেড়িবাঁধের বাইরে সমুদ্র সংলগ্ন বাসিন্দা শাহিনুর বেগম জানান, ‘রবিবার রাতে তার ঘর ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় আমি আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলাম। সন্তানদের নিয়ে তিন বেলার খাবার জোগাড় করতে গিয়েই হিমশিম খেতে হয়। এখন কীভাবে এই ঘর উঠাবো’।

বেড়িবাঁধের বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত জবুল হক, মো. মাহবুব ও সোহেলসহ একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তা নিয়ে কেউ আসেনি। আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতো এখন আর কাউকেই দেখছি না।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যমতে, জেলায় ৯ হাজার ১০৫টি পুকুর, ৭৬৫টি মাছের ঘের এবং ১২০টি কাঁকড়া ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে মৎস্য চাষিদের ১৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৩৫০০ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ২৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা।

এছাড়া পটুয়াখালীতে তিন কিলোমিটার এবং কলাপাড়া উপজেলায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক নুর কুতুবুল আলম সাংবাদিকদের জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা আজই মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে। আশা করছি ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পাবে।

(ঢাকাটাইমস/২৮মে/প্রতিনিধি/পিএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :