ঢালাওভাবে কোটায় নিয়োগ দেওয়া আদৌ সমীচীন নয়

ড. আনোয়ার হোসেন
| আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪, ০৮:৪১ | প্রকাশিত : ০৮ জুলাই ২০২৪, ০৮:৩৭

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ইন্টেরিম বা অন্তবর্তীকালীন রিক্রুটমেন্ট রুলস্ অর্থাৎ অস্থায়ীভাবে আদেশ জারী করেন। বাংলাদেশে কোটার মূল সমস্যাটা হলো- মুক্তিযোদ্ধা কোটা বনাম মেধাবীদের বিবাধ। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা আছে। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা, নারী কোটা, জেলা কোটা, সংখ্যা লঘু কোটা ইত্যাদিসহ প্রায় ৫৬ শতাংশ কোটা রয়েছে। ধরুন কোনো একটি চাকুরীর বিজ্ঞপ্তিতে ২০০ জনকে নিয়োগ করা হবে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে এখানে কমপক্ষে ১ লক্ষ আবেদন জমা হয়। তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান থাকবে। তাদের জন্য ৩০শতাংশ কোটা রয়েছে। অর্থাৎ ৫০ জনের মধ্যে ৩০ জনই নিয়োগ পাবে। তারা যোগ্য হোক বা অযোগ্য হোক।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ (৪) ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে কিছু অন-অগ্রসর শ্রেণির কথা বলা আছে। তারা যদি স্থায়ীভাবে করার চিন্তা করতেন তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা সংবিধানে নিয়ে আসতেন। ওনারা যদি এটা স্থায়ীভাবে করার চেষ্টা করতেন তাহলে বিষয়টি সংবিধানে উল্লেখ করতেন। বাংলাদেশের হতদরিদ্র অনেক লোক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন। এই জন্য অস্থায়ীভাবে বিষয়টি নেওয়ায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সংবিধানে অনঅগ্রসরদের কথা বলা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অনেকে আছেন বড় শিল্পপতি, শীর্ষস্থানীয় আমলা হয়ে চাকুরী হতে অবসর নিয়েছেন। অনেকে এমপি, মন্ত্রী ছিলেন এমনকি বর্তমানেও আছেন। তাহলে উনারা তো অনঅগ্রসর নয়। তাহলে অগ্রসরকে অনঅগ্রসর বানানো নিশ্চই অনৈতিক। অন্যদিকে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা আছে তার মধ্যে কমপক্ষে ৬২ হাজার ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। কাজেই ঢালাওভাবে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাসহ কোটায় নিয়োগ দেওয়া আদৌ সমীচীন নয়।

এবার জানি বিষয়টি কি কারণে অগ্রহণযোগ্য। ১। কোনো কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ঐ পরিমাণ অর্থাৎ ৩০ শতাংশ আবেদনকারী পাওয়া যায় না। যদি পাওয়াও যায় তবে ১৮ কোটি মানুষের জন্য ৫০ শতাংশ আর ৫০ জনের জন্য ৩০ টি। কত বড় বৈষম্য। ২। এই সব কারণে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। যেখানে মেধার কদর নাই। সেখানে মেধাবী থাকবে কি করে। আজকে বাংলাদেশের মেধাবীরা অন্য দেশের সম্পদ। তারা নিজেদেরকে বাংলাদেশী পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করে। ৩। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৩ বছর অতিক্রম করলেও আমরা নাট-বল্টু পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই কোটা প্রথা পুনরায় চালু করা হলে ভালো ইঞ্জিনিয়ার তো দূরে থাক মিস্ত্রিও এদেশে থাকবে না। ৪। কেউ কি তার জন্মের জন্য নিজে দায়ী, তাহলে জন্মের জন্য কেন বঞ্চিত হবে অথবা পুরষ্কৃত হবে। জন্মের পূর্বে রুহ্ জগতে কেউ কি বলেছে হে আল্লাহ আমাকে মুক্তিযোদ্ধার ঘরে জন্ম দিও যাতে আমি ৩০% শতাংশ কোটার সুবিধা পেতে পারে। ৫। পৃথিবীর কোন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছেন কি বা মিথ্যাভাবে বলেছেন কি পিতা মুক্তিযোদ্ধা হলে ছেলে রাজাকার হবেন না। ৬। এটা পুরো জাতির জন্য দিধা বিভক্তির সৃষ্টি করবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতীরা যখন অহেতুক চাকুরী বা ভর্তিতে মেধাবী না হয়েও সুবিধা পাবে। তাহলে পাশের বাড়ি লোক ঈর্ষা করবে এবং এই ঈর্ষা ঘৃণায় পরিনত হবে। যিনি এই সুবিধা গ্রহন করবেন তিনিও হীনমন্নতায় ভুগবেন। ৭। বাংলাদেশে এমনিতেইতো চাকুরীর বাজারে অস্থিরতা, মেধাবীরা চাকুরী পায় না। নিঃসন্দেহে বিষয়টি নিয়ে আরো বেশি জনোরোস তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পুনঃরায় একত্রিত হয়ে দূর্বার আন্দোলনে নামার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ৮। পৃথিবীতে কোথাও এমনটি নাই যে, পিতার সুকর্মের জন্য সন্তান পুরস্কৃত হয়, আবার পিতার কু-কর্মের জন্য সন্তান শাস্তি পায়। ৯। পশ্চাৎ পদ জনগোষ্ঠিকে সামনে নিয়ে আসার জন্য কিছু কোটা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত বা ধনী মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাৎপদ হলো কিভাবে?। ১০। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য অলরেডি বয়সসীমা বেড়ে আছে। সবার জন্য ৩০ আর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ১১। আল্লাহ আইনেও এমনটি নাই। কেয়ামতের দিন পিতার কৃতকর্মের জন্য পিতাকে হিসাব দিতে হবে। আর পুত্রকে তার নিজের হিসাব দিতে হবে। এটা কেবলমাত্র বাংলাদেশ আছে। ১২। পৃথিবীর কোন ধর্মে এই ধরনের বৈষম্যকে জায়েজ করেছেন কি। হযরত মোহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে পরিষ্কার বলেছেন যে, পিতার কাজে পুত্রকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। পিতার খারাপ কাজে পুত্রকে শাস্তি দেওয়া না গেলে ভালো কাজে পুরষ্কৃত করা যাবে কি? ১৩। ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলো জীবন বাজী রেখে তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে এটা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তার সন্তান বা নাতীরা কি অবদান রেখেছে? নাকি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতীরা পুনঃ জনমে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করবে। ১৪। দীর্ঘদিন যাবত চাকুরীতে আবেদনকারীরা বলে আসছে প্রবেশের সময়সীমা বাড়াতে হবে। সরকার যুক্তি দিচ্ছে এটা সমস্যা। তাহলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কিভাবে বাড়ানো হলো। একই দেশ একই আবহাওয়া। তাহলে ওদের জন্য কেন বাড়বে। সুস্পষ্ট বৈষম্য। ১৫। আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতারা কথায় কথায় সংবিধান সংবিধান করেন। তাহলে এখানে সংবিধান কোথায় গেল। এবার সংবিধান পড়ে আমাকে বুঝতে হবে। ধারা ২৯ এ মৌলিক অধিকার, ২৯:১ প্রজাতন্ত্রের নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগের সমতা থাকবে। ২৯:২ কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষের ভেদ ক্ষেত্রে বা জন্ম স্থানের কারণে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে অযোগ্য হবে না কিংবা তাহার প্রতি বৈষম্য করা যাইবে না। ১৬। সাধারণত কোটা পদ্ধতিটা যে কতটা সম্মানের তা বুঝতে হলে বর্তমানে যারা কোটায় চাকুরী করতেছেন এবং চাকুরী প্রার্থীদেরকে যদি বলি তাদের পদবীর সঙ্গে কোটা শব্দটি জুড়ে দেওয়া হবে এমনকি আইডি কার্ডেও, দেখবেন কেউই রাজী হবেন না। বিষয়টি সম্মানের হলে রাজী হবেন না কেন? ১৭। আমরা কথায় কথায় মেধার সঙ্গে আপোষ নয় বলে চিৎকার করি। এখানে সুস্পষ্টভাবে মেধার সঙ্গে আপোষ করা হয়েছে। ১৮। আমাকে দেশব্যাপী সরকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। প্রায়শ আমি প্রশাসনিক এবং শিক্ষা কর্মকর্তাদের ফরওয়াডিং গ্রহণ করি। এমনও হয় যে, একেকটি স্মারক ১০ বার পর্যন্ত সংশোধন করতে হয়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি তাদের মধ্যে কোটায় নিয়োগ প্রাপ্তদের সংখ্যা বেশি। ১৯। এটা ন্যায় বিচার পরিপন্থী।

আমাদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বর্তমানে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে বলছেন যে, কীসের এত আন্দোলন, আন্দোলনের উপর নির্ভর করে রায় বদলায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি খুবই অবাক হচ্ছি উনারা কি এদেশের আলো বাতাসে বড় হন নাই। উনারা কি জানেন না যে এদেশের স্বাধীনতা এসেছে আন্দোলন সংগ্রাম থেকেই। স্বৈরাচার সরকারগুলো পতন হয়েছে আন্দোলন থেকেই। এদেশের বড় বড় অর্জনগুলো আন্দোলন থেকে হয়েছে। কাদের মোল্লা ফাঁসি নিয়ে শাহবাগে কি হয়েছিল, উনারা কি অল্প সময়ে ভূলে গেলেন। এটা আমাদের বুঝা উচিত যে, এটা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জীবিকার আন্দোলন, এটা রুটি রুজির আন্দোলন, এটা মৌলিক অধিকারের আন্দোলন।

এই সমস্যা দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা মানেই আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদেরকে খাটো করা। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-নাতী-নাতনীরা ভীক্ষারদানের জন্য বসে থাকবে কেন? তারা কেন মাথা উঁচু করে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকবে না। শোষণ করে জোর করে সুযোগ সুবিধা নিলে সেখানে সম্মান থাকে না, সরকার ২০১৮ সালে পরিপত্র জারির মাধ্যমে সকল ধরনের কোটা বাতিল করে দেয়। তৎকালীন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করেছিলো। কোটা বাতিলের আন্দোলন নয়। সদিচ্ছা থাকিলে অনঅগ্রসর শ্রেনির যেমন আদিবাসী, প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু সংখ্যক কোটা সংরক্ষক করতে পারতো। কারো আপত্তি থাকতো না বিষয়টি নিয়ে। এটাও যেহেতু সাধারণ মানুষের রুটি রুজির আন্দোলন, এটা মান অভিমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়। বিষয়টি রক্ত ক্ষরণের পর্যায়ে যাওয়ার পূর্বেই সংশ্লিষ্ট সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে বলে আমরা মনে করি।

যেহেতু সরকার পুরো কোটা বাতিল করে দিলো। আন্দোলনকারীদের চাওয়া সংস্কার। বিষয়টি অস্বাভাবিক হওয়ায় নিন্দুকেরা বলেন সরকারের অদৃশ্য ইশারায় আদালত কোটা বহাল রাখলেন।

আমি জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে মুজিব আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছি মর্মে হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। অভিযোগের তীর সরকারের দিকে যাচ্ছে বলে। এমতাস্থায় বিষয়টি জিইয়ে না রেখে জরুরী ভিত্তিতে অ্যাটর্নী জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে আদালতে শক্তিশালী মুক্তিতর্ক দাড় করিয়ে সমাধান করার প্রত্যাশায় রইলাম। যাতে দেশবাসী বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে, এই বিষয়ে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভাইদেরকে বলবো যে, এ ধরনের আন্দোলনে বিঘ্ন ঘটিয়ে আপনারা একজনকে ইতিপূর্বে ভিপি বানিয়ে দিয়েছিলেন। এবার থামুন। এতে আপনাদেরই ক্ষতি হয়েছে। যত বেশি বাধা সৃষ্টি করবেন ততবেশি নতুন নেতার সৃষ্টি হবে এবং আপনারা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পরবেন। আন্দোলনকারীরা অন্যায় কিছু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে বিষয়টি দেখভাল করতে। আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে কোটা সংস্কার চাই।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রতিভা এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :