দিনাজপুরের আলু এখন বিশ্ববাজারে, পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য

দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে দিনাজপুরের আলু এখন বিশ্ববাজারে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসির উদ্যোগে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে দিনাজপুরের আলু।
সালমা রহমান নামে এক নারী উদ্যোক্তা বিদেশে আলু রপ্তানি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তিনি উচ্চ মূল্য কৃষকের কাছে আলু কিনে বিদেশে রপ্তানি করছেন। অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি হওয়ায় আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
কর্মরত নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম বলেন, ‘বিদেশে আলু রপ্তানিকারক নারী উদ্যোক্তা সালমা ম্যাডামের এখানে কাজ করে আমার সংসার চলছে। স্বামী অসুস্থ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে। আমার উপার্জিত টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনা, স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানের পড়া-লেখা চলছে। এখানে আমরা নারী-পুরুষ সাড়ে তিনশো মানুষ কাজ করছি।‘
ভবেশচন্দ্র, উজির, রমজান নুরুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, আলুর মৌসুম শেষ হলে তাদের অন্য কাজ খুঁজতে হয়। তখন কাজ না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়।’ এই কাজ স্থায়ী হলে তারা ভালো থাকতে পারতেন বলে জানান।
নারী উদ্যোক্তা সালমা রহমান চলতি মৌসুমে বিদেশে রপ্তানি করেছেন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন আলু।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার নওপাড়া তরতবাড়ী এলাকায় বিশাল পরিধি নিয়ে গড়ে তোলা এগ্রোনমি এক্সপার্ট ইনপোর্ট প্রা: লি: ও এগোনমি ইনোভেটিভ এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমা রহমান জানান, ২০২১ সাল থেকে তারা বিদেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি নিজেই এই হাল ধরেছেন। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করে আসছেন। রাজধানী ঢাকার নয়া পল্টন চায়না টাউনে তাদের অফিস রয়েছে।
এ বছর সালমা রহমান বিএডিসির বীজ প্লট নিয়ে প্রায় ৭ শত বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন কন্ট্রাক্ট গ্রোর মাধ্যমে। সেই প্রসেসিং করে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছেন। তিনি ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করেছেন। তবে এ বছর তার পাঁচ হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানির টার্গেট রয়েছে। তিনি কৃষক পর্যায়ে ১৭ টাকা কেজি ধরে আলু কেনেন।
সরকারকে রপ্তানিকারকদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার আহবান জানিয়ে সালমা রহমান বলেন, ‘সরকার যদি ইনোভেটিভ বাড়িয়ে দেন, তাহলে আমরা আরো বেশি আলু বিদেশে রপ্তানি করতে পারব।’
তার এই প্রতিষ্ঠানে সাড়ে পাঁচ শ কৃষক-শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সরকারের সহযোগিতা একান্ত কাম্য বলে জানান সালমা।
সালমা রহমানের পাশাপাশি বিএডিসির উদ্যোগে অনেক ব্যবসায়ী দিনাজপুরের আলু বিদেশে রপ্তানি করছেন।
বিদেশে আলু রপ্তানিকারক আনিস উদ্দীন রিয়াজ বলেন, ‘এখন সানশাইন জাতের আলু রপ্তানি করছি। মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। বিএডিসি থেকে বীজ নিয়ে এ জাতের আলু উৎপাদন এবং বিদেশে রপ্তানিতে বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে আমাদের।‘
কিন্তু আলু অল্প সময়ের জন্য উঠে। ৪০/৪৫ দিনে মাঠ খালি হয়ে যায়। এই আলু রেখে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি আলু রপ্তানি করা যায়, তাহলে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের আলু বাজার দখলে রাখতে পারবে বলে জানান আনিস উদ্দীন রিয়াজ। এজন্য আলু সংরক্ষণে ওয়্যার হাউজ প্রয়োজন।
আনিস উদ্দীন রিয়াজ বলেন, ‘এখন আমরা যে আলু পাঠাই, তা আস্তে আস্তে কালার (রং) নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে হিমাগার বা ওয়্যার হাউজের ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। তাহলে আমরা সারা বছর আলু রপ্তানি করতে পারবো।‘
আলু রপ্তানিতে প্রণোদনা কমানোয় হতাশ আনিস উদ্দীন রিয়াজ। বলেন, ‘আগে প্রণোদনা ছিল ২৫ শতাংশ। এখন তা কমিয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষক উৎসাহ হারাচ্ছে।’
আনিস উদ্দীন রিয়াজ আরও বলেন, ‘কৃষক পর্যায় থেকে বাছাইকৃত আলু নিচ্ছি ১৭ টাকা কেজি দরে। মাঠ থেকে হাউজে আনতে আমাদের ১৮ টাকা পড়ছে। আমরা যাদের কাছে আলু নিচ্ছি তারা লাভ পাচ্ছেন। কিন্তু বাজারে আলু বিক্রি করে কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না। তাই কৃষকের পাশে সরকারের দাঁড়ানো উচিত। '
মূলত সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক জাতের আলু বেশি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। আর এ জাতের আলু উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানিতে সহযোগিতা এবং পরামর্শ দিয়ে আসছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি।
বিএডিসির দিনাজপুর অঞ্চলের উপপরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ নেয়ামতউল্লাহ্ বলেন, 'মূলত: ২০২১ সাল থেকে দিনাজপুরের আলু বিশ্ববাজারে স্থান পেলেও এবার প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এক সময় আলু রপ্তানি নিয়ে সমস্যায় ছিলাম আমরা। তখন উন্নত জাতের আলু ছিল না। বর্তমানে সানসাইন অর্থাৎ বিএডিসি আলু-এক বিদেশি ক্রেতাদের কাছে প্রচুর চাহিদা রয়েছে।’
পাকিস্তান এক সময় বেশি আলু রপ্তানি করত,সেই জায়গাটি বাংলাদেশ দখল করতে যাচ্ছে বলে জানান উপপরিচালক।
বিএডিসির দিনাজপুর অঞ্চলের উপপরিচালক আবু জাফর বলেন, ‘আমরা কৃষককে উন্নত মানের আলু বীজ দিয়ে সহায়তা করায় অনেকে এখন আলু উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় ৪৫ থেকে ৮৬ শতাংশ, সিংগাপুরে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, নেপালে ২২ থেকে ৫৯ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় ২ থেকে ৬৫ শতাংশ আলু রপ্তানি বেড়েছে।
(ঢাকাটাইমস/৬মে/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































