গুমানি পেরোনোর অপেক্ষা আর একটি সেতুর স্বপ্নে ৫০ হাজার মানুষ

আজও গুমানির ঢেউ ভেসে নিয়ে যায় মানুষের প্রতিদিনের গল্প, কষ্ট আর প্রত্যাশা। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে নতুন আশায় বুক বাঁধে। তাদের চোখে একটাই স্বপ্ন- একটি সেতু, যা দূর করবে বছরের পর বছর জমে থাকা দুর্ভোগের অন্ধকার, আর খুলে দেবে সম্ভাবনা ও উন্নয়নের উজ্জ্বল নতুন দুয়ার।
চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে বয়ে চলা গুমানি নদী। নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এই নদীর দুই পাড়ে বাস করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
কাছিকাটা দাসপাড়া নিসিবাড়ি ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত নদীর এই অংশের তিন উপজেলার সাতটি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার প্রধান সেতুবন্ধ নৌকা।
তাড়াশ উপজেলার থল নলডাঙ্গা ও হামকুড়া, চাটমোহর উপজেলার এনায়েতপুর এবং গুরুদাসপুর উপজেলার বিলব্যাসপুর, বিলকাঠুর, রানীগ্রাম ও ইয়াসিনপুর গ্রামের মানুষকে প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানান প্রয়োজনে এই নদী পার হতে হয়। তাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা একটি ছোট খেয়া নৌকা।
গ্রামবাসীদের নিজস্ব অর্থায়নে মাসিক ৯ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে নিয়োজিত মাঝি ময়লাল প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষকে নদী পারাপার করান। নদীর ঢেউ আর সময়ের সঙ্গে লড়াই করেই চলছে এই জনপদের জীবন।
বর্ষা এলেই দুর্ভোগ যেন নতুন রূপ নেয়। ফুলে-ফেঁপে ওঠা নদী তখন হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, পরীক্ষার্থীদের সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো কিংবা কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল বাজারে নেওয়া—সবকিছুই হয়ে পড়ে অনিশ্চয়তার এক কঠিন যাত্রা। অনেক সময় জীবন আর জীবিকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় উত্তাল গুমানি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসলাম আলী ও দবীর উদ্দিন বলেন, ‘একটি সেতুর অভাবে বছরের পর বছর আমরা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া কিংবা রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানো—ভোগান্তির শেষ নেই। একটি সেতু নির্মাণ হলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।’
বিলব্যাসপুর গ্রামের সালাম সরকার আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, ‘গুমানি নদী যেন আমাদের উন্নয়নের পথ আটকে রেখেছে। একটি সেতু হলে শুধু দুই পাড় নয়, তিন উপজেলার মানুষের হৃদয়েরও সংযোগ তৈরি হবে। কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।’
স্থানীয়দের মতে, গুমানি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ শুধু ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি হবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অপেক্ষা আর সংগ্রামের অবসানের প্রতীক। এটি হবে হাজারো মানুষের স্বপ্ন, আশা এবং উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী বলেন, ‘বিলব্যাসপুর ও রানীগ্রাম মৌজার মধ্যবর্তী আত্রাই নদীর ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে জেনেছি।’
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, কাছিকাটা নিশিবাড়ি ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত গুমানি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। সেখানে সেতুর পাশাপাশি একটি রাবারড্রাম নির্মাণ করা গেলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচের পানির চাহিদা পূরণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
আত্রাই নদীতে রাবারড্রাম প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে সহকারী প্রকৌশলী বলেন, ‘ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, রাবারড্রাম প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেতু নির্মাণের পথও সুগম হবে এবং মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে। প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান।
(ঢাকাটাইমস/২৯জুন/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































