সাত খুন: রায়ের অনুলিপি হাইকোর্টে আসছে তিন দিনেই

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ১৯ জানুয়ারি ২০১৭, ০৮:৩৮| আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৭, ১৩:৩৩
অ- অ+

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের দুই মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হাইকোর্টে দ্রুত নিস্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণার তিন দিনের মাথায় আজ বৃহস্পতিবার এর অনুলিপি হাইকোর্টে পাঠানো হচ্ছে।

সাত খুন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওয়াজেদ আলী খোকন ঢাকাটাইমসকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বুধবার তিনি বলেন, রায়টি বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে।

২০০৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সাত জনকে অপহরণ করে হত্যার আড়াই বছর পর এই রায় ঘোষণা হয় সোমবার। নিয়ম অনুযায়ী এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে আসামিপক্ষ। উচ্চ আদালতে মামলাজটের কারণে বিচারিক আদালতের রায় কার্যকরে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এ কারণে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের দণ্ড কবে কার্যকর হবে সে নিয়ে তৈরি হয় সংশয়।

তবে রায় ঘোষণার পর পর তা হাইকোর্টে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগের কথা বলা হয়। এর আগে গত বছর আলোচিত দুই মামলা-খুলনার রাকিব এবং সিলেটের রাজন হত্যা মামলাও দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয় হাইকোর্টে। ব্লগার রাজীব হত্যা মামলার শুনানিও দ্রুততম সময়ে হয়েছে উচ্চ আদালতে।

গত সোমবার আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। রায়ে ৩৫ আসামির মধ্যে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, সাত জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দুই জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এ রায়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার ও বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। তারা এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

তবে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করতে এখনও কয়েকটি ধাপ বাকি রয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রথমেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যু অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে ‘ডেথ রেফারেন্স’এর শুনানি হবে। ডেথ রেফারেন্সের শুনানির হাইকোর্টের রায়েও যদি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বা সাজা বহাল থাকে তাহলে আসামিরা আপিল করতে পারবেন। আপিল বিভাগের রায়েও যদি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে তাহলে ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করার নিয়ম রয়েছে। রিভিউতেও যদি তাদের সাজা বহাল থাকে তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তাদের আবেদন ফিরিয়ে দিলে জেল কোড অনুযায়ী রায় কার্যকর করবে সরকার।

আইনজীবীরা জানান, মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসার পাশাপাশি আসামিরা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করতে পারেন। এ আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে তারা আইন অনুযায়ী ৩০ দিন সময় পাবেন। আর যদি কেউ আপিল না করেন তাহলে তাদের ক্ষেত্রে শুধু ডেথ রেফারেন্সেরই শুনানি হবে। এরপর হাইকোর্ট মামলাটি শুনানির জন্য প্রথমেই মামলার পেপারবুক (মামলার এফআইআর, চার্জশিট, বিচারিক আদালতের রায়সহ যাবতীয় তথ্য সংবলিত নথি) তৈরি করবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলাটি আসার পর এ মামলার দ্রুত শুনানি শুরু করার চেষ্টা করা হবে।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে ২৩ আসামি গ্রেপ্তার রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন-সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি নূর হোসেন, র‍্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র‌্যাবের তৎকালীন ক্যাম্প কমান্ডার আরিফ হোসেন, মাসুদ রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক এবং র‌্যাবের বিভিন্ন পদের সাবেক কর্মী আরিফ হোসেন, হীরা মিয়া, বেলাল হোসেন, আবু তৈয়ব, শিহাব উদ্দিন, পুর্নেন্দ বালা, আসাদুজ্জামান নূর, নূর হোসেনের পাঁচ সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান চার্চিল।

গ্রেপ্তার না হওয়া ১২ আসামির ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এরা হলেন- র‌্যাবের সাবেক কর্মী মোখলেছুর রহমান, মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমিন, তাজুল ইসলাম, এনামুল কবীর এবং নূর হোসেনের চার সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, শাহজাহান, জামাল উদ্দিন।

গ্রেপ্তার হওয়া ২৩ আসামির মধ্যে জনের চার জনের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। এরা হলেন র‌্যাবের সাবেক কর্মী রুহুল আমিন, আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান ও বাবুল হাসান।

গ্রেপ্তার হওয়া দুই র‌্যাব সদস্যের সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। এরা হলেন, বজলুর রহমান, নাসির উদ্দিন।

পলাতক ১২ আসামির মধ্যে তিন আসামির ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এরা হলেন, সাবেক র‌্যাব সদস্য আব্দুল আলীম, কামাল হোসেন এবং হাবিবুর রহমান।

বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান রায় ঘোষণার পর এ রায়ে সন্তোষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি এ রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘নৃসংশ এ হত্যা মামলায় আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। আদালত সকল প্রকার প্রভাবের উর্ধ্বে উঠে এ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। এখন আমরা চাই দ্রুত বিচার হোক।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, ‘আদালত নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য রায় দিয়েছেন। আশা করি উচ্চ আদালতে এ রায় বহাল থাকবে।’

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকে অপহরণ করা হয়।

ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাত জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন; প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লাশ উদ্ধারের পর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দুটি মামলা করেন, যার তদন্ত চলে একসঙ্গে।

জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ‌্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু করেন। ৩৮টি কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৬৪ জনের সাক্ষ‌্য শোনে আদালত। যাদের মধ‌্যে ৬০ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ নভেম্বর বিচারক ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রায়ের জন‌্য দিন ঠিক করে দেন।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, এলাকায় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে হত্যার এই পরিকল্পনা করেন আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। অন‌্যদিকে নজরুলদের অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় ঘটনাচক্রে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালককেও হত‌্যা করা হয়।

(ঢাকাটাইমস/১৯ জানুয়ারি/এমএবি/ডব্লিউবি)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সমুদ্রে অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি, আইএমওর বীরত্ব পুরস্কার পাচ্ছেন চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপ্টেন আসিফ
আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েন
শেখ হাসিনার জন্য ফাঁসির দড়ি অপেক্ষা করছে: নাহিদ ইসলাম
দিনভর বন্যা পরিস্থিতি মনিটর করলেন প্রধানমন্ত্রী, প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের দিলেন জরুরি নির্দেশনা
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা