উল্টোপথের এই দেশে...

দুই দিন আগে অফিস থেকে সাত রাস্তার দিকে যেতে গিয়ে চমকে গেলাম। ট্রেন আসবে বলে তেজগাঁও রেলগেটে অপেক্ষা। কিন্তু দুই প্রান্তের চার রাস্তাই রিকশা, গাড়িতে ঠাসাঠাসি। তখনও চমকটা বুঝিনি। ট্রেন চলে যাওয়ার পর প্রথমে উঠল রংসাইডের গেট। রংসাইডের গাড়ি ক্লিয়ার হওয়ার পরই উঠল মূল গেট। আপনি যদি জানেনই রংসাইডে গেলেই আগে যেতে পারবেন, তাহলে আপনি কেন ঠিক সাইডে চলবেন? গত কদিন ধরে ঢাকায় উল্টোপথে চলা গাড়ির বিরুদ্ধে পুলিশের সর্বাত্মক অভিযান চলছে। এই নিয়ে এটিএন নিউজে টক শো আয়োজন করেছিল। টক শোর অতিথি সোলায়মান সুখনের আসতে দেরি দেখে আমি বারবার ফোন করে তাগাদা দিচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, ভাই আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। ইচ্ছা করছে উল্টোদিক দিয়ে চলে আসি।
এই হলো ঢাকার রাস্তার বাস্তবতা। ঠিক পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতে সবাই মনে মনে উল্টোপথে যাওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সেই ভাবনা বাস্তবায়নের সাহস থাকে না অনেকের। কিন্তু যাদের ক্ষমতা অনেক, দাপটের সীমা নেই, যারা আইন বানান তারাই আইন ভাঙেন বেশি। পুলিশের চলমান অভিযানের প্রথম কয়েকদিনে উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অভিযোগে আটক হয়েছে প্রতিমন্ত্রী, এমপি, বিচারপতি, আমলা, সাংবাদিক, পুলিশ কর্মকর্তা, সেনাসদস্যের গাড়ি। পুলিশ আটক করেছে বটে, কিন্তু কাউকেই আটকে রাখতে পারেনি। জরিমানা দিয়ে সবাই ছাড়া পেয়েছেন।
ঢাকায় উল্টোপথে সবচেয়ে বেশি গাড়ি কোন পথে চলে জানেন? কাকরাইল মসজিদের কোণায়। সামনেই মিন্টো রোড। সব প্রভাবশালী থাকেন সেখানে। তারা প্রধান বিচারপতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার বাসার সামনে দিয়ে সাই সাই করে রংসাইডে ছুটে যান। অসহায় সাধারণ মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখেন আর তেমন ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

উল্টোপথে গাড়ি চালানো সবসময় অপরাধ। কিন্তু পুলিশ অভিযান চালায় মাঝেমধ্যে। যেন অভিযান শেষ হয়ে গেলেই আবার উল্টোপথে চলা যাবে। এই ধারণাটাই বদ্ধমূল হয়ে আছে আমাদের চালকদের মধ্যে। অভিযানের প্রথম দিনে সুগন্ধা মোড়ে উল্টোপথে গিয়ে আটক হয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাফরুহা সুলতানার গাড়ি। তার গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালক বাবুল মোল্লা। গাড়ি আটকের পর অবাক হয়ে বাবুল মোল্লা পুলিশকে বলে, ‘স্যার নতুন কোনো আইন হইছে নাকি?’ বাবুল মোল্লার এমন প্রশ্নটির মধ্যেই কিন্তু সমস্যার মূল চিহ্নিত। ভুলপথে গাড়ি চালানো যে অপরাধ প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, আমলা, বিচারপতি, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিকের চালকরা সেটা জানেনই না। তারা মনে করেন, দেশটা তাদের মালিকের। তারা যেখান দিয়ে, যখন খুশি গাড়ি চালাতে পারেন। সত্যি সত্যি যে পারেন, সেটা প্রমাণ হয়েছে পরদিনই। অভিযানের দ্বিতীয় দিনে বাংলামোটর মোড়ে আবার আটক হন মাফরুহা সুলতানা। এবারও চালক সেই বিস্ময়াভিভূত বাবুল মোল্লা। পরপর দুদিন একই অপরাধ করেও যেন বিকার নেই বাবুল মোল্লার। শেষ পর্যন্ত চক্ষুলজ্জার কারণে বাবুল মোল্লাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুদিনই গাড়িতে থাকা ভারপ্রাপ্ত সচিব মাফরুহা সুলতানার কিছুই হয়নি। সচিবের নির্দেশ ছাড়া বাবুল মোল্লা নিশ্চয়ই বারবার আইন ভাঙেন না।
হুট করে ৫-৭ দিনের অভিযানে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না। এই সমস্যার স্বল্পমেয়াদি সমাধান হলো মন্ত্রী, এমপি, আমলা, বিচারপতি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যাতে ট্রাফিক আইন না ভাঙেন, তা নিশ্চিত করতে কঠোর আদেশ জারি করা। কারণ আইন ভাঙার বেশির ভাগই সরকারি গাড়ি। আরেকটা কথা হলো, নিছক জরিমানা করে এই প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। গেলে মাফরুহা সুলতানার চালক বাবুল মোল্লা একই অপরাধ করার কথা ভাবতেন না। যারা উল্টোপথে গাড়ি চালান, তাদের কাছে ২/৪/৫ হাজার টাকার জরিমানা কোনো শাস্তিই না। বরং জরিমানা দিয়ে যদি উল্টোপথে গাড়ি চালানো যায়, তাহলে অনেকেই এতে উৎসাহী হবেন। টাকার চেয়ে সময়ের মূল্য অনেকের কাছেই অনেক বেশি।
এই অপরাধ বন্ধ করতে হলে যারা আইন ভাঙেন তাদের গায়ে লাগে এমন শাস্তি দিতে হবে। স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। উল্টোপথে গেলে গাড়ির চালককে নয়, মালিককে তাৎক্ষণিক স্বল্প মেয়াদে কারাদ- দিতে হবে। হতে পারে এক ঘণ্টার কারাদ-। এই এক ঘণ্টা সেই মহাপ্রভাবশালী ব্যক্তিকে ফুটপাতে স্থাপিত অস্থায়ী কারাগারে সবার সামনে বসে থাকতে হবে। এমন কিছু না হলে নিছক জরিমানা দিয়ে বাবুল মোল্লা বা মাফরুহা সুলতানাদের আটকানো যাবে না। আমরা শক্তের ভক্ত নরমের যম। যে ড্রাইভার ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সুবোধ বালক, বেরুলে সেই হয়ে যায় একেকজন বাবুল মোল্লা।
তবে এসবই টোটকা সমাধান। মানুষকে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়, তখন তিনি উল্টোপথই খুঁজবেন। তাই যানজটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার বাড়াতে হবে। এই জনজঙ্গলে রাস্তা বাড়ানো যেহেতু প্রায় অসম্ভব, তাই রাস্তা ওপরের দিকে বাড়াতে হবে, দোতলা-তিনতলা করতে হবে। মাটির ওপরে-নিচে ট্রেন চালাতে হবে। আর নইলে গোটা দেশটাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন উল্টোপথে চলছে, রাস্তায় প্রভাবশালীরাও উল্টোপথেই চলবেন।
প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































