সিরাজগঞ্জে পানিশূন্য নদনদীর হাহাকার

রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৫৬

সিরাজগঞ্জ জেলার বুক চিরে যাওয়া প্রমত্তা যমুনা, আছে আরও সাতটি অভ্যন্তরীন শাখানদী। সবই এখন পানিশূন্য। মৃতপ্রায় এসব নদীর দিকে যত দূর চোখ যায় ধু ধু বালুচর। যে নদী পেরোতে নির্মাণ করা হয় দেশের সবচেয়ে বড় যমুনা সেতু, তার নিচে এখন আর পানি নেই। কোথাও চাষাবাদ, কোথাও গরু চরানো কিংবা কিশোরদের ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার দৃশ্য চোখে পড়ে সেতুর নিচে দুই পাশেনর বিস্তীর্ণ বালুচরে।

বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর দক্ষিণ দিকের ৫ নম্বর পিলার থেকে ২৩ নম্বর পিলার পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে ৬ নম্বর থেকে ১৭ নম্বর পিলার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জেগে উঠেছে বিশাল বিশাল চর। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সংলগ্ন এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

জেলার তাঁতসমৃদ্ধ শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ি নৌবন্দরে নদীর মাঝপথে প্রকা- চর জেগে উঠে বন্দরকে দুই ধারায় বিভক্ত করে ফেলেছে। পূর্ব অংশে সার ও তেলবাহী জাহাজ কার্গো যেমন ভিড়ছে, তেমনি পশ্চিম পাড়েও। এ বন্দর ছাড়াও বাহিরকোলা নৌবন্দর, যমুনা নদীর ভূয়াপুর-জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, সিরাজগঞ্জ পুরাতন জেলখানা ঘাট, কাজিপুর ঘাটে বড় বড় স্টিমার-লঞ্চ, নৌকা দেশ-বিদেশে চলাচল করত, সে দৃশ্য এখন শুধুই কল্পনা।

শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই নাব্যতা সংকটে পড়ে এ জেলার অধিকাংশ নৌপথে কার্গো, লঞ্চ, নৌকা ও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যমুনা নদী ছাড়া সব অভ্যন্তরীন নদনদী, খালবিল মৃতপ্রায়। দেখে বোঝার উপায় নেই, এগুলো একসময় ¯্রােতস্বিনী ছিল। জেলা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল এসব নদীপথ। অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ এবং উজান থেকে আসা বালুমাটিতে এসব নদী ভরাট হয়ে ধু ধু চরাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। নদী মরে গিয়ে সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার ৫টিই যমুনাবেষ্টিত। বলা যায়, জেলার এক ভাগ স্থল আর তিন ভাগ জল। অথচ নৌবন্দর খ্যাত এ জেলার নদীগুলোর করুণ দশা এখন। যমুনাসহ শাখা নদনদী ইছামতি, করতোয়া, বড়াল, ফুলজোড়, কাটাখালি, হুড়াসাগর ও গুমানী নদী সংস্কার ও খনন করা হয় না যুগের পর যুগ। ফুলজোড় নদীতে নানা জঞ্জাল জমে জমে পানির ওপর রীতিমতো ভাসমান গোচারণ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। জন্মেছে ঘাস, সেখানে চরে বেড়ায় গরু। জেলার হাইওয়ে নলকা ব্রিজের উত্তর পাশের ফুলজোড় নদীতে জমা ওই জঞ্জালের ওপর একসময় হাজারো মানুষ ভিড় জমায়। পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলে নদী। এসব জঞ্জাল সরিয়ে নদীকে উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা নেই কর্তৃপক্ষের।

জেলার অন্য নদ-নদী শুকিয়ে চৌচির। অনেক স্থানে পানির স্তর খুঁজে পাওয়া দায়। এই শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে ভুগছে যমুনাসহ শাখা নদীগুলো। ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-খাল পুনঃখনন না হওয়ায়, আর উজান থেকে পানি আসতে না পারায় নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে দেখা দিচ্ছে মরুময়তা।

এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও কৃষি আবাদে। ঠিকমতো পানি না পাওয়ায় সেচ সংকটে পড়ছেন কৃষকরা। সেচ এলাকার অনেক জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। জেলার নদীবেষ্টিত এলাকার কৃষকরা চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী, শাহজাদপুর উপজেলার চরাঞ্চলের যেসব জমিতে বপণ করা হয়েছিল ধানের চারা, সেসব জমি ফেটে চৌচির।

অন্যদিকে যমুনার ভাঙনের পর আবার নতুন করে জেগে ওঠা চরে কৃষকেরা চাষা করছে মাষকলাই, বিভিন্ন সবজি ও ফসল। লাগাচ্ছে গাছ, গড়ছে বনায়ন। কিন্তু তাতে তারা সুবিধা করতে পারছে না। ক্রমাগত পানি শুকিয়ে নদীগুলো মরে যাওয়ায় গাছপালা ও চাষাবাদের ক্ষতি হচ্ছে। বাড়ছে নানা রোগবালাই। তাই নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া লাখো মানুষ নতুন করে বেঁচে থাকার আশার গুঁড়ে বালি পড়ছে।

চরাঞ্চলের কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, চরাঞ্চলের প্রায় ৩-৪ হাজার হেক্টর জমিতে পলি ও দো-আঁশ মাটিতে গম, বাদাম, মিষ্টি আলু, সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের আবাদে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, নদী পুনর্খনন না করায় মৎস্য উৎপাদন, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব নৌকার ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং ও নদী থেকে বালু উত্তোলন বিপদ ডেকে আনছে।

সিরাজগঞ্জের একসময়ের প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত বাহিরগোলা নৌবন্দর কাটাখালি নদী এখন মৃতপ্রায়। হুরাসাগর নদীর মুখে বসতবাড়ি তৈরি হচ্ছে। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কাটাখালি দিয়ে আর নৌকা স্টিমার চলে না। দেখা যায় না সেই ব্যবসায়িক কেন্দ্র বাহিরগোলার জমজমাট ব্যবসা।

সিরাজগঞ্জ স্বার্থসংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ডা. জহুরুল হক রাজা জানান, সিরাজগঞ্জ জেলা উন্নয়ন করতে কৃষি খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। কৃষিনির্ভর এ জেলার কৃষকদের সহজে ঋণের ব্যবস্থাসহ নদী খনন ও সেচব্যবস্থা সহজলভ্য করতে হবে। যমুনার অভ্যন্তরীণ শাখানদী দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় সেচের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শস্য চাষ- এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

(ঢাকাটাইমস/১৫জানুয়ারি/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :