সিয়াচেন হিমবাহ: অমানবিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

আবুল কাশেম
 | প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৯

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেন হিমবাহ। পাকিস্তান এবং ভারতের সীমান্তরক্ষীদের মাঝে এই অঞ্চলে সর্বদাই যুদ্ধের ভয়াবহতা বিরাজ করে। চারদিকে ১৮ থেকে ২০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়। দিগন্ত বিস্তৃত বরফ। পশ্চিমতম প্রান্ত ছুঁয়েছে হিমালয়ের শেষ বিন্দুকে। সেদিক থেকেই বাঁক নিয়ে এই হিমবাহের পূর্ব দিকে এসে শেষ হয়েছে কারাকোরাম। পৃথিবীর দুই দুর্গমতম পর্বতশ্রেণির মাঝে ৭২ কিলোমিটারজুড়ে শুধুই বরফ। সিয়াচেনে দায়িত্বরত দুই দেশের সেনারা সারাক্ষণই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন। দুই দেশের পারস্পরিক গুলি বিনিময় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে নিত্যদিনে সেনাদের মৃত্যুতে গুলির প্রভাব নেই, যা রয়েছে তা হলো বরফ আর শত মাইল বেগে ধেয়ে আসা তুষারঝড়। উচ্চতা ৫০০০ মিটারেরও বেশি আর তাপমাত্রা কখনো পৌঁছে যায় মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সিয়াচেন হিমবাহে অক্সিজেনের মাত্রা সমতলের প্রায় দশ শতাংশ।

কাশ্মীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে সিয়াচেন। শুধু তাই নয়, পূর্বাঞ্চলীয় কারাকোরাম নিয়েও ঝামেলা আছে এই গ্লেসিয়ারকে কেন্দ্র করে। যে কারণে এই অঞ্চটিকে দুই দেশই তাদের নিজেদের বলে দাবি করছে দীর্ঘকাল থেকেই। ২০০৩ সালের নভেম্বর থেকে দুই দেশের মধ্যে অস্ত্রবিরতি শুরু হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী হিমবাহের উপরের অংশে এবং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নিম্নাংশে অবস্থান করছে। ৭০ কিমি দীর্ঘ কারাকোরামের বৃহত্তম ও পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অমেরুপ্রদেশীয় এই হিমবাহটি ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন। ভারত এখানে পৃথিবীর উচ্চতম হেলিপ্যাডটি নির্মাণ করেছে। সমদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২১,০০০ ফুট উঁচুতে অমানবিক লড়াইয়ে মেতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশ। 

ভূমি দখলের লড়াইয়ের মাঝে প্রতিনিয়ত অকাতরে জীবন বিলিয়ে চলেছেন দুই দেশের সেনা সদস্যরা। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় সেনাদের। জমে যায় টুথ পেস্ট। কোনও ফলই খেতে পারেন না সেনারা। কারণ, অতিরিক্ত নিম্ন তাপমাত্রায় জমে শক্ত কাঠের মতো হয়ে যায় ফল। সিয়াচেনের ঝড় বড়ই ভয়ঙ্কর। সিয়াচেনে নিয়মিত ঘণ্টায় একশো মাইল বেগে ঝড় ওঠে। কখনও কখনও এই ঝড় টানা তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়। তুষারঝড়ে এই দীর্ঘ সময় ধরে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় কোনো মানুষের বেঁচে থাকার নজির খুবই কম। তুষার ঝড়ের সময় সেনা তাঁবুতে বসে থাকারও কোনো উপায় নেই। কারণ, তাহলে পুরো শিবিরই চলে যাবে বরফের তলায়। ঝড়ের মধ্যেই বেলচা হাতে নিয়ে বরফ সাফ করতে হয় সেনাদের। সারা বছরে সিয়াচেনে প্রায় ৩০-৪০ ফুট গভীরতার বরফ পড়ে। মাসের পর মাস গোসল না করে থাকেন ভারতীয় সেনারা। গোসল করলেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া প্রায় নিশ্চিত।

অক্সিজেন কম থাকায় স্মৃতি চলে যায় অনেক সেনার। এই শিবিরে একবার থাকলে সমতলে ফিরে আসার পরও স্বাভাবিক হয় না শরীর। তাপমাত্রা অত্যন্ত কম থাকায় শরীরে থাবা বসায় তুষারক্ষত। হাত-পা-আঙুল হারানোর ঘটনার নজির খুব একটা কম নয়। বিশেষভাবে তৈরি দস্তানা না পরে বন্দুকের ধাতব অংশ স্পর্শ করলেও থাবা বসাতে পারে তুষারক্ষত। এই ধরণের অসুখের পুরোদস্তুর চিকিৎসার ব্যবস্থা মেডিকেল সায়েন্সে নেই। যার কারণে এসব সেনাদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করেছে ভারত।

৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সিয়াচেন হিমবাহে সারা বছর উপস্থিত থাকেন দুই দেশের সেনারা। সুযোগ থাকলেও নিচে নেমে আসতে পারেন না তারা। কারণ, সুযোগ পেলেই একে অপরের দাবি করা অংশের দখল নিয়ে নেবে। আর একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে কঠিন এই ভূমি নিজেদের হাতে নিয়ে আসা খুবই কঠিন। সিয়াচেন অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল বিপুল সেনাবাহিনী দ্বারা প্রভাবিত। এখানে কিছু বিরল প্রজাতি, যেমন বাদামি ভাল্লুক হুমকির মুখে রয়েছে।

কারাকোরাম পর্বতের সিয়াচেন হিমবাহ দখলে রাখা নিয়ে দুই চিরবৈরী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে লড়াই শুরু হয় আশির দশকের গোড়া থেকে। তবে দ্বন্দ্বের বীজ লুকিয়ে ছিল দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া করাচি আর সিমলা চুক্তি দুটির মধ্যেই। যেখানে ‘এন জে ৯৮৪২’ নামের একটি অবস্থানের পরে নিয়ন্ত্রণ রেখা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি মানচিত্রে। মনে করা হতো ওই এলাকার আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল, যেখানে কোনো মানুষ থাকতে পারবে না। যার কারণে সেখানকার মানচিত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

এ বিষয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পাকিস্তানি অনুমতি নিয়ে  সিয়াচেন হিমবাহে পর্বত অভিযানের সংখ্যা বাড়তে থাকে সাতের দশকের শেষের দিকে। তখনই আমরা খবর পাই যে লন্ডনের একটি দোকান থেকে সিয়াচেন অভিযানের জন্য প্রচুর পোশাক আর সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। পাকিস্তান সিয়াচেন দখলের জন্য তৈরি হচ্ছে। তড়িঘড়ি বিমানবাহিনী আর স্থল সেনা পাঠিয়ে ১৯৮৪ সালে ভারত দখল নেয় সিয়াচেনের।’

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কে কে গাঙ্গুলি বিবিসিকে বলেন, ‘সিয়াচেন কৌশলগত কারণেই আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পশ্চিমদিক থেকে পাকিস্তান আর পূর্বদিকে চীন আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। পুরো লাদাখ এলাকাকেই ভারতের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারত যদি আমরা সিয়াচেন দখল না করতে পারতাম।’

ভারতের দিকে যেমন হিমবাহটি দখলে রাখতে গিয়ে সেনাসদস্যদের মৃত্যু হয় প্রাকৃতিক কারণে, পাকিস্তানের দিকেও মৃত্যুর সংখ্যা কম না। ২০১২ সালে এক বড় বরফধসে একসঙ্গেই ১৪০ জন পাক সেনা সদস্য মারা গিয়েছিলেন। একটি সাম্প্রতিক হিসাব বলছে ভারতের দিকে গড়ে প্রতি দুদিনে একজন আর পাকিস্তানি বাহিনীতে গড়ে প্রতি চার দিনে একজন করে সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়।

পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে তাদের চৌকিগুলোতে পৌঁছন তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ তারা হিমবাহের কম উচ্চতার দিকটা দখলে রেখেছে, অন্যদিকে ভারতীয় বাহিনীকে শুধুই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পৌঁছতে হয় বেশি উচ্চতায় থাকা এলাকাতে। এই সেনাসদস্যদের কাছে একেকটি রুটি পৌঁছিয়ে দিতে ভারতের খরচ হয় প্রায় ২০০ টাকা, আর পাকিস্তান এক টিন কেরোসিন পৌঁছতে খরচ করে ২০ মার্কিন ডলার। সিয়াচেন দখলে রাখার জন্য ভারত প্রতিদিন এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৪ কোটি টাকা) খরচ করে।

সত্যিই কি প্রয়োজন রয়েছে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার? এমন প্রশ্নের উত্তরে শঙ্কর রায় চৌধুরী বলেন, ‘খরচের তো প্রশ্ন নেই। এটা ভারতের জমি। আমরা কোনোমতেই ছাড়ব না। তাতে খরচ হলে হবে। পাকিস্তানকে তো বহুবার বলা হয়েছে যে নিয়ন্ত্রণ রেখার মানচিত্রে যে ধোঁয়াশা রয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে। তারা তো করেনি সেটা। আমরা কেন আমাদের জমি ছাড়ব!’

পাকিস্তানেও সিয়াচেন দখলে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিয়াচেন নামের একটি নাটকের মাধ্যমে সেখানে প্রহরারত সেনাসদস্যদের কঠিন জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। আবার ভারতেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সিয়াচেনের জন্য এই বিপুল খরচ নিয়ে। ইনস্টিটিউট অফ পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিসের পত্রিকায় একটি নিবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গুরমীত কানওয়াল লিখেছেন সিয়াচেন হিমবাহ বা তার আশেপাশের পর্বতশিখরগুলি দখলে রাখার আসলে কোনও কৌশলগত সুবিধাই নেই। সিয়াচেন দখলে রাখতে গিয়ে উল্টে ক্ষতি হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভাল করার প্রচেষ্টা। আর ব্রুকিংস্ ইনস্টিটিউটশনের বিশেষজ্ঞ স্টিফেন কোহেন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিয়াচেন নিয়ে এই দ্বন্দ্বকে বর্ণনা করছেন ‘দুই টাকমাথা লোকের একটা চিরুনি নিয়ে লড়াই’ বলে।

বরফের চাদর কোথায় কত পুরু কেউ জানে না। কত হাজার হাজার বছর ধরে জমে রয়েছে এই বরফ, তারও ঠিকঠাক হিসেব নেই। এমন এক হিমবাহের মাথায় সেনা জওয়ানদের মোতায়েন করার জন্য বহু অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং পোশাক ব্যবহার করতে হয় সেনাবাহিনীকে। প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য এত রকম সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ায় সেনাদের মনোবল বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু তাতে পৃথিবীর সর্বোচ্চ এবং কঠিনতম যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা কমেনি। প্রকৃতির খামখেয়াল রুদ্রমূর্তি ধরে মাঝেমধ্যেই সেখানে ওলট-পালট করে দেয় সাজানো সব হিসেব। কিন্তু প্রকৃতি যাই চাক, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে সিয়াচেনে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। সেনাদের জীবন এবং কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও তাই এদিক থেকে পিছু হটার আপাতত সুযোগ নেই ভারত পাকিস্তানের। তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার, বিবিসি ও উইকিপিডিয়া। 

(ঢাকাটাইমস/১৬জানুয়ারি/এসআই)

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত