মাটির মায়া

কাজী রফিক ও জহির রায়হান
| আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৪৩ | প্রকাশিত : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৩৬

আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে পেশাদার কুমারের কদর। মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ পেশা থেকে সটকে পড়তে বাধ্য হয়েছে বহু কুমার। বংশীয় ধারায় নতুন কুমারদের জন্ম না হওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে মৃৎশিল্পের নিপুণতা। তবে বৈশাখ মানেই বাঙালিয়ানা। তখন আবার মাটির জিনিসের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে।

সিন্ধু সভ্যতা থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের মাটির তৈরি তৈজসপত্র ব্যবহারের প্রমাণ আছে। উপমহাদেশে মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও বাসনকোসনের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। উনিশ শতকে সে ব্যবহার কমতে শুরু করে। শতকের মাঝামাঝি এসে বাড়ে ধাতবে তৈরি তৈজসপত্র উৎপাদন ও ব্যবহার।

তখন থেকে সিরামিক্স, লোহা, প্লাস্টিক আর সিলভারের যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে মৃৎশিল্প। যেটুকু টিকে আছে তার পুরোটাই ক্রেতাদের শখ আর কুমারদের বংশের ধারা টিকেয়ে রাখার তাগিদ।

গত কয়েক বছর আগেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছিল কুমারপাড়া। দিন দিন যখন মাটির তৈরি গৃহসামগ্রীর চাহিদা কমে যাচ্ছে তখন কুমাররাও বাধ্য হচ্ছেন বাবা-দাদার পেশা ছাড়তে।

অনেকেই পেশা টিকিয়ে রেখেছেন ভিন্নভাবে। পেশায় এনেছেন ভিন্নতা। গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির বিকল্প হিসেবে কুমাররা তৈরি করেছেন শখের জিনিসপত্র। যুক্ত হয়েছে বাড়তি সৃজনশীলতা। বেশি তৈরি হচ্ছে ফুলদানি, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি, বিভিন্ন আকার ও প্রকারের প্রাণীর প্রতিকৃতিসহ ঘর সাজানোর নানা উপকরণ। টিকে আছে মাটির গহনার প্রথাও। যদিও এর চাহিদা গত কয়েক বছরে কমে এসেছে।

সাভারের নবীনগর এলাকায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের বিপরীতে রয়েছে মৃৎ ও কুটিরশিল্প বাজার। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কর্তৃক পরিচালিত বাজারটিতে রয়েছে বেশ কিছু দোকান। যেখানে বিক্রি হচ্ছে পাট, পুঁতি-পাতির তৈরির গহনা, গৃহসজ্জা সামগ্রী। তবে এখানকার ব্যবসায়ীদের সবাই কুমার নয়। অধিকাংশ দোকানি কুমারদের থেকে মাটির তৈরি জিনিসপত্র কিনে এনে তাতে বাহারি রং মেখে তা বিক্রি করেন।

ব্যবসায়ীরা জানালেন, মাটির তৈরি জিনিসপত্র এখন ঢাকা ও তার আশপাশে কম জায়গাতেই পাওয়া যায়। ধামরাই উপজেলায় মাত্র কয়েকজন কুমার আছে, যারা এই ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এছাড়া জিনিসপত্র আসে বরিশাল ও পটুয়াখালী থেকে।

তবে রাজধানীতেও যে কুমার একেবারেই নেই, তা নয়। রায়েরবাজার এলাকায় এখনো টিকে আছে ঐতিহ্যের এই পেশাটি। শিশির পাল, সন্দ্বীপ পালদের হাত ধরে সেখানেও তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি-পাতিল, বাসন ও নানা শখের জিনিসপত্র।

কুমার পাওয়া গেল সাভারের মৃৎ ও কুটিরশিল্প বাজারেও। নাম রামেন্দ্র চন্দ্র পাল, বয়স ৬৮। তিনি জানান, এটি তার বাবা-দাদা থেকে পাওয়া পেশা। তবে এখন তিনি হতাশ। বলেন, ‘এখন ব্যবসা নাই। মানুষ সিলভার, প্লাস্টিকের জিনিস ব্যবহার করে। মাটির জিনিস ব্যবহার করতে চায় না।’

চাহিদা কমে যাওয়ায় বংশীয় পেশায় আসার ধারা ভেঙেছে বলে মনে করেন রামেন্দ্র চন্দ্র পাল। বলেন, আয় কমে গেছে বলে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেরা এই পেশায় যুক্ত হতে চাচ্ছে না। রামেন্দ্রও চান না তার সন্তানরা এই পেশায় আসুক।

চলছে বৈশাখের তোড়জোড়

সারা বছর ব্যবসায়িক মন্দা থাকলেও বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে উপলক্ষ করে হলেও এদেশের মানুষের মধ্যে বাংলা ভাবের উদয় হয়। প্রয়োজনে নয়, শখের জায়গা থেকে অনেকেই ভিড় জমান কুমারদের দোকানে। চাহিদার একটি বড় জায়গা দখল করে আছে মাটির ফলকে আঁচড় কেটে তৈরি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন ফকিরের প্রতিকৃতি।

চাহিদার সঙ্গে জোগানের সমন্বয় রাখতে বৈশাখের মাসখানেক আগে থেকেই জোর প্রস্তুতি কুমারপাড়ায়। বাড়ে বিক্রিও। ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে সাভারের মৃৎশিল্প বাজারে অধিকাংশ দোকানি বাড়িয়েছেন লোকবল।

বাজার ঘুরে এক কিশোরকে মাটির তৈরি ফুলের টবে তুলির আঁচড়ে রং করতে দেখা গেল। নবম শ্রেণির ছাত্র গৌতম তার চাচার দোকানে কাজ করছে এক সপ্তাহ ধরে। কাজ করবে বৈশাখ পর্যন্ত। বলে, ‘আমি পড়াশোনা করি। বৈশাখের আগে চাপ থাকে। তাই এই সময় এসে কাজ করি। বৈশাখ পর্যন্ত করব। কিছু আয় হবে। ’সাভার মৃৎ ও কুটিরশিল্প বাজারের সামনে এমন আরো কয়েকজনকে দেখা গেছে রঙের কাজে ব্যস্ত সময় পার করতে। দোকানজুড়ে রয়েছে মৃৎশিল্পের বিশাল সমাহার।