শিক্ষার্থীদের খাবার থেকে পড়াশোনা, সবই নজরদারিতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯, ১৬:১৩ | প্রকাশিত : ২৫ জুন ২০১৯, ১৫:৩৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ও নজরদারির সমন্বয়ে মানুষের সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই চীনের এক স্কুলে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে।

১৬ বছর বয়সি মেং জিনইয়াং স্কুলে যখন মধ্যাহ্নভোজ করতে যায়, তখন শুধু নিজের মুখ দেখালেই চলে। সঙ্গে সঙ্গে মাংস, ডিম ও সবজিসহ পছন্দের পদ তার কাছে চলে আসে। বিশেষ এক প্রণালী শিক্ষার্থীদের আগের অর্ডারের ভিত্তিতে পছন্দের খাবার বিতরণ করে। ক্যান্টিনের অ্যাকাউন্ট থেকে তখন সেই পদের দাম কেটে নেওয়া হয়।

এতকাল তাদের একটি কার্ড দেখাতে হত। এখনো সেই পদ্ধতি চালু আছে বটে, কিন্তু প্রায় কেউই আর সেই কার্ড ব্যবহার করে না। মুখচ্ছবি শনাক্ত করে দাম মেটানোর পদ্ধতি অনেক সহজ বলে মেং মনে করে।

হাইস্কুলের ছাত্রী মেং জিনইয়াং জানায়, ‘আমি প্রায়ই এই সিস্টেম ব্যবহার করেছি। আগের তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেড়েছে। প্রত্যেককে নিজের কার্ড যন্ত্রের উপর রাখতে হত বলে খাবার সংগ্রহ করতে লম্বা লাইন দেখা যেত। তাছাড়া রান্নাঘরের কর্মীদেরও এখন কোনো বোতাম টিপতে হয় না।’

শিক্ষক-শিক্ষিকারা মনে করেন, দৈনন্দিন জীবন অনেক স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। কারণ এখন সারা মাসের খাদ্য রিপোর্টে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর খাদ্যতালিকা দেখা যায়। কেউ শাকসবজি বাদ দিয়ে শুধু হ্যামবার্গার খেলে তা চোখে পড়ে।

হাংজু হাইস্কুলের শিক্ষিকা জু জিয়াও এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘প্রত্যেক অর্ডারের পর তথ্য জমা হয়। কিছুকাল পর আমরা তা বিশ্লেষণ করতে পারি। বাবা-মায়েরাও সেই তথ্য হাতে পান। ছাত্রছাত্রীরা কত পরিমাণ প্রোটিন, শর্করা ও ভাজাভুজি খেয়েছে, তার পরিমাণ জানতে পারি।’

নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ– ১০০ বছরেরও বেশি পুরানো হাংজু শহরের ১১ নম্বর হাইস্কুল চীনে বেশ কয়েকবার পুরস্কৃত হয়েছে। দেশের অন্য অনেকে এই ব্যবস্থাকে আদর্শ মনে করে।

হাংজু হাইস্কুলের প্রধান জাং গুয়ানচাও ভবিষ্যতের ‘‘ইন্টেলিজেন্ট স্কুল’ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবে দেখলাম, প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের জীবন আরও মনোরম করে তুলতে পারি এবং শিক্ষকদেরও দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারি। তখন আরও বড় মাত্রায় ‘বিগ ডেটা’, ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথা ভাবি।’’

প্রত্যেকেই তার কার্যকলাপের মাধ্যমে যে তথ্য সৃষ্টি করে, সেগুলি শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য কাজে লাগানো হয় বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করে। এমনকি লাইব্রেরি থেকে বই ধার নেবার সময়ও শুধু মুখ দেখালে চলে। স্কুলের লাইব্রেরির তুলনায় বই ভেন্ডিং মেশিন ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে।

জু জিয়াও বলেন, ‘আমরা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জানতে পারি, কে কবে কত বই ধার নিয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী আরও বই কিনতে পারে।’

মেং চারিদিকে ক্যামেরা দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার মতে, ‘একদিকে অবশ্যই নজরদারি মনে হয়। অন্যদিকে আবার পড়াশোনার সুবিধা হয়। সেটাই তো আমাদের মূল দায়িত্ব। সব মিলিয়ে অসুবিধার তুলনায় সুবিধাই বেশি।’

প্রায় প্রত্যেক কোণেই মুখচ্ছবি শনাক্ত করার ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। হোস্টেলের সব বাসিন্দা ঠিক সময়ে নিজেদের ঘরে ফিরেছে কিনা, মনিটরে একবার নজর দিলেই শিক্ষক-শিক্ষিকারা তা জানতে পারেন।

শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের সেরা ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই সব প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করে। যত বেশি তথ্য আসবে, তত ভালো করে প্রত্যেকের ক্ষমতা, দুর্বলতা ও আগ্রহ শনাক্ত করা যাবে।

সব ক্লাসঘরে লাগানো ইন্টেলিজেন্ট ক্যামেরা মুখের অভিব্যক্তি বিশ্লেষণ করতে পারে। স্কুল পড়ুয়ারা কি মনোযোগ দিচ্ছে? নাকি সবকিছু একঘেয়ে লাগছে? তারা কি খুশি? তবে আপাতত সেই ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক মানদণ্ডের প্রশ্নে কিছু বাবা-মা, এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের কাছেও বিষয়টি বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ এই সংশয় দূর করার চেষ্টা করছে। কারণ তারা আবার সেই ক্যামেরা চালু করে আরও পরীক্ষা চালাতে চান। হাংজু হাইস্কুলের প্রধান জাং গুয়ানচাও মনে করেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি চোখের মণির সঞ্চালন, মস্তিষ্কের তরঙ্গ, মুখের অভিব্যক্তি, মনোযোগ ও আচরণ লক্ষ্য করে। কিন্তু স্কুলেও কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সব প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে? দেখতে হবে, এই প্রযুক্তি আমাদের কতটা সাহায্য করতে পারে। তখন উপযুক্ত প্রযুক্তি বাছাই করে ক্যাম্পাসে আমরা তা প্রয়োগ করি।’

১১ নম্বর হাইস্কুলে কার্যত কিছুই আর নজরদারি এড়িয়ে থাকতে পারে না। সদর দরজায়ও মুখচ্ছবি শনাক্ত করতে ক্যামেরা বসানো রয়েছে। স্কুল খোলার পর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সবাইকে ক্যামেরার সামনে দিয়ে যেতে হয়। যারা দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে, তাদের ভাগ্য খারাপ। আজ কে দেরিতে এসেছে, সব শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের মোবাইল ফোনে তা দেখে নিতে পারেন।

ঢাকাটাইমস/২৫জুন/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :