‘অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে’

দিতি আহমেদ
 | প্রকাশিত : ০৮ জুলাই ২০১৯, ০৯:০০

দেশে বর্তমানে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার নরমালের প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে দিন দিন বেড়ে চলেছে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা। সিজারিয়ান ডেলিভারি আসলে কতটা নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ, সে সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। অহেতুক সিজারিয়ান ডেলিভারি বন্ধে আমাদের করণীয় কী, এ বিষয়ে কথা বলেছেন আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এবং গাইনোকলজিস্ট ডা. নাহিদ ইয়াসমিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিতি আহমেদ

গর্ভবতী নারী হাসপাতালে ভর্তি হলেই ডাক্তাররা সিজার করান ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

হাসপাতালে গেলেই সিজার- এ ব্যাপারে আমি একমত নই। তবে অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাক্তারের কমিশনের জন্য এবং খুব শর্টকাট পদ্ধতিতে অর্থ উপার্জনের জন্য সিজার পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে। অনেক হাসপাতাল আছে যেখানে নরমাল ডেলিভারি করানো হয় এবং নরমাল ডেলিভারির হারই বেশি। আগে একটা সময় ছিল শতভাগ নরমাল ডেলিভারি হতো এবং মা ও বাচ্চা উভয়ই সুস্থ থাকত। আর হাসপাতালের সংখ্যাও কম ছিল। মানুষ সচেতন ছিল না। প্রসবের জন্য হাসপাতালে যাওয়াটা প্রয়োজন মনে করত না। ফলে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। আর এই মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে আনার জন্য মা ও শিশুর জীবন রক্ষার জন্য সিজারের সংখ্যা বেড়েছে। আর নারীর শারীরিক জটিলতা বেড়েছে। তাই সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যাও বেড়েছে।

সিজারিয়ান প্রসব বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

সিজারিয়ান প্রসব শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অন্য দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার কম হলেও বাংলাদেশে এর হার অত্যন্ত বেশি। বলা যায়, বাংলাদেশের সিজারিয়ান ডেলিভারির হার নরমাল ডেলিভারির দ্বিগুণ কিংবা তারও বেশি।

সিজারিয়ান প্রসবের সুবিধা-অসুবিধা কী কী?

সিজারিয়ান প্রসবের ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। সুবিধা কেবল ব্যথামুক্ত ডেলিভারি। বেশি রক্তক্ষরণ হয় না। শিশুর জন্মের পরও ব্লিডিং হলে অনেক ক্ষেত্রে গর্ভ তা প্রসারণ করে ফেলতে হবে। অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। অপারেশনের পরে ব্যথা হয়, যা প্রায় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। ইউটেরান ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণের সময় এক্টোপিক বা টিউবাল প্রেগনেন্সি, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া এবং প্লাসেন্টাল অ্যাবরেশনের সমস্যা দেখা দেয়। দ্বিতীয় বাচ্চা নিতে সমস্যা হয়।

নরমাল ডেলিভারির সুবিধা-অসুবিধাগুলো কী কী?

নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই বেশি। নরমাল ডেলিভারির সুবিধা হচ্ছে- কয়েক ঘণ্টা পরই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই  রোগী স্বাভাবিক কাজ শুরু করতে পারে। ভালোভাবে বাচ্চা জন্মালে শাল দুধ খাওয়ানো সহজ হয়। ফলে মা ও বাচ্চার সম্পর্ক দৃঢ় হয়।

নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চা জন্ম নিলে ফুসফুস শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার জন্য প্রস্তুত ও শক্তিশালী হয়। বাচ্চার জন্মের পর মা শারীরিক ও মানসিক শক্তি লাভ করে।

অন্যদিকে নরমাল ডেলিভারি অস্বস্তিকর ও কষ্টকর। নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে অনেক ঘাম, অ্যামনিউটিক তরল, রক্ত এবং বাচ্চা জন্মের পর নাড়ি বের হয়ে আসে। ভ্যাজাইনাল ইনজুরি হতে পারে। অনেক সময় সেলাই লাগতে পারে। কখনো অন্তঃসত্ত্বার জন্য সিজার প্রয়োজন হয়। একজন গর্ভবতীর যদি সময়ের আগে পানি ভাঙতে শুরু করে, খিঁচুনি হয়, রক্তক্ষরণ হয় তাহলে বাচ্চার মুভমেন্ট বা নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। যদি রোগীর ইনডিগেশন থাকে। এএনসি সঠিকভাবে করা না হয়। অতিমাত্রায় জ্বর, মাথা ব্যথা, সঙ্গে বমি থাকে।

চোখে ঝাপসা দেখা, বাচ্চার প্রস্রাব যদি স্বাভাবিক না হয় অর্থাৎ যদি বাচ্চার মাথা ছাড়া শরীরের অন্য অংশ জরায়ুর সম্মুখে থাকে। ডেলিভারি পেইন ওঠার পরও যদি জরায়ুমুখ না খোলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সিজারে যেতে হবে।

সিজারিয়ান ডেলিভারির পর নারীরা কর্মদক্ষতা হারাচ্ছেন, তথ্যটি কতটা সত্য?

এটা সত্যি যে সিজার হওয়ার পর একজন নারী অনেক ক্ষেত্রেই কর্মদক্ষতা হারাচ্ছেন। একবার সিজার হওয়ার পর শারীরিক বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ওভারওয়েট, ব্যাকপেইন তো আছেই। এছাড়া শরীরে একটা সেলাই থাকায় অনেক স্বাভাবিক কাজ করাই সম্ভব হয় না।

কোনো কারণ ছাড়াই এত বেশি হারে সিজারিয়ান ডেলিভারি কেন?

সব ক্ষেত্রে সিজার করাটা বাণিজ্য নয়। অনেক সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করেও সিজার করা হয়। তবে এটা সতি, অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক এবং হাসপাতাল শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য সিজার করে থাকে। তবে সব ক্লিনিক, হাসপাতাল বা ডাক্তারের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য নয়। আর কারণ ছাড়াও যেসব সিজার হচ্ছে তার পেছনেও কাজ করে থাকে শর্টকাটে অর্থোপার্জন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চাপ ইত্যাদি।

স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ সিজারিয়ানের পরিণতি কী এবং কয়টি বাচ্চা নেয়া সম্ভব?

একাধিক সিজার একজন নারীর জন্য খুবই ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ। আর একজন নারীর প্রথম সন্তান সিজার হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিনবার বাচ্চা ধারণ করতে পারেন। যদি তার অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকে।

অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?

অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। ডাক্তর তাদের কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ ইথিকস নিয়ে কাজ করবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুধু অর্থোপার্জনের জন্য নয়, মানবিক দিক মাথায় রেখে কাজ করবে এবং সিজার করার জন্য ডাক্তার ও রোগীকে নিরুৎসাহিত করবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রত্যাশিত সিজার বন্ধে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত হলেই এসব অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধ করা সম্ভব।

(ঢাকাটাইমস/০৮জুলাই/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :